তারুণ্যের শক্তিতে উড়ে গেল আফগান আতঙ্ক

টিকিট বিক্রির আনুষ্ঠানিক হিসাব বলছে, গতকাল শুক্রবার রাতে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মাঠে বসে খেলা দেখেছেন সাড়ে ১৮ হাজার দর্শক। তবে অনানুষ্ঠানিক হিসাবে সংখ্যাটা আরও বেশি। চা বাগানের ভেতর দিয়ে গ্রিন গ্যালারিতে অনুপ্রবেশ করেছেন অনেকেই, খাতিরের লোক হিসেবেও কেউ কেউ নিশ্চয়ই বিনা টিকিটেও ঢুকেছেন। যে হাজার বিশেক মানুষ ছুটির দিনের সন্ধ্যাটাকে শুধুই ক্রিকেটের উদ্দেশে নিবেদন করে, বৃষ্টির শঙ্কা মাথায় নিয়েও টাকা খরচ করে টিকিট কেটে মাঠে এসেছেন, তাদের আসাটা বিফলে যায়নি। সিলেটের মাঠে বাংলাদেশের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ জয়ের সাক্ষী হিসেবেই ফিরেছেন বাড়ি, সঙ্গে নিয়ে গেছেন রোমাঞ্চকর এক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতা। যে ম্যাচে হ্যাটট্রিক, চার, ছয়, শেষ ওভারের রোমাঞ্চ... কোনো কিছুরই কমতি নেই!

আবহাওয়ার মতোই ক্ষণে ক্ষণে বদলেছে ম্যাচের রঙ। আফগানিস্তানের ইনিংসের প্রথম পাঁচ ওভার দেখে অনেকেই মনে করতে পারেন, এই দলটা চট্টগ্রামে এত রান করল কী করে! তাসকিন, শরিফুলদের বল বিষাক্ত সাপের মতোই ছোবল দিচ্ছে। তার সামনে অসহায় আইপিএল মাতানো রহমানউল্লাহ গুরবাজ আর ইব্রাহিম জাদরান। মাঝের ওভারগুলোতে মোহাম্মদ নবির দায়িত্বশীল ইনিংসে দর্শকরা খুঁজে পাবেন অভিজ্ঞতা আর দায়িত্বশীলতার উপলব্ধি। শেষবেলায় আজমতউল্লাহ ওমরজাইর ব্যাটিংয়ের সামনে তাসকিন-মোস্তাফিজদের অসহায় অবস্থা দেখে হয়তো চোখ রগড়াবেন, এরাই না শুরুতে ছিল রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য! ১৫ ওভার শেষে ৫ উইকেটে ৯৪ থেকে ২০ ওভার শেষে ৭ উইকেটে ১৫৪ রান। শেষ পাঁচ ওভারে ৬০ রান, টি-টোয়েন্টিতে যা দস্তুরই। ৪০ বলে ৫৪ রানের ইনিংস খেলে নবি আগলেছেন হাল, ৪ ছক্কায় ১৮ বলে ৩৩ রানে ওমরজাই দিয়েছেন গতি। তাতে আফগানরা পেয়েছে লড়াইয়ের পুঁজি, যে লড়াইটা তারা চালিয়ে গেছে শেষ অবধি।

ম্যাচ শেষে আফগানদের ইংরেজ কোচ জনাথন ট্রটও এসে বলে গেলেন, মাঝের একপশলা বৃষ্টির পরই পাল্টে গেছে ম্যাচের রঙ, ‘আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম, ছন্দটাও পেয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের পেসাররা খুব ভালো করছিল। কিন্তু বৃষ্টির পর সবকিছু বদলে যায়। স্পিনারদের বল ধরতে অসুবিধা হচ্ছিল, সেই সঙ্গে ফিল্ডিং করাটাও হয়ে উঠেছিল কঠিন।’

রনি তালুকদার শুরু করেছিলেন বাউন্ডারি মেরে, এরপর ফজল হক ফারুকির ইনসুইঙ্গারে বোকা বনে বোল্ড (৪)। নাজমুল হোসেন শান্ত ডাউন দ্য উইকেটে এসে বল গায়ে লাগিয়ে প্লেইড অন (১৪), লিটন দাস পুল করতে গিয়ে তুলে দিলেন মিড অনে (১৮)। সাকিবও যখন ১৯ রান করে বিদায় নিলেন, তখন অনেকেই গ্যালারি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। কোণঠাসা অবস্থাটা থেকে জেতালেন তাওহীদ হৃদয়। অনেক ম্যাচে কাছে গিয়েও হেরে হৃদয় ভাঙার বেদনায় পুড়েছে বাংলাদেশ, শত শঙ্কার পরও হৃদয় সেই অভিজ্ঞতাটার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দিলেন না। যুব বিশ্বকাপ জয়ের সতীর্থ শামীম হোসেন পাটোয়ারীকে নিয়ে যোগ করলেন ৪৩ বলে ৭৩ রান। যখন মনে হচ্ছিল জয়টা স্রেফ সময়ের ব্যাপার, তখনই আফগানদের শেষ আঘাত। শামীম আউট রশিদ খানের শেষ ওভারে, এরপর জয়সূচক রানটার আগে করিম জানাতের টানা তিন শিকার। হৃৎকম্পন বেড়ে যাওয়া ম্যাচটায় তুলির শেষ টান শরিফুলের। করিম জানাতের হ্যাটট্রিকের আনন্দ মুছে দিয়ে কাট করে বল পাঠালেন বাউন্ডারির বাইরে। তাতেই ২ উইকেটের জয় বাংলাদেশের, এক বল হাতে রেখে।

হৃদয়, শামীম আর শরিফুল; তিনজনই ছিলেন ২০২০ সালের যুব বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য। অভিজ্ঞরা যেদিন পথ হারিয়েছেন, সেদিন এ তিন তরুণই দেখিয়েছেন জয়ের আলো। তারুণ্যের শক্তিতেই উড়ে গেছে আফগান আতঙ্ক। এমন ম্যাচের পর হৃদয় তাই এসে দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলতে পেরেছেন, ‘যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই এমন জয় মনোবল আর জয়ের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দেয়।’