‘হামার ব্যাটা ডিসি অফিসোত চাকরির আবেদন করছিলো। দুই দিন আগোত হামাক জানাচে মা, পরিক্ষে দেওয়ার জন্নে বাড়িত আসপ্যার চাচিলো। বেতন পামো, সেই ট্যাকা নিয়া বাড়িত আসমো। কিন্তু ব্যাটা হামার বাড়িত আসলো লাশ হয়া। হামারঘরের সগকিচু শ্যাস হয়া গেলো। মাও-বাপের সুকের জন্ন দুনাত থাক চলি গেল। সুখের আশায় ব্যাটাক হারালাম। হামরা একন কাকে নিয়া বাঁচমো।’
গতকাল শনিবার দুপুরে এভাবেই আহজারি করছিলেন চট্টগ্রামে জাহাজের বিষাক্ত গ্যাসে নিহত গাইবান্ধা সদর উপজেলার পশ্চিম কুপতলা গ্রামের নিহত রানা মিয়ার (২৩) মা মনোয়ারা বেগম। এ সময় তার পাশে দাঁড়ানো রানার বোন পিংকি রানী আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের গরিব মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। এভাবে কত মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেল। তার বিচার হয় না। নিহত রানা মিয়া ওই গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে। গতকাল সকাল ১০টায় অ্যাম্বুলেন্সে রানার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে। এদিন বাদ জোহর গ্রামে তার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।
পারিবারিক সূত্র জানায়, রানা ২০২৩ সালে সাদুল্লাপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর সীতাকু-ের ওই কারখানায় শ্রমিকের কাজ নেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি রানা কখনো প্রাইভেট ও আবার কখনো শ্রমিকের কাজ করতেন। তার বড় ভাই মোনারুল ইসলাম চট্টগ্রামে আরেকটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। একমাত্র বোন পিংকির বিয়ে হয়েছে। নিহত রানার আয় দিয়েই তার মা-বাবার সংসার চলত।
মোনারুল ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে বাড়িতে আসেন। তিনি বলেন, রানা গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে চাকরির জন্য আবেদন করেছিল। আগামী ২১ আগস্ট লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার জন্য এ সপ্তাহে বেতন নিয়ে বাড়িতে আসার কথা ছিল। কিন্তু সেটা আর হলো না। বাড়িতে এলো লাশ হয়ে। ভেবেছিলাম, দুই ভাই মিলে সংসারের অভাব দূর করব। সেজন্য তাকে ২০২৩ সালের দিকে চট্টগ্রাম নিয়েছিলাম। রানার কোম্পানিতে কোনো নিরাপত্তা ছিল না। ঝুঁকি নিয়ে কাজ করত। তিনি কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। রানার বাবা হারুন অর রশিদ চোখ মুছতে মুছতে বলেন, আমি অসুস্থ মানুষ। কোনো জমিজমা নেই। ছেলের টাকায় চিকিৎসা চলত। এখন ছেলে নেই। এই বলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এদিকে চট্টগ্রামে বিষাক্ত গ্যাসে নিহত হন গাইবান্ধার আরেক যুবক খোকন মিয়া (২৬)। তিনি সুন্দরগঞ্জের ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত হলদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা বর্গাচাষি মো. রানা মিয়া বলেন, ‘মানসের জমি আদি করি। তাক দিয়ে সোংসারোত চলে না। ম্যালা অবাব। ব্যাটার ট্যাকা দিয়া অবাব মিটানো, তাক হলো না। হামার ব্যাটার খতি হামরা কেমন করি পোসামো।’ এ সময় খোকনের মা উর্মি বেগম আহাজারি করে বলেন, ‘হামরা কিচু বুজি নে। তোমরা হামার ব্যাটাক আনি দাও বলে অজ্ঞান হয়ে যান।’
দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে খোকন সবার ছোট। বড় ভাই উজ্জ্বল মিয়া কৃষিকাজ করেন। বোনের বিয়ে হয়েছে। খোকনের স্ত্রী দুই বছরের এক সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। প্রায় ৬ মাস আগে খোকন চট্টগ্রামে জাহাজ কোম্পানির চাকরিতে যান। গত শুক্রবার খোকনের পরিচিতরা তার পরিবারকে মৃত্যুর খবর জানায়।
গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় কিশামত হলদিয়া গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে খোকনের দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে সকালে অ্যাম্বুলেন্সে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে বাবা-মা এবং স্বজনদের আহাজারি শুরু হয়।
প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের সীতাকু-ের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল নামে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় পুরনো জাহাজের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জন নিহত হয়েছেন। ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামের একটি কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ৯ শ্রমিক নিহত হন।