নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়ন, পরপর দুই মেয়দের অতিরিক্ত কেউ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে সংসদে ‘উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা’ প্রবর্তন এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’ সংশোধন করে পেপার-ব্যালটে ভোট প্রদান নিশ্চিত করাসহ রাষ্ট্রসংস্কারের ৩১ দফা ঘোষণা করেছে বিএনপি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ চেয়ে ‘এক দফা, এক দাবি’ ঘোষণার একদিন পর সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে এই রূপরেখা ঘোষণা করল বিএনপি।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে রূপরেখা ঘোষণা করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রূপরেখাকে দলীয় প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ের অত্যন্ত উপযোগী করে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়েছে। প্রয়োজনে ৩১ দফাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।’
এর আগে ঘোষিত ২৭ দফার মধ্যে সংবিধান সংস্কার, কমিশন গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, রেইনবো নেশন গঠন ও উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা প্রণয়নের প্রস্তাব ঠিক রেখে নতুন ৩১ দফা ঘোষণা করেছে দলটি। এর সঙ্গে দেশের সমুদ্র ও নৌবন্দরসমূহের দক্ষতা বাড়িয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিস্তারে কাজ করাসহ আরও ৪টি দফা সংযুক্ত করা হয়।
এদিকে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার বিষয়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতার বাইরে থাকলে তখন সবাই সুন্দর সুন্দর কথা বলে। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সব ভুলে যায়। স্বাধীনতার আগে জনগণ যে আশা নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিল তা আজও পূরণ হয়নি। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এরশাদের পতনের পর তিনদলীয় জোটের রূপরেখার বাস্তবায়ন হয়নি। এখন বিএনপি ক্ষমতার বাইরে তাই সুন্দর সুন্দর কথা বলছে। ৩১ দফা ভালো প্রস্তাব। কিন্তু এই দফাগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে জনগণের শঙ্কা থেকেই যাবে। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়।’
রাষ্ট্র মেরামতে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার উল্লেখযোগ্য দফাগুলো হলো: ১) প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সব মত ও পথের সমন্বয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। এজন্য অব্যাহত আলোচনা, মতবিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। এজন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। ২) বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি ‘নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। ৩) সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়ন করা হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্যের সুসমন্বয় করা হবে। ৪) পরপর দুই টার্মের (মেয়াদ) অতিরিক্ত কেউ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। ৫) বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সংসদে ‘উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা’ প্রবর্তন করা হবে। ৬) আস্থাভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধনী বিল এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত এমন সব বিষয় ছাড়া অন্যসব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রদানের সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করার বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে (দেখা হবে) বিবেচনা করা হবে। ৭) রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত এবং বিশিষ্টজনের অভিমতের ভিত্তিতে স্বাধীন, দক্ষ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠন করার লক্ষ্যে বর্তমান ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’ সংশোধন করা হবে। ইভিএম নয়, সব কেন্দ্রে পেপার-ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদান নিশ্চিত করা হবে। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন সংস্কার করা হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিল করা হবে। এছাড়া প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।
যে ধারাবাহিকতায় ৩১ দফা : বর্তমানে বিএনপি যে ৩১ দফা ঘোষণা করেছে তার সঙ্গে বিগত ওয়ান-ইলেভেনের সময় ২৫ জুন ২০০৭ গুলশানে নিজ বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব প্রয়াত আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার দলের চেয়ারপারসনের ক্ষমতা খর্ব করে ১৫ দফা সংস্কার প্রস্তাবের মিল রয়েছে। মান্নান ভূঁইয়ার প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, এক ব্যক্তি তিন বছর করে দুই মেয়াদের বেশি বিএনপির চেয়ারপারসনের পদে থাকতে পারবেন না। ইতিমধ্যে যিনি বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে ছয় বছরের বেশি ওই পদে থেকেছেন তার ক্ষেত্রেও এই বিধান প্রযোজ্য হবে। প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসন এক ব্যক্তি হতে পারবেন না। এছাড়াও যিনি দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী হবেন, তিনি আর দলের চেয়ারপারসন বা প্রধানমন্ত্রী কোনো পদেই আসতে পারবেন না। চেয়ারপারসনের ক্ষমতা খর্ব করার বিষয়ে ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘দলে চেয়ারম্যানের যে সর্বময় ক্ষমতা তা যদি খর্ব করা না হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক দল গঠন করা যাবে না। যে কোনো সময়ে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দলের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করতে হয়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন দল গঠন করেছিলেন তখনো তিনি গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে দল করেছিলেন। বিএনপির আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা আনার প্রশ্নে তারা তাদের খসড়া প্রস্তাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।
এর জবাবে বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্ধৃত করে এক বিবৃতিতে বলেন, ‘খালেদা জিয়া দলের যে কোনোরকম সংস্কারকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে বলেছেন দলের গঠনতন্ত্র সংশোধনের প্রস্তাব দলের কাউন্সিলরদের উপস্থিতিতে উপস্থাপন করতে হবে এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে দলের কাউন্সিল।
পরবর্তী সময়ে ১৯ মার্চ ২০১৬ দলের কাউন্সিলে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ‘ভিশন ২০৩০’ শিরোনামে একটি খসড়া পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, সৃজনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। জাতীয় সংসদ হবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট। এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘আগামীতে বিএনপি নতুন ধারার রাজনীতি ও সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ জন্য নতুন এক সামাজিক সমঝোতা বা চুক্তিতে উপনীত হতে বিএনপি উদ্যোগ নেবে। প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে একটি স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থার অবসানকল্পে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে। তারা সুনীতি, সুশাসন ও সুসরকারের সমন্বয় ঘটাতে চায়।
২০১৬ সালের পর গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় কাঠামো মেরামতে ২৭ দফা ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল বিএনপির ১৯ দফা কর্মসূচি ও চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষিত ভিশন-২০৩০’র আলোকে ২৭ দফা সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়েছে। এর ৭ মাস পর সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে ৩১ দফা চূড়ান্ত করে গতকাল ৩১ দফা ঘোষণা করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘‘বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল, সেই রাষ্ট্রের মালিকানা আজ তাদের হাতে নেই। বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকার নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে দেশের রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে ফেলেছে। দেশের জনগণের হাতেই দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে জয়লাভের পর বর্তমান সরকার হটানোর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি ‘জনকল্যাণমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা হবে।’’ তিনি দাবি করেন, ‘‘৩১ দফায় সাংবিধানিক সংশোধনী আনা হয়েছে। একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিশন’ গঠন করে সব বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সংশোধনী ও পরিবর্তনগুলো পর্যালোচনা করে এসব রহিত/সংশোধন করা হবে এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় সাংবিধানিক সংস্কার করা হবে। সংবিধানে গণভোট ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে।’’
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সেলিমা রহমান উপস্থিত ছিলেন।