আমাদের দেশের লাখ লাখ শ্রমিক বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। কিন্তু তাদের তেমন কোনো প্রশিক্ষণ নেই। আবার কেউ কেউ কিছুটা কাজ পারলেও তাদের সনদ নেই। ফলে তারা খুব কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি দেশেও লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণী রয়েছেন। তারা একটি সাধারণ চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কিন্তু তাদের প্রশিক্ষণ বা কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন জ্ঞান না থাকায় অনেক চাকরির সুযোগ তারা নিতে পারছেন না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর জনবহুল দেশগুলোর মধ্যে অষ্টম স্থানে রয়েছে। কিন্তু আমাদের জনসংখ্যার তুলনায় জায়গার পরিমাণ খুব কম। কাজেই আমাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করার কোনো বিকল্প নেই। সরকারি উদ্যোগে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই তাদের উপযুক্ত জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। এতে বিদেশে গেলেও তারা দ্বিগুণ আয় করতে পারবেন, আবার দেশে থাকলেও কোনো না কোনো চাকরি জোগাড় করে নিতে পারবেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবেও আত্মপ্রকাশের সুযোগ রয়েছে।
এশিয়ার মধ্যে দ্রুত উন্নতি করা সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার উন্নয়নের প্রধান শর্ত হিসেবে ধরা হয় কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন। সিঙ্গাপুরে এই শিক্ষার হার ৬৫ এবং মালয়েশিয়ায় ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশে এই শিক্ষায় শিক্ষিতের হার অনেক কম। দেশে প্রতি বছর মাত্র ৫ লাখ লোকের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আলী আকবর খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি-মাস্টার্স পাস করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আবার অনেকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশে-বিদেশে ভালো কাজ করছেন। তাই কোন ধরনের পড়ালেখা করলে ভালো কাজ পাওয়া যাবে, সে ব্যাপারে প্রথমেই আমাদের সচেতন হতে হবে।’
মো. আলী আকবর খান আরও বলেন, ‘আমাদের বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন ধরনের লং কোর্স, শর্ট কোর্স রয়েছে। কিন্তু বেসরকারিভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখা যায়, ব্যবহারিকের সুযোগ কম। ফলে অনেক সময় প্রশিক্ষণ নিয়েও উদ্দেশ্য সফল হয় না। এ জন্য তদারকি বাড়াতে হবে। আর বোর্ডের ম্যানপাওয়ার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কারিগরি প্রতিষ্ঠানও বাড়াতে হবে। সরকার প্রতিটি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ করছে। প্রতি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট করছে, যা অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ।’
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং, ভোকেশনাল কোর্স ছাড়াও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নেওয়া যায়। যদিও এই প্রশিক্ষণের মান নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এ ছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারিভাবে বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, তাদের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১৪ দিন থেকে ৬ মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত তারা ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার ৩৬১ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এই সময়ে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার ৩৪৫ জনের, অর্থাৎ গড়ে তারা প্রতি বছর আড়াই লাখ যুবককে বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার জনের আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে স্বল্পমেয়াদি (৩৬০ ঘণ্টা) প্রশিক্ষণের জন্য নিবন্ধিত প্রায় ৩ হাজার ৩০০ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যাদের মাধ্যমে বছরে আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষ প্রশিক্ষণ পায়। এ ছাড়া দেশে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭ হাজার ৮১৯। এর মধ্যে সরকারি ৬৯১ এবং বেসরকারি ৭ হাজার ১২৮টি। উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানে ২০২২ সালে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ২৯ হাজার ২০৩।
যুব উন্নয়ন থেকে যেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেগুলোর মধ্যে কম্পিউটার, নেটওয়ার্কিং, ওয়েব ডিজাইন, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস, পোশাক তৈরি, ব্লক-বাটিক, পাটজাত ও চামড়াজাত পণ্য তৈরি, ট্যুরিজম, ক্যাটারিং, বিউটিফিকেশন, হস্তশিল্প তৈরি, সমন্বিত কৃষি, পশুপালন, মৎস্য চাষ, মুরগি পালন, ফুল ও ফল চাষ অন্যতম।
কারিগরি বোর্ডের অধীনে ১২০টি ট্রেডে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। যেগুলো ‘শর্ট কোর্স’ হিসেবে বেশি পরিচিত। এগুলোর মধ্যে কম্পিউটার, ড্রাইভিং, ইলেকট্রিক্যাল, গ্রাফিকস ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, আমিনশিপ, রেডিও, টেলিভিশন ও ফ্রিজ মেরামত, ড্রেস মেকিং অ্যান্ড টেইলারিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল সুইং মেশিন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অন্যতম। এ ছাড়া কারিগরি বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও এইচএসসি ভোকেশনাল ছাড়াও চার বছর মেয়াদি বিভিন্ন ধরনের ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার প্রায় ১৭ শতাংশ। কিন্তু বর্তমান শিক্ষার্থীর হার নিয়ে শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। এ ছাড়া ব্যবহারিকনির্ভর কারিগরির লেখাপড়ায় প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পায় না শিক্ষার্থীরা। দেশে অসংখ্য বেসরকারি পলিটেকনিক থাকলেও ভালো মানের প্রতিষ্ঠান আছে ২০ থেকে ২৫টি। আর বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানের বালাই নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্ধতিগত কারণেই বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষাবিমুখ। কারণ অন্য দেশে একজন শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠানই ঠিক করে দেয় সে কারিগরি শিক্ষায় যাবে কি না? কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ভিন্ন রকম। একজন শিক্ষার্থীর ইচ্ছা থাকলেও সে অনেক সময় কারিগরিতে যেতে পারে না। আবার অনেকে কারিগরি শিক্ষাকে ব্যাপকভাবে অবহেলা করে। অনেকেই কারিগরি শিক্ষাকে ভিন্ন চোখে দেখে। বেশিরভাগ মানুষ মনে করে দরিদ্র অথবা মেধায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্যই কারিগরি শিক্ষা।
কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ১০০ উপজেলায় এ প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কাজ শেষের পথে। এ ছাড়া নতুন নতুন সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ প্রতিষ্ঠানে ভোকেশনাল ট্রেড খোলার পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে সরকার। তবে দেশের জনসংখ্যা ও শিক্ষার্থীর তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল।