ভয়ের বুকে হাসি ছড়িয়ে চলে গেলেন মিলান কুন্ডেরা

বিশ্ব সাহিত্যের বুক থেকে একজনের হাসাহাসি বিদায় নিল আজ। তিনি মিলান কুন্ডেরা। ‘দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিয়িং’ নামে বিখ্যাত উপন্যাসের রচয়িতা। চেকোস্লোভাকিয়ায় জন্ম নিলেও নির্বাসিত এ লেখকের মৃত্যু হয় ফ্রান্সে। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।

ছোটবেলায় কুন্ডেরা চাইতেন অদৃশ্য হয়ে যেতে। তখন তিনি ভাবতেন এমন একটি মলম (অয়েনমেন্ট) যদি তিনি পেতেন যা শরীরে মাখলেই অদৃশ্য হয়ে যাবেন। বড় হয়ে যখন তিনি অনেক বিখ্যাত, তারকা লেখক; তখনো ভেবেছেন তেমন একটি অয়েনমেন্টের কথা। ১৯৮৫ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকার থেকে কুন্ডেরার এ গোপন ইচ্ছার কথা বলা হয়। যদিও তিনি এ ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন তার বন্ধু আরেক বিখ্যাত মার্কিন লেখক ফিলিপ রথকে। চেকস্লোভাকিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক দখলদারির পর কুন্ডেরাকে ফ্রান্সে চলে আসতে হয় ১৯৭৫ সালে। তখন থেকে ফিলিপ রথ তাকে সহযোগিতা করে আসছিলেন। দুজনের বন্ধুত্বও ছিল বেশ গাঢ়। যদিও সাহিত্যিক মিল ছিল না তাদের। পরবর্তী সময়ে চেক সরকার কুন্ডেরার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার চালালে ফিলপ রথ, সালমান রুশদিরা তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।

ফিলিপ রথকে কুন্ডেরা জানিয়েছিলেন, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম তখন প্যান্ট পরে ঘুরতাম, তখন আমি একটি অলৌকিক মলমের কথা ভাবতাম যা শরীরে মাখলে আমাকে অদৃশ্য করে তুলবে। তারপর আমি প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছি, লিখতে শুরু করেছি এবং সফলও হতে চেয়েছিলাম। এখন আমি সফল এবং আমি এমন মলম পেতে চাই যা আমাকে অদৃশ্য করে তুলববে’।

যদিও কুন্ডেরা বরাবরই নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রাখতে চাইতেন। তার লেখালেখি, সাহিত্য, জীবন চর্চা ছিল তেমনই। আধুনিক দুনিয়ায় মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, জীবন সব উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে-এটা কুন্ডেরা মানতে পারতেন না। যে কারণে ইউরোপের যে মতাদর্শ, জীবন-যাপন তাতে তিনি ছিলেন বিরক্ত। এসব কারণে উপন্যাস নাই হয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। ছুটন্ত বা ‌‌‘ফাস্ট’ ইউরোপের জীবনের সমালোচনায় তিনি লিখেছেন উপন্যাস ‘স্লোনেস’।

কুন্ডেরা মনে করতেন জীবন একটা ‘ইররেশনাল’ ব্যাপার বা অযৌক্তিক ঘটনা। তার ওই অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ইচ্ছাটা যেমন অযৌক্তিক। কিন্তু এটা মানুষের মনে ক্রিয়া করে। এ ভাবনা লেখাটা উপন্যাসের কাজ। তিনি ১৯৮৫ সালে জেরুজালেম সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণের সময় কুন্ডেরা এক অভিভাষণে বলেছিলেন, ‘উপন্যাস কি? একটি ইহুদি প্রবাদ আছে, মানুষ ভাবে আর ঈশ্বর হাসেন। সেই প্রবাদ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, আমি কল্পনা করতে চাই যে ফ্রাঁসোয়া রাবেলাইস (ফরাসি রেনেসাঁর সময়র লেখক) একদিন ঈশ্বরের হাসি শুনেছিলেন এবং এইভাবে প্রথম মহান ইউরোপীয় উপন্যাসের ধারণার জন্ম হয়েছিল। আমার মনে হয় যে, উপন্যাসের শিল্প ঈশ্বরের হাসির প্রতিধ্বনি হিসাবে পৃথিবীতে এসেছিল।

কিন্তু মানুষকে ভাবতে দেখে ঈশ্বর হাসেন কেন? কারণ মানুষ যখন চিন্তা করে এবং সত্য তার থেকে পালিয়ে যায়। কারণ একজন ব্যক্তি যত বেশি চিন্তা করে, আরেকজনের চিন্তার সঙ্গে তার তত বেশি বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। এবং পরিশেষে, মানুষ কখনো নিজেকে নিয়ে সে যা ভাবে তা নয়। মধ্যযুগ থেকে বের হওয়ার সময় আধুনিক সময়ের শুরুটা মানুষের এই মৌলিক পরিস্থিতি প্রকাশ করেছিল।... প্রথম ইউরোপীয় ঔপন্যাসিকরা মানুষের সেই নতুন পরিস্থিতি দেখেছিলেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন এবং তার ওপর তারা নতুন শিল্প, উপন্যাসের শিল্প নির্মাণ করেছিলেন।’

তিনি ‌‌‘দ্য অর্ট অব দ্য নভেল’ এ বলেন, ‘আমি আরো যোগ করব উপন্যাস ইউরোপের সৃষ্টি; যদিও এর আবিষ্কারগুলি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায়’।

কুন্ডেরার মতে উপন্যাস হলো ‘উভয়যোনী’ যার ভেতর ‘জগতের একটি মেয়েলি এবং একটি পুরুষ’ দৃষ্টিভঙ্গি থাকেবে। আর ‘শারীরিক মানুষ হিসেবে লেখকদের যৌনতা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার’।

আর চরিত্র ফুটিয়ে তোলার বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমার উপন্যাসের কোনো চরিত্রই নিজের প্রতিকৃতি নয়, আমার কোনো চরিত্রই কোনো জীবন্ত ব্যক্তির প্রতিকৃতি নয়। আমি ছদ্মবেশী আত্মজীবনী পছন্দ করি না। আমি লেখকদের হঠকারিতাকে ঘৃণা করি। আমার জন্য হঠকারিতা একটি মূল পাপ। যে অন্য কারো অন্তরঙ্গ জীবন প্রকাশ করে তাকে চাবুক মারা দরকার। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যখন ব্যক্তিগত জীবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কমিউনিস্ট দেশগুলিতে পুলিশ এটি ধ্বংস করে, গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে সাংবাদিকরা এটিকে হুমকি দেয় এবং ধীরে ধীরে লোকেরা নিজেরাই ব্যক্তিগত জীবনের স্বাদ এবং তাদের অনুভূতি হারিয়ে ফেলে।

(ব্যক্তিগত) জীবন যখন কেউ অন্যের চোখ থেকে আড়াল করতে পারে না- সেটাই জাহান্নাম। যারা কর্তৃত্ববাদী দেশে বাস করেছেন তারা এটা জানেন, এই ব্যবস্থাটি শুধুমাত্র একটি ম্যাগনিফাইং গ্লাসের মতো, সমস্ত আধুনিক সমাজের প্রবণতাকে বের করে আনে।’

সব মিলিয়ে ঐতিহাসিক, বাস্তবিক, আদর্শিক কিছু লেখার দায়িত্ব কুন্ডেরা কখনো নিজের ঘাড়ে তুলে নেন নাই। বরং এসবের বাইরে গিয়ে জীবনকে যাপন করেছেন, উপন্যাসও লিখেছেন সেভাবে। নোবেল পুরস্কারের জন্য তাকে সমালোচকরা যোগ্য মনে করলেও সে পুরস্কারের তালিকায় তার নাম ওঠেনি। এর কারণ ইউরোপের যে জীবনাচরণ, বিশ্বাস, সাহিত্যকে দেখার দৃষ্টি তার প্রতি সমালোচক ছিলেন কুন্ডেরা। তাকে বলা হতো ফ্রানজ কাফকার অনুসারী। তিনি নিজেও কাফকার প্রসংশা করতেন। কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ যেমন একটা উদ্ভট স্বপ্ন। এর সঙ্গে কুন্ডেরার অদৃশ্য হয়ে যাওয়াও মিলে যায়, ভাবগত দিক থেকে।

রাশিয়ার লেখকদের মধ্যে লিও টলস্টয়কে বেশি পছন্দ করতেন কুন্ডেরা। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি টলস্টয়কে খুব পছন্দ করি। তিনি দস্তয়েভস্কির চেয়ে অনেক আধুনিক। টলস্টয়ই প্রথম, সম্ভবত, মানুষের আচরণে অযৌক্তিক ভূমিকা উপলব্ধি করেছিলেন।’ ‘আন্না কারেনিনা’ উপন্যাসে কারেনিনা যে আত্মহত্যা করে তা নিয়ে কুন্ডেরার মন্তব্য হলো, ‘কেন সে সত্যিই না চাইলেও আত্মহত্যা করল? কীভাবে তার ভেতর এ সিদ্ধান্তের জন্ম হয়েছিল? অযৌক্তিক এবং অধরা এই কারণগুলিকে ধরতে টলস্টয় আন্নার চেতনার প্রবাহকে ধরতে চেয়েছেন। সে একটি গাড়িতে চলমান; রাস্তার ছবিগুলো তার মাথার অযৌক্তিক, খণ্ডিত চিন্তার সঙ্গে মিশে যায়।’

নিজের উপন্যাস তত্ত্বে এই অযৌক্তিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন কুন্ডেরা। তার ‘দ্য আর্ট অব দি নভেল’ বা বিভিন্ন বক্তৃতায়, সাক্ষাৎকারে কুন্ডেরার উপন্যাস চিন্তার এ আদল পাওয়া যায়। কুন্ডেরা বলতে চেয়েছেন, একজন লেখক আসলে ‘এক্সপ্লোর’ করেন। তার আশপাশের চরিত্র, ঘটনার সঙ্গে এদের সম্পর্ক, যোগাযোগের ধরণ, বিনিময়- এসব একজন লেখক দেখেন এবং তুলে আনেন। লেখক নিজেরে কোনো ঘটনা থেকেই বিযুক্ত করেন না, আবার কোনো ঘটনায় নিজেকে গুলিয়ে ফেলেন না। চোখে দেখাটা তার কাজ। সে দেখায় তিনি যত কিছু তুলে আনতে পারবেন ততই পাঠকের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হবে। কারণ পাঠক বহু।

কুন্ডেরা আরো বলছেন কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ক্ষমতা লাভ, জশ ইত্যাদি প্রয়োজনে যারা শিল্প এবং সাহিত্য করে তাদের তিনি গুরুত্ব দেন না।

কুন্ডেরার কাছে জীবন হলো একটা ‘ফাঁদ’। একটা শরীরে আমরা নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকা পড়েছি এবং যার গন্তব্য হচ্ছে মৃত্যু। তবে তিনি বোহেমিয়ান বা উদাসি কোনো চরিত্র ছিলেন না। কুন্ডেরা যখন চেকস্লোভাকিয়ায় নাৎসিদের আক্রমণ চলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তখন তিনি সমাজতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান ধরেন। তাদের পক্ষে গান-কবিতা লেখেন। এরপর যখন চেকস্লোভাকিয়ায়েোভিয়েত আগ্রাসন শুরু হয় তিনি লেখন তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ দ্য জোকস’। সেখানে তিনি জোসেফ স্টালিনের বিরুদ্ধে এবং লিও ট্রটস্কির পক্ষে অবস্থান নেন। এ উপন্যাস লেখার জেরে তিনি অধ্যাপনার পদ হারান, তার সমস্ত বই বাজার থেকে তুলে নেয়া হয়। পরে নির্বাসিসত হতে হয় ফ্রান্সে। ১৯৭৫ সালে দেশ ছাড়ার পর বাতিল হয় তার নাগরিকত্ব। তখন থেকে ফ্রান্সেই বসবাস। এরপর চেক ভাষায় লেখালেখিও ছেড়ে দেন কুন্ডেরা। ফ্রান্সকে নিজের দেশ হিসেবে মেনে নেন।

তখন থেকেই নাকি কুন্ডেরা জীবনের অর্থ খুঁজে পান হিউমারে। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি স্টালিনবাদী সন্ত্রাসের সময় হাস্যরসের মূল্য শিখেছি। তখন আমার বয়স ২০। আমি সর্বদা এমন একজন ব্যক্তিকে চিনতে চেয়েছি যে স্ট্যালিনবাদী ছিল না, এমন একজন ব্যক্তি যাকে আমার ভয় পাওয়ার দরকার নেই, আর সেটা ফুটে উঠত তার হাসির মাধ্যমে। হাস্যরসের অনুভূতি হলো বিশ্বস্ততার প্রতীক। তখন থেকেই, আমি এমন একটি বিশ্বের কথা ভেবে আতঙ্কিত যা তার রসবোধ হারিয়ে ফেলবে’।

এর বাইরে কুন্ডেরার উপন্যাসের আরেক স্বভাব যৌনতা। নিজের উপন্যাসের প্লট খুব আলাদা করা বিষয়েও তার অনাগ্রহ ছিল। তিনি এ নিয়েও কথা বলেছেন বিভিন্ন সময়ে। যৌনতার ক্ষেত্রেও দ্রুত কিছু করে ফেলার বিরোধী ছিলেন। যৌনতার ক্ষেত্রে তিনি ফ্রয়েডিয় ধারার অনুসারী। তাবে তার উপন্যাসে যৌনতা নারীদের বিরুদ্ধে তে বলে অভিযোগ রয়েছে। যেমন ‘জোকস’ উপন্যাসে এক নারীর স্বামীর সঙ্গে শত্রুতার কারণে ওই নারীর ওপর অত্যাচারের ঘটনা আছে। এ ছাড়া কুন্ডেরা ছিলেন ‘এরোটিক’। তিনি মনে করতেন, জীবনেরই এক রূপ এই এরটিসিজম।

কুন্ডেরার বেশিরভাগ লেখায় তার চেক জীবনের উপস্থিতি আছে। পরে আছে ফরাসী জীবন। তিনি নিজের জীবনের প্রায় চল্লিশ বছর কাটিয়েছিলেন চেকস্লোভাকিয়ায়। যে কারণে তার উপন্যাসে এর প্রভাব আছে। পরে ফ্রান্স থাকাকালীন তার উপন্যাসে ঢুকে পড়ে ফরাসী জীবন।

একজন আপাদমস্তক উপন্যাস লেখকের প্রস্থান ঘটল তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। যিনি দর্শন, বিজ্ঞানের চেয়ে উপন্যাসকেই এগিয়ে রাখতেন। মনে করতেন, মানবেতিহাসে সবার আগে আধুনিক জীবন এনেছে উপন্যাস।

আর জীবনকে তিনি ভাবতেন হালকা করে। ভয়ের বুকে তিনি ছড়িয়ে দিতেন হাসি।