এটা ভালোই হলো যে মিলান কুন্ডেরা সম্পর্কে আমি প্রায় কিছুই জানি না। আমার না জানার তালিকা অসীম। সালাহ উদ্দিন শুভ্র যখন আমাকে কুন্ডেরা সম্পর্কে লিখতে বললেন, তখন এখানে-ওখানে ছড়ানো কিছু ছেঁড়া স্মৃতি ছাড়া আমার স্টোররুমে আসলে কিছু নেই। যদিও ঠিক সেই প্রস্তাবনার সময়েই আমার কর্তব্য হতে পারত সরাসরি না করে দেওয়া। আমি প্রশ্ন করলাম, ‘সময় কতদিন’?। শুভ্র উত্তর দিলেন, ‘কাল দেন, আজকে লিখে?’
সময়; কতদিন আসলে? সময়, দিন বলে আদৌ কিছু’র অস্তিত্ব আছে কিনা? স্মৃতির বাইরে, কল্পনার পরপারে কোন কিছু লেখা আদৌ সম্ভব কিনা? এই বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হওয়া সম্ভব কিনা; সেই প্রশ্ন তো বহুদিনের। কুন্ডেরাকে আমি ধরে ফেলি আত্ম-কথনের সেই যাত্রাতেই। ওনার বই, ‘দ্যা আনবেয়ারেবল লাইটনেস অফ বিইং’ এর প্রথম প্যারাগ্রাফে। অনন্ত প্রত্যাবর্তনকে যিনি রহস্যময় বলছেন। এও বলছেন যে, অনন্ত প্রত্যাবর্তনের ধারণা দিয়ে নিৎশে অন্যান্য দার্শনিকদের বেশ ভালো ভেল্কি দেখিয়েছেন।‘যেই মুহুর্তে আমার কোনকিছুর অভিজ্ঞতা লাভ করি তখন থেকেই সেটির পুনরাবৃত্তিও শুরু হয়। আর পুনারবৃত্তি নিজেই অনন্তকাল ধরে হতে থাকে’।
ফলে আজ যে মিলান কুন্ডেরা মারা গেলেন তিনিও তাহলে ফেরত আসবেন। ধরা যাক উনি আসলেন। যদি তখন এমন কেউ না থাকে যে কুন্ডেরাকে চেনে? কুন্ডেরা নিজেকে যদি না চেনেন? কেমন হবে বিষয়টা?
তাহলে কুন্ডেরার অস্তিত্বশীলতার দার্শনিক প্রশ্নে, সময় আর স্মৃতি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বোঝা যাচ্ছে। আবার প্রশ্নটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিলে; কুন্ডেরা কি আর কখনো ‘অনস্তিত্বশীল’ হতে পারবেন? অনন্তের মাঝে একবার (আমরা কি নিশ্চিত উনি একবারই) আবির্ভূত হবার মধ্য দিয়ে কি কুন্ডেরা অস্তিত্বের দায়ভারে আটকা পড়লেন? বন্দী হলেন?
কুন্ডেরা নিজের সাথেই কথা বলছেন, এ এক চলমান ডায়ালগ। সেই ডায়লগে উনি পাঠককে প্রলুব্ধ করলেন অংশগ্রহণ করতে, একইসাথে প্রভাবিতও করলেন এই বলে যে, ‘অনন্ত প্রত্যাবর্তন এর ধারণা এমনি এক দৃষ্টিদান করে যে যার ফলে কোনকিছুকে আমরা সাধারণত যেভাবে দেখে-বুঝে থাকি তার বাইরে ভিন্ন ধারণা দিতে পারে। ফলে আমরা আর সিদ্ধান্ত দিতে পারি না, ফয়সালায় পৌঁছাতে পারি না। কারণ যা রূপান্তরে আছে তারে আমরা কীভাবে সিদ্ধান্তে আটকাই?’
