বাংলাদেশের পোশাকের একক প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারটি বাংলাদেশি পোশাকের ভালো যায়নি। এ বাজারে আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ রপ্তানি কম হয়েছে। অথচ আগের অর্থবছরে এ দেশে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫১ শতাংশের বেশি। রপ্তানিকারকরা এটিকে শঙ্কা হিসেবেই দেখছেন। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয় জার্মানি এবং পোল্যান্ডের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়ন অঞ্চলভুক্ত কিছু বড় বাজারে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তবে অপ্রচলিত বাজারগুলোতে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। পোশাকের নতুন এ বাজারগুলোতে হিস্যা ও প্রবৃদ্ধি দুটোই বেড়েছে। এর ফলে প্রধান বাজারগুলোতে রপ্তানি কম হলেও সার্বিকভাবে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধিতে রয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জন্য রপ্তানি তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) আমাদের পোশাক রপ্তানি ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়ে ২৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ বাজারে ২১ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়েছিল।
সদ্য বিদায়ী বছরে স্পেনে ৩ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার, ফ্রান্সে ২ দশমিক ৯৪, ইতালিতে ২ দশমিক ২৭, ডেনমার্কে ১ দশমিক ২৮ এবং নেদারল্যান্ডসে ১ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। এ দেশগুলোতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১ থেকে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যে ১১ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং কানাডায় ১৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে।
ইইউতে বাজার বাড়লেও জার্মানি এবং পোল্যান্ডের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়ন অঞ্চলভুক্ত কিছু বড় বাজারে পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে জার্মানিতে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৬৬৮ কোটি ডলারের, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৬ দশমিক ৮১ শতাংশ কম। এ সময় পোলান্ডে পোশাক রপ্তানি আয় ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে ১৭৩ কোটি ডলারে নেমেছে, যেখানে আগের অর্থবছরে ছিল ২০০ কোটি ডলার।
বাংলাদেশের একক দেশ হিসেবে শীর্ষ পোশাক রপ্তানি বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রপ্তানি ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯ দশমিক শূন্য ১ বিলিয়ন ডলার ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ বাজারে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কমে ৮ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে উল্লিখিত বছরে অপ্রচলিত বাজারে আমাদের পোশাক রপ্তানি ৩১ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়েছে। প্রধান অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে রপ্তানি এক বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। মোট পোশাক রপ্তানিতে অপ্রচলিত বাজারের হিস্যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৭ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ বাজারে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
জানা গেছে, চলতি বছর বিভিন্ন দেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ড। ফলে এই বাজারে চীন, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। এই পাঁচ দেশের মধ্যে চীন, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি বেশি কমেছে।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) হালনাগাদ পরিসংখ্যান থেকে এমন তথ্য মিলেছে। এতে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশ থেকে ২ হাজার ৫২১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি প্রায় ২২ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। গত বছর এই সময়ে ৩ হাজার ২৩৯ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ড।
অটেক্সার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন ৪৫২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছর একই সময়ে দেশটির রপ্তানি ছিল ৬৬৯ কোটি ডলার। সেই হিসাবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চীনে রপ্তানি কমেছে ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এই সময়ে ভিয়েতনামের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ২৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দেশটি রপ্তানি করেছে ৪৩৭ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক। গত বছরের একই সময়ে তাদের রপ্তানি ছিল ৬০১ কোটি ডলার।
প্রসঙ্গত, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্যের দেশগুলোতে সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে। এসব অঞ্চলের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি এক দশকে সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে চার দশকে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি এখন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরাও তাদের কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু পোশাকের দাম কিছুটা বাড়লেও এখনো ফেয়ার প্রাইস আসছে না। পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত পাঁচ বছরে পোশাকের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ। সম্প্রতি দাম কিছুটা বাড়লেও তারা এখনো মূল্য নিয়ে ভুগছেন।