বাংলাদেশ থেকে বছরে ১৫ থেকে ১৯ লাখ মানুষ ভারতে চিকিৎসা নিতে যান। নানা ঝামেলা পায়ে ঠেলে প্রতিবেশী দেশটিতে যান তারা। এর বড় কারণ হচ্ছে দেশে এক রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিন সেন্টারে তিন ধরনের ফল। অর্থাৎ সঠিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় না। তাই বাধ্য হয়ে ভারতে ছোটেন।
এক পরীক্ষায় তিন ফলের ঘটনা ঘটেছে দেশের প্রশাসনেও। এসিআর ঘষামাজায় তিন তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়। তিন তদন্ত কমিটি তিন ধরনের তথ্য বের করে। এসব তথ্যের ওপর ভর করে সংস্থাপ্রধানরা অনেকটা যেমন খুশি তেমন শাস্তি দিয়েছেন। আবার যারা ভিন্ন তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তারা বহালতবিয়তে চাকরি করছেন। এ অবস্থায় দুর্নীতি দমন কমিশন বুঝতে চাচ্ছে আসল ঘটনাটা কী।
গত ২১ জুন কমিশন থেকে একটি চিঠি যায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে। এই চিঠি যাওয়ার পরই তোলপাড় শুরু হয়। যে বিষয়টি ঘটনার পরম্পরায় অনেকটা থিতু হয়ে এসেছে, সেটা নিয়ে কেন নড়াচড়া শুরু করল কমিশন। তোলপাড়ের চৌহদ্দি দপ্তর, অধিদপ্তর, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালেই সীমাবদ্ধ নেই। সেটা পৌঁছে গেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ছাপিয়ে তদারকি সংস্থা পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) পর্যন্ত।
এসিআর ঘষামাজার ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৯ সালে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর ৪৭ জন শ্রম পরিদর্শকের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন ও জ্যেষ্ঠতার তালিকা পাঠায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে তা পিএসসিতে পাঠানো হয়। পদোন্নতির জন্য এসব তালিকা অপরিহার্য। পিএসসির কর্মকর্তারা দেখেন এসিআরগুলো কাটাছেঁড়া অর্থাৎ ঘষামাজা করা। তারা ফেরত পাঠান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অধিদপ্তরে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কারা এবং কোন দপ্তরে এ অপকর্ম করা হয়েছে। তা খুঁজে বের করতে প্রথম তদন্ত কমিটি হয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওই সময়ের যুগ্ম সচিব এ কে এম রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে। এরপর সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোল্লা জালাল উদ্দিনকে প্রধান করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অধিদপ্তর এসব কমিটির ওপর আস্থা না রেখে নিজেরাই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মতিউর রহমান ছিলেন একটি কমিটির প্রধান।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি দায়ী করেছে একই মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা জসিম উদ্দিনকে। অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো দুই সেট প্রতিবেদনে কোনো ধরনের ঘষামাজা ছিল না। মন্ত্রণালয়ে জসিম উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে ছিল। তিনি এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেননি বলে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে বলেছে।
অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অধিদপ্তরে কর্মরত ৩৩তম বিসিএস নন-ক্যাডার দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়। অধিদপ্তরের তদন্তে ৩৩তম বিসিএস নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের এসিআর ঘষামাজা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংবাদপত্রে প্রকাশে সহায়তার অভিযোগও আনা হয় এবং অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়বিরোধী সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে জড়িত থাকায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সুপারিশ করা হয়।
আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে যাদের এসিআর ঘষামাজা করা হয়েছে, তাদের সম্ভাব্য সুফলভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের ঘষামাজার জন্য দায়ী করা হয়েছে।
একই ঘটনায় তিন তদন্ত কমিটি তিন ধরনের ফলাফল খুঁজে পেয়েছে এবং তিনটি ভিন্ন গ্রুপকে ঘটনার জন্য দায়ী করেছে। অবিশ^াস্য এসব তদন্তের যে কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারকদের পক্ষে যায়, সেটুকুই বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের কমিটি জসিম উদ্দিনকে দায়ী করলেও শ্রম মন্ত্রণালয় তাকে তিরস্কারসূচক লঘুদণ্ড দিয়ে মন্ত্রণালয়ে বহাল রেখেছে।
অধিদপ্তরের তদন্তে ৩৩তম বিসিএসের পুরো ব্যাচকে দায়ী করা হয়। এ ব্যাচে ৮০ জন কর্মকর্তা থাকলেও ১৪ জনকে দায়ী করে বিভাগীয় মামলা করা হয়। যাদের শাস্তি দিতে পারলে অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারকদের নয়ছয় করতে সুবিধা হয়, সেই ১৪ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে সাতজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বাকি সাতজন ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় বিভাগীয় মামলার কারণ দর্শানো নোটিসের জবাব দিতে আপত্তি জানান। তারা নিয়োগকারী হিসেবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে ন্যায়বিচার চান। তাদের সবাইকে পাঁচ বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত করা হয়। পরে আপিল করলে তাদের সাজা তিন বছর কমিয়ে দুই বছর বহাল রাখা হয়।
তিন তদন্ত কমিটির মধ্যে বাকি থাকল আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি। তিন কমিটির মধ্যে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি ৩৩ ব্যাচের কর্মকর্তাদের অভিযুক্তই করেনি। এ কমিটি দায়ী করেছে পদোন্নতিপ্রত্যাশী ওই ৪৮ জন দ্বিতীয় শ্রেণির শ্রম পরিদর্শককে। এরা সম্ভাব্য সুবিধাভোগী। অর্থাৎ এসিআর ঘষামাজা করে পার পেলে তাদের পদোন্নতির দুয়ার খুলে যেত। কিন্তু এই গ্রুপটি অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারকদের আস্থায় থাকার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাইকোর্টে যখন মামলা চলে, তখন অন্য আদালতে একই বিষয়ে মামলা চলে না। তেমনি আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটির তদন্ত চলাকালে অধিদপ্তর কর্মীদের সাজা দিতে পারে না। এটা একটা ব্যত্যয় ঘটেছে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে অধিদপ্তর, যাদের অভিযুক্ত করে বিভাগীয় মামলা করে শাস্তি দিচ্ছে, আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি বলছে তারা দোষীই না।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সুবিধাপ্রত্যাশী কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারী কর্মকর্তারা ৩৩তম বিসিএস নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের ওপর দায় চাপিয়েছেন। সাক্ষ্য দেওয়া কর্মকর্তারা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, তাদের বাধ্য করা হয়েছে সাক্ষ্য দিতে। শুরু থেকেই পুরো বিষয়টি জটিল করে তোলা হয়েছে। একেক তদন্ত কমিটির একেক ফাইন্ডিংস (ফলাফল) দেখে অন্ধের হাতি দেখার গল্প মনে পড়ছে। যাই হোক, কমিশন এবার অন্তত আসল ঘটনা বের করে নিয়ে আসবে বলে তারা আশা করতে পারেন। এসিআর ঘষামাজার ঘটনাটি দেশের প্রশাসনে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী একটা বিষয়। এর সুষ্ঠু তদন্ত দরকার।
এ অবস্থায় চার বছর পর দুর্নীতি দমন কমিশন এসিআর ঘষামাজার ইস্যুটি তদন্ত শুরু করেছে। ইতিমধ্যে কলকারখানা অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিয়ে এসেছেন। শিগগিরই ওই সময়ের এসিআর ঘষামাজা প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডাকা হবে। এ ছাড়া তিন তদন্ত কমিটির সদস্যদের ডাকার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানা গেছে।
অধিদপ্তর গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের বর্তমান যুগ্ম মহাপরিদর্শক মতিউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন এসিআর ঘষামাজার তদন্ত করছে কি না, তা জানতে হলে প্রশাসন শাখায় যোগাযোগ করতে হবে। তারাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবে।