নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ১০ দফা ঘোষণার সাত মাস পর সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের পদত্যাগের এক দফা এসেছে। দাবি আদায়ে দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সরকারের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘এক দফা দাবি আদায়ে প্রাথমিক কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। এরপরও সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে কী করে ওঠাতে হয় তা এ দেশের মানুষ ভালোই জানে।’
কর্মসূচি ঘোষণার আগে আবেগঘন কণ্ঠে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আজকের এক দফার কর্মসূচি বিএনপির কর্মসূচি নয়। ১৫ বছর ধরে ভোটাধিকার, মানবাধিকারবঞ্চিত ও দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে জর্জরিত দেশের জনগণের দাবি।’
গতকাল বুধবার রাজধানীর নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশ থেকে এক দফার পাশাপাশি কর্মসূচি হয়। একই দিন সমমনা ৩৬টি দলও এক দফা ঘোষণা করে।
বিএনপির দুদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে গিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ‘জনগণের ভোটাধিকার হরণকারী ফ্যাসিবাদী, কর্র্তৃত্ববাদী সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা, নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির এক দফা ঘোষণা করছি।’ এ দাবি আদায়ে আগামী ১৮ জুলাই মঙ্গলবার ঢাকা মহানগরীসহ সারা দেশে মহানগরী ও জেলাপর্যায়ে পদযাত্রা করবে বিএনপি। ওইদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টায় ঢাকা মহানগরীর গাবতলী থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত পদযাত্রা হবে। পরদিন ১৯ জুলাই সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা উত্তরার আব্দুল্লাহপুর থেকে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত পদযাত্রা হবে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই কর্মসূচির বাইরে দলের অঙ্গ-সংগঠনের ঘোষিত তারুণ্যের সমাবেশ ও মেহনতি মানুষের পদযাত্রা কর্মসূচিও চলবে। পাশাপাশি আইনজীবী ও পেশাজীবীদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
গত বছরের ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর গোলাপবাগে ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশে ১০ দফা দাবি ঘোষণা করেছিল বিএনপি। এরপর ৩০ ডিসেম্বর থেকে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে রাজপথে যুগপৎ কর্মসূচি পালন করে আসছে দলটি। সরকারকে পদত্যাগ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল দলটি। তাদের দাবি আমলে না নেওয়ায় এবার একদফার চূড়ান্ত আন্দোলনের ঘোষণা দিল বিএনপি। গতকাল সমাবেশ শুরুর আগেই পল্টন ও আশপাশের এলাকায় ফোনের নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সংযোগে বিপর্যয় দেখা যায়। সমাবেশে যোগ দেওয়া অনেকে বলেন, ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। ইন্টারনেট সেবাও নেই। এর আগে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর গোলাপবাগ মাঠে ১০ দফা ঘোষণার আগে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ ছিল।
সকাল থেকেই রাজধানীতে ছিল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। এর মধ্যেই নেতাকর্মীরা সকাল ৯টা থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের একাধিক জেলা থেকে নেতাকর্মীরা সমাবেশে এসেছেন। তারাই মূলত সকালের মধ্যে চলে আসেন। দুপুরের মধ্যে কাকরাইল নাইটিঙ্গেল মোড় ও অন্যদিকে ফকিরাপুল বাজার এলাকা ছাড়িয়ে আশপাশের অলিগলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবস্থান নেন নেতাকর্মীরা। এরপর বেলা ২টায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাবেশ শুরু হয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই নেতাকর্মীরা ব্যানার, ফেস্টুন, ডিসপ্লে কার্ড, জার্সি, পোস্টার, ধানের শীষ, ধানের শীষের রেপ্লিকা, ক্ষুদ্র বাদ্যযন্ত্র, ক্যাপ, টি-শার্ট গায়ে, জাতীয় ও দলীয় পতাকা হাতে করে সমাবেশস্থলে হাজির হন। তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার, দ্রব্যমূল্য কমানো, সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সেøাগান দেন। সমাবেশকে কেন্দ্র করে নয়াপল্টন ও আশপাশের এলাকা, সড়কের মোড়ে মোড়ে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকতে দেখা গেছে। রমনা, কাকরাইল, রমনা, বাংলা মোটর, বাড্ডা, রামপুরা, মগবাজার, মালিবাগ, সেগুনবাগিচা, পল্টন এলাকায় সৃষ্ট যানজটের কারণে যানবাহন অনেকটা স্থবির পড়ে। ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবী, পেশাজীবীসহ সাধারণ নাগরিকরা।
কার্যালয়ের মূল ফটক থেকে কিছুটা ডানদিকে উত্তরদিকে মুখ করে মঞ্চ তৈরি করা হয়। ট্রাকের তৈরি মঞ্চে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) নেতাকর্মীরা গান গেয়ে নেতাকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করেন। মঞ্চে বিশাল আকৃতির ব্যানারে লেখা ছিল ‘গণতন্ত্রের ঘাতক, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি ও সর্বনাশা অনাচারে লিপ্ত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পদত্যাগ এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যুগপৎ ধারায় বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের এক দফা যৌথ ঘোষণার সমাবেশ। সমাবেশস্থলে শতাধিক মাইক স্থাপন করা হয়। এ ছাড়া কয়েকটি বড়পর্দার ব্যবস্থা করা হয়।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কখনই স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না। কারণ, তারা ক্ষমতায় এসে এত বেশি লুটপাট করে, এত বেশি অত্যাচার করে যার কারণে তারা জনধিকৃত হয়। তাই তারা ভোট চুরি করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। আমরা চলমান সংকট সমাধানে সরকারকে অনেক সুযোগ দিয়েছি। আর কোনো সমাধান নেই, সমাধান একটিই তা হলো সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কারণ আমরা নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতার পরিবর্তন চাই। তবে সেই নির্বাচন আপনার মতো শেয়ালের হাতে হোক, তা চাই না।’