আমার মনে হয় এই সিদ্ধান্তে আটকানোর চেষ্টা এক পর্যায়ের অস্তিত্বশীল প্রচেষ্টা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আরো অনেক পর্যায় আছে। এই আলাপে উনি গাঁথুনি দিলেন এই বলে যে, ‘(জীবন) সায়াহ্নের গোধূলীর আলোয় সবকিছু নস্টালজিক লাগে, এমনকি গিলোটিনও’।
অস্তিত্বশীলতা যদি ভাবনার/দর্শনের কেন্দ্রে থাকে তাহলে অস্তিত্বশীলতার যে সংজ্ঞায় আমরা নিজেকে সমর্পিত করবো আমাদের নস্টালজিয়া ও ভবিষ্যৎ কল্পনা তো তেমনি হবে। অনন্ত পুনারবৃত্তি যদি অস্তিত্বশীলতার ভরকেন্দ্র হয় তাহলে তো ইতোমধ্যে সবকিছুই ক্ষমা করা হয়ে গিয়েছে, সুপরিকল্পিত গণহত্যা থেকে আপনার সন্তানের ধর্ষণ আগে থেকেই নির্ধারিত এবং ক্ষমাকৃত।
কুন্ডেরা যখনি ‘পারডনড’ শব্দটা ব্যবহার করলেন তখনি আমার সন্দেহ হল, কে কাকে পারডন করল? কারণ পারডনের জন্য দ্বৈত অস্তিত্ব আবশ্যক, দুই পক্ষের ধারণা থাকতে হবে। কে করল? আক্রান্ত-আক্রমণকারীকে? মহাকাল-ঐতিহাসিক মুহূর্তকে? নাকি ঈশ্বর-মানুষকে? আমার কেন জানি মনে হয় মার্ক্সিস্ট ঐতিহ্যের পশ্চিমা (হেটারোজেনাস) ধারাবাহিকতার একটা বারবার ফিরে আসা তর্ক কুন্ডেরার মাঝে রয়ে গেছে।
নিও হেগেলিয়ান স্কুলের ধারালো মাথারা যখন কনশাসনেসের ডায়ালেক্টিককে ছিন্নভিন্ন করতে করতে বলছেন, ‘আরে বস্তু, বস্তুর সাথে সম্পর্কের মধ্য দিয়াই কনশাসনেস তৈরি হয়’, সেই আলাপ খুব গভীরে কুন্ডেরাকে নাড়া দিয়েছে। ওনার লেখালেখি সম্ভবত এই আলাপের সাথে নেগোসিয়েশনের এক গভীর আন্তরিক প্রচেষ্টা। এজন্যই অনেক রিলেটেবল। লেখকের জীবন তো সেটাই। এক অসমাধিত নেগোশিয়েসন।
বইগুলোর নাম খেয়াল করেন, (আমি ইংরেজি টাইটেল ধরেই বলছি), আইডেনটিটি (আত্মপরিচয়), দ্যা আনবেয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং (অস্তিত্বশীলতার অসহনীয় বায়বীয়তা), দ্যা জোক (টীটকারী), লাফেবল লাভস (হাস্য-কর/যোগ্য ভালোবাসা), ইগনোরেন্স (অ-জ্ঞান), দ্যা ফেস্টিভাল অফ ইনসিগনিফিকেন্স (গুরুত্বহীণতার উৎসব), লাইফ ইজ এলসহয়্যার (জীবন, এখানে নয়/অন্য কোথাও),
এনকাউন্টার (মোকাবিলা), এ কিডন্যাপড ওয়েস্ট: দ্যা ট্র্যাজেডি অফ সেন্ট্রাল ইউরোপ (হরণকৃত পশ্চিম: মধ্য ইউরোপের ট্র্যাজেডি)
এতটুক লিখতে লিখতে সিগারেট ফুরিয়ে গেল। আর তাই এবার ছুটলাম সিগারেট কিনতে। ভ্রাম্যমাণ সিগারেট বিক্রেতা ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করলেন। এ এক মধুর ডাক। ‘বাবা আপনাদের কাছে যদি আবদার না করি তাহলে কার কাছে করবো?’ এক প্যাকেট বেনসন (সাদা) সাধারণত কিনি তিন শ তিরিশ টাকা করে। উনি চাইলেন ‘তিন শ চল্লিশ টাকা’। আমি তিন শ পয়ত্রিশ টাকায় রফা করলাম। মধুর ডাকে সাড়াও দেওয়া হল আবার বাস্তব বোধের প্রয়োগও হল। একটা পরিতৃপ্তিকর প্যাকেজ নিয়ে যে ‘আত্মসত্তা’ আবার লিখতে ফিরে এল সে কিন্তু মার্কসিস্ট শ্রেণি প্রস্তাবনার নির্মাণ।
