উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতে কুড়িগ্রামে ধরলা-দুধকুমার, লালমনিরহাট ও রংপুরে তিস্তার পানি বেড়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে তিন জেলার নিম্নাঞ্চল ভেসে গিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। কুড়িগ্রামেই বন্যাকবলিত ১৫ হাজার বাসিন্দা। তলিয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত। জামালপুরে যমুনার পানি বাড়লেও বিপদসীমার নিচে রয়েছে।
আমাদের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, গতকাল শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুধকুমার নদের পানি ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধরলার পানি ৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। এ ছাড়া শিমুলবাড়ী পয়েন্টে ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও এখনো বিপদসীমার নিচে আছে।
জেলার নাগেশ^রী উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নে দুধকুমার নদের বাঁধ উপচে প্রায় ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের সিতাইঝাড় এলাকার আইয়ুব আলী বলেন, হঠাৎ করে পানি বাড়ায় বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। তারা ভাবতেও পারেননি এক রাতেই এত পানি হবে।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাঈদুল আরীফ জানান, চিলমারী, উলিপুর, সদর, নাগেশ্বরী, রাজারহাট ও ভূরুঙ্গামারীসহ বন্যায় কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, উজানের পাহাড়ি ঢল আর ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে প্লাবিত হয়ে পড়েছে তিস্তার দুই কূল। পানির চাপ নিয়ন্ত্রণে ডালিয়া ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল সকাল ৬টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের পয়েন্টে তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫২ দশমিক ৫৫ সেন্টিমিটার, যা বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দুপুর ১২টায় পানি কিছুটা কমে ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বিকেল ৩টায় পানি কমে ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে জেলার পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
গবাদি পশু-পাখি নিয়ে বন্যার্তরা উঁচু স্থানে অবস্থান নিয়েছেন। নলকূপ, টয়লেটে পানি ওঠায় বিশুদ্ধ পানির সংকট ও স্যানিটেশন সমস্যায় পড়েছেন তারা। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। পানিতে তলিয়ে গেছে আমন ধানের ক্ষেত ও বীজতলা।
গোবর্ধন এলাকার আজিজার রহমান বলেন, ‘বাড়িতে বুকসমান পানি। সব ডুবে গেছে। রাতে রুটি খেয়ে আছি। সকাল থেকে পেটে কিছু পড়ে নাই।’
ওই এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ স্পার বাঁধে কথা হয় আলেমা বেগম নামের ষাটোর্ধ্ব এক নারীর সঙ্গে। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে বাড়িতে পানি ওঠা শুরু করে। মাঝরাতে বিছানাসমান পানি হয়।
রংপুর প্রতিনিধি জানান, তিস্তা, ধরলা, বুড়ি তিস্তা ও সানিয়াজান নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলাসহ জেলার তিস্তা নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের অধিকাংশ গেট খুলে দেওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছে। প্রচ- গতিতে পানি বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। আরও কী পরিমাণ পানি আসবে তা ধারণা করা যাচ্ছে না। পানির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে তিস্তা ব্যারাজের অধিকাংশ গেট খুলে দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বিকেলে সরেজমিন দেখা যায়, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় গঙ্গাচড়া উপজেলার মটুকপুর, চিলাখাল, বিনবিনা, চর নোহালী, ছালাপাক আলালের চর, ইশোরকোল, খলাইয়ের চর, কাশিয়াবাড়ীর চর, ইচলি, চল্লিশসাল চরে বসবাসকারী পরিবারগুলো ফের পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কয়েক হাজার একর আমন ধানের বীজতলাসহ অনেক ফসলি জমি তিস্তার পানিতে ডুবে গেছে। ইতিমধ্যে চর এলাকাগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে গেছে।
চল্লিশসাল গ্রামের বাসিন্দা কান্দুরা মুন্সি বলেন, ‘চরে থাকা পরিবারগুলো গরু, ছাগল নিয়া নৌকাত করি উঁচু জায়গাত আসিবার লাগতেছে।’
বাগেরহাট এলাকার সাইয়েদুল ইসলাম বলেন, তাদের বাপ-দাদার ভিটামাটি সবকিছুই নদীর পাড়ে। সে জন্য প্রতি বছর বন্যার কবলে পড়তে হয়। বাঁধ দিয়ে নদী শাসন করার জন্য মিছিল-মিটিং হয়। কিন্তু হয় না। সরকার এটা করলে তাদের উপকার হয়।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদ্দৌলা বলেন, দুই দিন তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নদীর অববাহিকায় চরাঞ্চলের মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়ার জন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
জনপ্রতিনিধিদের বরাত দিয়ে নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, তিস্তার পানি বাড়ায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা অববাহিকার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাঁপানী, ঝুনাগাছ চাঁপানী, গয়াবাড়ি ও জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ি, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের ১৭টি চরাঞ্চলের জনপদের বসতবাড়িতে প্রবেশ করেছে বন্যার পানি। বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ওই সব এলাকার বাসিন্দারা। এ ছাড়া ফসলি জমি উজানের ঢলে তলিয়ে গেছে। ফসলি জমি, গবাদিপশুসহ ঘরবাড়ি নিয়ে দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে পানিবন্দি পরিবারগুলো। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিস্তাপাড়ের মানুষজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলেছে কর্তৃপক্ষ।
নীলফামারীর পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান জানান, তার এলাকার ঝাড়সিংহেশ^র ও পূর্ব ছাতনাই সড়কের খানাপাড়া এলাকায় বন্যার পানির তোড়ে সড়কের একটি অংশ বিধ্বস্ত হয়েছে। ফলে দুই এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
জামালপুর সংবাদদাতা জানান, জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলায় যমুনা নদীর পানি আবারও বেড়েছে।
জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বাড়লেও বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিমাপক আব্দুল মান্নান বলেন, তিন-চার দিন পানি বাড়বে। এখনো কোনো এলাকা প্লাবিত হয়নি। বড় ধরনের কোনো বন্যার আশঙ্কা নেই বলে জানান তিনি।