তিনি বলেন, ‘আপনি (শেখ হাসিনা) নির্বাচন বারবার গিলে খেয়েছেন। ২০১৪ সালে খেয়েছেন, ২০১৮ সালে একবার খেয়েছেন, আবারও খেতে চাইছেন। সেজন্য প্রশাসন সাজাচ্ছেন। কিন্তু সেই সুযোগ আর দেশের জনগণ দেবে না।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি আবারও এ অসাংবিধানিক, লুটেরা ও কর্র্তৃত্ববাদী সরকারকে বলছি, এখনো সময় আছে। এই ঘোষণার পর পদত্যাগ করুন। অন্যথায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, তখন কিন্তু পালানোর পথও পাবেন না।’
খুন, গুমের শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করে কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি দাবি করে তিনি বলেন, ‘১৫ বছর ধরে বহু নির্যাতন করেছেন। আজকের সমাবেশকে সামনে রেখে বিভিন্ন জেলার বাস বন্ধ করে দিয়েছেন। নেতাকর্মীদের আটক করেছেন।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে আপনারা শপথ নিয়েছেন সংবিধান সমুন্নত রাখার। সংবিধান মোতাবেক দায়িত্ব পালন করার। আপনারা সে দায়িত্ব পালন করুন। জনগণের বিরুদ্ধে যাবেন না।’
নয়াপল্টনে বিএনপির সমাবেশের পাশাপাশি বিকেলে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশের মধ্য দিয়ে সমমনা দলগুলো এক দফা ঘোষণা করে।
সমাবেশে অন্য নেতারা যা বললেন : সমাবেশে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমরা যখন সমাবেশ করছি তখন ওরা শান্তি মিটিং করছে। যারা দেশে খুন-গুম করে অশান্তি সৃষ্টি করেছে, তারা এখন শান্তি মিটিং করে। হিন্দিতে একটা কথা আছে, ৭০০ বিড়াল মেরে হজে যায়। আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য, আর লগি-বইঠার ঘটনা ঘটিয়ে, অশান্তি সৃষ্টি করে, গুম-খুন, মিথ্যা মামলা দিয়ে ক্ষমতায় থাকা যাবে না। এখনো সময় আছে ক্ষমতা ছেড়ে দিন। যারা অশান্তি সৃষ্টি করবে তাদের প্রতিহত করা হবে।’
স্থায়ী কমিটি সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। যারা যাবে তাদেরও জবাব দিতে হবে।’
স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘পত্রিকায় উঠেছে বিভিন্ন জেলার ডিসিদের বদলি করা হয়েছে। কারা হয়েছে? যারা মন্ত্রী, সচিব ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের ডিসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। এই পদায়নের মাধ্যমে আমরা সব নাম জেনে গেছি। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এসব ডিসি-এসপির কেউ ওই পদে থাকতে পারবেন না। বিচার বিভাগকেও সরকার দলীয়করণ করেছে। সরকার এখন ওদের দিয়ে বিরোধী দলের মিথ্যা মামলাকে ত্বরান্বিত করতে চাচ্ছে। আমরা বলতে চাই, সাবধান আপনারা সরকারের ওই ভোট চুরির প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবেন না।’
সভাপতির বক্তব্যে মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমান বলেন, ‘জনগণ আজকে রাস্তায় নেমে এসেছে। শেখ হাসিনার পায়ের নিচে মাটি নেই। এ সরকারের ক্ষমতায় আসার আর সুযোগ নেই। আজকে সমাবেশে আসতে গাবতলী, সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে বাধা দেওয়া হয়েছে। এই বাধা দিয়ে সমাবেশে জনস্রোত ওরা ঠেকাতে পারেনি। আগামী দু-তিন মাসের মধ্যেই এ সরকারের বিদায় হবে। নেতাকর্মীরা আর এ সরকারের বিদায় ছাড়া ঘরে ফিরে যাবে না।’
ঢাকা উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক ও দক্ষিণের ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনের যৌথ সঞ্চালনায় সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর, বরকত উল্লাহ বুলু, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, শামসুজ্জামান দুদু, আহমেদ আজম খান, নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, কেন্দ্রীয় নেতা ফজলুল হক মিলন, আবদুস সালাম আজাদ, কামরুজ্জামান রতন, রকিবুল ইসলাম বকুল প্রমুখ।
অঙ্গ সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা দলের সাদেক আহমেদ খান, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, যুবদলের সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের এস এম জিলানি, শ্রমিক দলের আনোয়ার হোসাইন, কৃষক দলের হাসান জাফির তুহিন, তাঁতী দলের আবুল কালাম আজাদ, জাসাসের জাকির হোসেন রোকন, মৎস্যজীবী দলের রফিকুল ইসলাম মাহতাব, ছাত্রদলের কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ প্রমুখ।
সমাবেশে আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টু, মীর নাসির, ফজলুর রহমান, মিজানুর রহমান মিনু, হাবিবুর রহমান হাবিব, জয়নুল আবদিন ফারুক, আবদুল খায়ের ভূঁইয়া, শাহজাদা মিয়া, লুতফুর রহমান খান আজাদ, মজিবুর রহমান সারোয়ার, মাহবুবউদ্দিন খোকন, খন্দতার আবদুল মুক্তাদির, আসাদুজ্জামান রিপন, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, শ্যামা ওবায়েদ, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, বিলকিস জাহান শিরিন, সালাহউদ্দিন আহমেদ, শিরিন সুলতানা, মীর সরাফত আলী সপু, রফিকুল ইসলাম, সেলিম ভূঁইয়া, নাজিম উদ্দিন আলমসহ কেন্দ্রীয় ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।