যদিও এটা বলেই ফয়সালা হয়ে যায় না। শুধু কারণ আর ফলাফল দিয়ে বোঝা যাবে না এ গল্প। ফলে কুন্ডেরা; ইউরোপে মানিক বন্দোপাধ্যায় হতে যেয়েও ঠিক হন নাই বলে আমার অনুমান।
এই ফয়সালা না হওয়া প্রক্রিয়ার নানাবিধ বিচ্ছুরণ আমরা সম্ভবত দেখতে পারো তার বিভিন্ন লেখায়। তারও আগে, আত্মসত্তা আর অমোঘ অনন্ত নিয়ে গল্পটা একটু তলিয়ে দেখা যাক।
কুন্ডেরার নিজের সূত্র আরোপ করলে ধরে নেয়া যায় যে, আমি যে কুন্ডেরাকে নিয়ে এই লেখাটা লিখব তা অবশ্যম্ভাবী এবং পূর্বনির্ধারিত। আবার সকল মুহুর্ত অবশ্যম্ভাবী নয়। কারণ আমি এখনি এই লেখাটা থামাতে পারি। ফলে ঠিক, ঠিক এই মুহুর্তটি অবশ্যম্ভাবী, ইনএভিটেবল। যদিও পরবর্তিটি অনন্ত সম্ভাবনাময়। অবশ্যম্ভাবী ও অনন্ত সম্ভাবনার এই জীবন। এখন জীবনের অস্তিত্বশীলতার যে সংজ্ঞায় আমরা নিজেদের সমর্পিত করব সেটাই হয়ে উঠবে অবশ্যম্ভাবীতা এবং অনন্ত সম্ভাবনা। যিনি পরকালে বিশ্বাস করেন তার কাছে তো অস্তিত্বশীলতার সংজ্ঞা অনেক বড় এবং অনন্ত। জৈবিক মৃত্যু একটা দরজা পেরুনো মাত্র। আবার অন্যদিক দিয়ে কুন্ডেরা নিজেও কি এক অমরত্বের কথা বলছেন না? আমি, এই আত্মসত্তা কুন্ডেরার সাথে ডায়ালগে লিপ্ত রয়েছি। যদি আমার দুজনাই, আমরা সবাই ফিরে আসি সবকিছুর পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে? তাহলে এসবের মানে কি? আমি জানি না, তবে অনুমান করি যে কুন্ডেরার নিৎশে প্রেম এই মানে খোঁজার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
১৯২৯ এ জন্ম নেয়া কুন্ডেরার বাবা ছিলেন কনসার্ট পিয়ানিস্ট। উনি মিউজিক নিয়ে পড়াশুনো করছেন তবে ধীরে ধীরে লেখালেখির দিকে ঘুরে গেছেন। উনি শুরু করেছিলেন কবিতা দিয়ে, আরে জোশ তো! এন্ড হোয়াই আই এ্যাম নট সারপ্রাইজড! ১৯৫০ এর দশকে কবিতার বইও বের করেছেন। ১৯৫৫-এর দ্যা লাস্ট মে বইটা আবার কমিউনিস্ট নেতা-র প্রতি নিবেদন করা। চেক রাজনীতিবিদরা আবার কনডেমও করেছিলেন লেখার মধ্যকার যৌনআবেশ ও পরিহাসমূলক সুরের কারণে। কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হবার ঘটনাও আছে। আররে! ১৯৪৮ এ জয়েন করেছেন। মানে বয়স তখন উনিশ। ১৯৫০ এ বহিষ্কৃত মানে একুশ বছর বয়সে। আবার জয়েন করলেন ১৯৫৬ তে মানে ছাব্বিশে। টিকলেন ১৯৭০ পর্যন্ত, মানে এবারে লম্বা সময় ১৪ বছর; উনার বয়স তখন ৪১ বছর। নব্যুয়ত প্রাপ্তির বয়স। এর মধ্যে ছোটগল্প, নাটক লিখেছেন।
আর ১৯৬৯ এ লিখলেন লাইফ ইজ এলসহয়্যার (জীবন, এখানে নয়/অন্য কোথাও), সেটা আবার চেক পাবলিকেশনে ব্যানও খাইল। এমনকি ১৯৮৯ পর্যন্ত উনার বই নিজের দেশেই নিষিদ্ধ ছিল। ফ্রান্সে তো আগেই হিজরত করেছিলেন।
