২২ বছর আগে ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশা শনাক্ত হয়। পর্যাপ্তসংখ্যক কীটতত্ত্ববিদের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু হলেও বছর না যেতেই তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন গতানুগতিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ হচ্ছে। ফেলে আসা সময়ের কোনো মৌসুমে ডেঙ্গুর বিস্তার বেশি ছিল, কোনো মৌসুমে ছিল কম। মাঝখানে ১৫ বছর এ রোগটি নিয়ে মানুষের দুর্ভাবনা ছিল না।
২০০০ সালে দেশে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তখন থেকে তিন বছর রোগটি আতঙ্ক ছড়িয়ে মাঝখানে আক্রান্ত ও মৃত্যু এতটাই কম ছিল যে মানুষ রোগটির কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। ২০১৮ সালে আবার আশঙ্কাজনক হারে এর প্রকোপ শুরু হয়। পরের বছর ভয়াবহ আকার ধারণ করে। করোনা মহামারীর প্রথম বছর ২০২০ সালে কম ছিল। পরের বছর মৃত্যু ১০০ ছাড়িয়ে যায়। ২০২২ সালে এসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ৩০০-এর কাছাকাছি পৌঁছে যায়। চলতি বছর এর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ডেঙ্গুর জীবাণুর বাহক এডিস মশার বিস্তার বেড়েছে। এ ছাড়া রোগটির প্রকোপ বাড়া-কমা নির্ভর করে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কম-বেশি হওয়ার ওপর।
সংশ্লিষ্ট সংস্থা তাদের ওপর অর্পিত কাজকে গুরুত্ব না দেওয়ায় এখনো যথাযথ পদ্ধতিগত কাঠামো গড়ে ওঠেনি। যথাযথ পদ্ধতি হচ্ছেÑ কীটতত্ত্ববিদের নেতৃত্বে টিম গঠন করতে হবে। টিম এডিস মশার সর্বোচ্চ জমায়েতের স্থান শনাক্ত করবে। এরপর সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করবে। পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা করে মশার প্রজনন-ধারা বুঝবে এবং বাহিত ভাইরাসের চরিত্র শনাক্ত করবে। কী মাত্রার প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে তার পূর্বাভাস জানাবে এবং নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেবে। সারা বছর এভাবে কাজ চলমান রাখতে হবে। এভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে কলকাতাসহ অনেক শহর সফলতা পেয়েছে।
ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা জেঁকে বসেছে দেশে। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৮৩১ জন; মারা গেছে ৯৫৬ জন। কীটতত্ত্ববিদ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে দেশে প্রথম ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। সেবার ৫ হাজার ৫৫১ জন ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়; আর মারা যায় ৯৩ জন। প্রথমবারের মতো মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসের খবরে ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষ আতঙ্কিত হয়। তৎকালীন সরকার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়।
অভিজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদদের নিয়ে ৬টি টিম গঠন করা হয়। কীটতত্ত্ববিদরা টিমের নেতৃত্বে ছিলেন। প্রতিটি টিম ৬টি করে ওয়ার্ডে কাজ করেছে। টিমের সদস্যরা মশার প্রজননস্থলে লার্বিসাইড ছিটিয়ে মশা ধ্বংস করতেন। ফগিং মেশিন দিয়ে উড়ন্ত মশাও মারা হতো। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের প্রথম বছরে জোরালো কার্যক্রম চালানো হয়। গবেষণাগার না থাকলেও তখন অভিজ্ঞ কীটতত্ত্ববিদরা প্রতি মাসে ন্যূনতম ৮৪টি ওয়ার্ডে দুইবার করে ভিজিট করতেন। হাতে-কলমে মানুষকে মশা নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করতে হবে তা শেখানো হতো। কয়েক বছর সুফলও মিলেছে।
২০০০ সালেই বৈজ্ঞানিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে এ ধরনের উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি। ফলে এখন ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশা বেড়েছে। শুরুতে যেসব কীটতত্ত্ববিদ কাজ করেছিলেন, তাদের ধরে রাখতে পারলে এ সময়ে ডেঙ্গু নিয়ে এত দুশ্চিন্তার কারণ থাকত না। এত দিনে একটা সিস্টেম দাঁড়িয়ে যেত। কীটতত্ত্ববিদদের মূল্যায়ন না হওয়ায় তারা অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। এখন চাহিদা থাকলেও যথেষ্টসংখ্যক কীটতত্ত্ববিদ মেলে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০০০ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল ৫ হাজার ৫৫১ জন এবং মারা গিয়েছিল ৯৩ জন। ২০০১ সালে আক্রান্ত হয় ২ হাজার ৪৩০, মারা যায় ৪৪ জন; ২০০২ সালে আক্রান্ত হয় ৬ হাজার ২৩২, মারা যায় ৫৮ জন; ২০০৩ সালে আক্রান্ত হয় ৪২৬, মারা যায় ১০ জন; ২০০৪ সালে আক্রান্ত হয় ৩ হাজার ৪৩৪, মারা যায় ১৩ জন; ২০০৫ সালে আক্রান্ত হয় ১ হাজার ৪৮, মারা যায় ৪ জন; ২০০৬ সালে আক্রান্ত হয় ২ হাজার ২০০, মারা যায় ১১ জন; ২০০৭ সালে আক্রান্ত হয় ৪৬৮, কেউ মারা যায়নি; ২০০৮ সালে আক্রান্ত হয় ১ হাজার ১৫৩, কেউ মারা যায়নি; ২০০৯ সালে আক্রান্ত ৪৭৪, কেউ মারা যায়নি; ২০১০ সালে আক্রান্ত ৪০৯, কেউ মারা যায়নি; ২০১১ সালে আক্রান্ত ১ হাজার ৩৫৯, মারা যায় ৬ জন; ২০১২ সালে আক্রান্ত হয় ৬৭১, মারা যায় ১ জন; ২০১৩ সালে আক্রান্ত হয় ১ হাজার ৭৪৯, মারা যায় ২ জন; ২০১৪ সালে আক্রান্ত হয় ৩৭৫, কেউ মারা যায়নি; ২০১৫ সালে আক্রান্ত হয় ৩ হাজার ১৬২, মারা যায় ৬ জন; ২০১৬ সালে আক্রান্ত হয় ৬ হাজার ৬০, মারা যায় ১৪ জন; ২০১৭ সালে আক্রান্ত হয় ২ হাজার ৭৬৯, মারা যায় ৮ জন; ২০১৮ সালে আক্রান্ত হয় ১০ হাজার ১৪৮, মারা যায় ২৬ জন; ২০১৯ সালে আক্রান্ত হয় ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪, মারা যায় ১৭৯ জন; ২০২০ সালে আক্রান্ত হয় ১ হাজার ৪০৫, মারা যায় ৭ জন; ২০২১ সালে আক্রান্ত হয় ২৪ হাজার ৪২৯, মারা যায় ১০৫ জন; ২০২২ সালে আক্রান্ত হয় ৬২ হাজার ৩৮২, মারা যায় ২৮১ জন; ২০২৩ সালের ১২ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১৬ হাজার ১৪৩, মারা গেছে ৮৮ জন।
কীটতত্ত্ব¡বিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক এডিস মশা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছে। পরিবেশ ও আবহাওয়া বিবেচনায় কোনো বছর কম, কোনো বছর বেশি বিস্তার লাভ করে। ২০০০ সালে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এডিস মশা শনাক্ত করার পর এখনকার পর্যায় আসতে সাড়ে ২২ বছর লেগেছে। এ সময়ে বিজ্ঞানভিত্তিক মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতো। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার অনীহার কারণে তা হয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক। বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে সরকারকে বৈজ্ঞানিক মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া বিকল্প নেই।’
কীটতত্ত্ব¡বিদ ড. জি এম সাইফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০০ সালে ডেঙ্গুর বিস্তার শুরু হলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এক বছরের মধ্যে ওই কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সঠিক পদ্ধতি না হলে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটবে না। কলকাতায় বিজ্ঞাননির্ভর পদ্ধতি অনুসরণে সফলতা মিলেছে। সেখানে তারা বাসা-বাড়ির ভেতরেও মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। ঢাকায়ও মশা নিয়ন্ত্রণে বাসা-বাড়ির ভেতরে ঢুকতে হবে।’
কীটতত্ত্ব¡বিদ ও অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০০ সালে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর বছরখানেক সঠিক নিয়মে কাজ করেছে সিটি করপোরেশন। এরপর গতানুগতিক পদ্ধতিতে কাজ শুরু করে। ফলে ঢাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের সঠিক পদ্ধতি গড়ে ওঠেনি, যে কারণে এখন চরম মূল্য দিতে হচ্ছে ঢাকাবাসীকে। ঢাকার এই ব্যর্থতা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। নগরের এ সমস্যায় ভুগছে গ্রামের মানুষও। যেখানেও মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো কাঠামো নেই।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা লে. কর্নেল ডা. মো. গোলাম মোস্তফা সারওয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত এক-দেড় দশকে ঢাকায় অনেক নগরায়ণ হয়েছে। বিভিন্ন অবকাঠামো হয়েছে। সেসব জায়গায় পানি জমে থাকাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এসব জায়গায় প্রচুর মশার প্রজনন ঘটছে। বাসা-বাড়িতেও প্রচুর এডিস মশার প্রজনন ঘটছে। বাড়িওয়ালা বা নগরবাসী সচেতন নয়। আমরা এখন ড্রোন ব্যবহার করে বহুতল ভবনের মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে অভিযান চালাচ্ছি।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. ফজলে সামছুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, বহুতল ভবন নির্মাণ ও শহরে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে পানি জমার স্থান তৈরি হয়েছে। প্লাস্টিকের ব্যবহারও বেড়েছে। বিভিন্ন জায়গায় প্লাস্টিকের পাত্র পড়ে থাকে। এসব জায়গায় মশার প্রজনন ঘটছে। ডিএসসিসিতে মশা নিয়ন্ত্রণে যথাপদ্ধতির ঘাটতি রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সেসব সমস্যার সমাধান বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। আশা করি, এসব দুর্বলতার নিরসন হবে। মশা নিয়ন্ত্রণে নগরবাসীকেও এগিয়ে আসতে হবে।’