তাহলে তো আমার অনুমান ঠিকই আছে, মার্ক্সিস্ট লেগেসি, প্রাক্সিস, মধ্য ইউরোপ উনার রক্তে মেশানো। হবাইর কথা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সন্তান উনি, পার্টিচিন্তা দিয়ে উনারে আটকে রাখা সম্ভব না, কতটাই আর ডসাইল হবেন। চল্লিশে এসে আর টিকল না সেই টান।
আমার খুব আগ্রহ হল এটা জানতে যে দ্যা আনবেয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং (অস্তিত্বশীলতার অসহনীয় বায়বীয়তা), উনি কখন লিখলেন? ১৯৮৪ তে। মানে উনি তখন ফ্রান্সে, তুলনামূলক সেটেল লাইফে, বয়স পঞ্চান্ন। ঠিকই আছে, এতদিনে তিনি দর্শন আর গল্প আসলে যাপন করছেন, ফলে লিখে ফেলা খুব কঠিন কিছু ছিল না। দা বুক অফ ফরগেটিং এন্ড লাফটার (১৯৭৯) খুব টাইমলি এবং গুরুত্বপূর্ণ। (জন)মানুষের স্মৃতি ও ঐতিহাসিক সত্য-অস্বীকার করা ও গাপ করে দেবার আধুনিক রাষ্ট্রের প্রবণতাক সম্ভবত ডাইসেক্ট করলেন এই বইয়ে। লেখক সত্তা জীবন্ত থাকলে এই বই উনার লেখারই কথা। যুদ্ধের টাটকা যাপনে বড় হওয়া মানুষ, চোখের সামনে নতুন নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হওয়া দেখছেন, যে আইডিয়াল ও আইডিওলজির কথা প্রচার করেছে পার্টি তার ভাঙনও নিশ্চয়ই দেখল। বার্লিন ওয়াল তখনো টিকে আছে। কোল্ডওয়ার তুঙ্গে। রাষ্ট্র প্রজেক্টের নতুন মিথ তৈরি করার মেকানিজম আর মানুষের ইতিহাসকে ঘাড় ধরে রাষ্ট্রের মহাবয়ানে ঢোকানোর নির্লজ্জ প্রচেষ্টা, ধমক ও মুখ বন্ধ করাকে যদি একজন সচেতন মানুষের তরফ থেকে দেখি তাহলে সেটা সচেতন মানবের (হিউম্যানিটি অর্থে) সাথে চরম বেয়াদবি।
এই ধৃষ্টতা সম্ভবত উনার পছন্দ হয়নি। এদিকে আধুনিকতার/ মহাবয়ানের তীব্র ক্রিটিক তখন জ্বলজ্বল করছে, সাঈদ, আসাদ, বর্দ্যু, ফুকোরা মাঠে। আর হ্যাঁ লিবারেল/কেয়ার ইকোনোমি থেকে ইউরোপও তখন নিউলিবারেল হবার বাসনায় বাকবাকুম শুরু করেছে। ফলে উনার তখন এই বই লেখারই কথা ছিল।
যদি আমার অনুমান সঠিক হয় তাহলে দা বুক অফ ফরগেটিং এন্ড লাফটার (১৯৭৯) আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবারো কনটেম্পরারি। ফলে অনন্ত পুনরাবৃত্তির সূত্রে বলা যেতেই পারে এ আবার নতুন কি।
তবে আমার খানিকটা দ্বিমত আছে। সব আলাপই পশ্চিমেই হয়ে গিয়েছে (ঘটনাও) এই কথার কোন এথনোগ্রাফিক ভিত্তি নাই। কারণ সূত্রের মিল থাকলেও পরিপ্রেক্ষিত আলাদা। মানুষও আলাদা। ফলে উনি অনেক নতুন লেখার ইন্সপারেশন হতে পারেন, বন্ধ করার নন। এখানকার নিৎশিয়ানরা আবার কীভাবে নেবেন বিষয়টা কে জানে? যেহেতু আমি কুন্ডেরা মূর্খ তাই আবারো ছেঁড়া স্মৃতির দিকে তাকাই।
মনে পড়ে ফেইসবুকেই দেখেছিলাম কারো মন্তব্য যে, ‘কুন্ডেরার দার্শনিকতা কিছু হয় না’ এই জাতীয় কোনো বক্তব্য। এর পরিপ্রেক্ষিত এমন যে ঢাকাইয়া পাঠক সমাজে কুন্ডেরার জনপ্রিয়তার উত্থান আমি দেখি গত ৫-৭ বছরের মধ্যে (একান্ত আমার পর্যবেক্ষণ)। সেই পাঠকত্বের একটা হিড়িক ছিল দ্যা আনবেয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং (অস্তিত্বশীলতার অসহনীয় বায়বীয়তা) এই বইটা নিয়ে। সমাজে মুখ দেখাতে হলে এই বই পড়িতেই হইবে বা পড়া না থাকা স্বীকার করা যাইবে না এই চাপ বেশ প্রকট ছিল। তো, আমারো মনে হয়েছিল এই টাইটেলের বই জনপ্রিয় কেন হল? আপনারা বলতেই পারেন, কেন, ‘সোফির জগৎ’ ও তো বেশ বিখ্যাত। আমার একটা ব্যাখ্যা হল যে ‘নিউ এইজ’ মুভমেন্ট, মানে স্পিরিচুয়ালিটি, ইয়োগা, আত্মঅনুসন্ধান এসব আসলে একভাবে সমাজের তীব্র এলিয়েনেশনের টোটকা। এটা নিওলিবারেলরে কখনোই চ্যালেন্জ করে না। বরং সহগামী ও মিথোজীবী। যদিও মানুষ তো তীব্রভাবে ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সচেতন, সক্রিয় বা অক্রিয়, উনাদের এই সময়ের মধ্য দিয়ে যেতেই হচ্ছে। দর্শনের কাছে ফেরা তাই অবশ্যম্ভাবী। যে গভীর চাপ পাঠক অনুভব তরে কিন্তু ধরতে পারে না। ধরতে পারে কিন্তু কোনো রাজনৈতিক আউটলেট নাই তার আত্মায় এক গভীর আর্তনাদ, আনবেয়ারেবল সেই আর্তনাদ। সে চমৎকৃত হয় লাইটনেস শব্দ দেখে, আশাবাদীও হয় হয়ত। একটু তলিয়ে দেখনেওয়ালারা ভাবতে পারেন যে এটাও পশ্চিম থেকেই আসলো? পোস্টকোলোনিয়াল হ্যাংওভারের কারণে হয়ত পূর্বের (ইস্ট) লেখকরে গণ্যই করেন না।
পূর্বে ইতিহ্যবাহী পশ্চিমে সেলিব্রেটেড লেখকদের ঈর্ষাও হয়ত করেন। এদিকে গ্লোবাল ট্রেন্ড, সস্তায় বই, বই পড়া স্মার্টনেস, কমিউনিটি, বুক রিভিউ, সম্মান এবং এলিয়েনেশন স্থানিক বিচ্যুতির বোধ সব মিলিয়ে গভীর রাজনৈতিক বইটি হয়ত হাজির হয় এক পশলা নিঃশ্বাস হিসেবেই।
পনের শ শব্দ হয়ে গেল। এবার খান্ত দেই। এত লম্বা টেক্সট কি পাঠকেরা পড়বেন? শেষ করি।
সময়টা কেমন আমাদের? সময়টা কি? রাজনৈতিক? ব্যক্তিক অনুভূতির? কুন্ডেরা, আমি মনে করি খুব ভালো জানতেন যে লেখা মানেই ডায়ালগ, কনভারসেশন। হতে পারে এই কথা নিজের সাথে, অপরের সাথে, জনপ্রিয়তা, সাফল্য, খ্যাতি সমেত কিংবা না। তবে এই কথা রাজনৈতিক।
কুন্ডেরা সম্পর্কে আমি মূর্খ তবে তার টেক্সট বলে যে তিনি তীব্রভাবে অস্তিত্বের ফয়সালায় লিপ্ত একজন মানুষ। অনন্ত পুনরাবৃত্তিকে অবশ্যম্ভাবী ধরে নিয়েই তিনি নিজের এজেন্সির চেষ্টা করেছেন। না ফয়সালা হয়নি। আমাদের কারোরই ফয়সালা হয়নি। না হলেও জীবন বিচিত্র। তা না হলে আজ উনার মৃত্যুর দিনে আমি যে উনাকে নিয়ে লিখবো আমি নিজেই কি জানতাম? ফুকো হয়তো বলবেন আরে আপনার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জিনিওলজিক্যাল সেটিং ই তো এর সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত করেছিল। তবুও এতেও আমার ফয়সালা হয় না। ডায়ালগ বরং আরো বেগবান হল।
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা।
১১ই জুলাই ২০২৩