পাড়া-মহল্লায় এমন কি গ্রামে বসবাসরত প্রতিবেশীদের মধ্যে একসময় সামাজিক বন্ধন ছিল, একই অঞ্চলে বসবাসের সুযোগে। সামাজিক জীবনাচারে অভ্যস্ত মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির সেই আচারই পাড়া সংস্কৃতি। ১৯৫০ সালের শুরুতে জীবন-জীবিকার তাগিদে ও পেশার কারণে পরিবার সমেত মানুষ শহরে বসবাস শুরু করে। এর পূর্বে আমাদের মধ্যবিত্তদের আবাস ছিল কলকাতা। দেশের সব শহরই তখন ছিল মফস্বলীয় আদলে অন্ধকারাচ্ছন্ন। পূর্ব বাংলা পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রদেশে পরিণত হওয়ার পর, ক্রমেই শহরের আদল- আকৃতি পাল্টে যায়। শহরগুলোর আয়তন-পরিধি এবং গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। খোদ ঢাকাই তখন ছিল ছোট পরিসরের মফস্বলীয় এক ছোট্ট শহর। দেশের অন্য শহরগুলোর অবস্থা ছিল আরও শীর্ণ ও ক্ষুদ্র পরিসরে।
দেশের শহরগুলোতে স্থানীয়দের বসবাস বংশানুক্রমিক। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আত্মীয়-অনাত্মীয় প্রত্যেক পরিবার ও ব্যক্তির মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক ছিল। যেমনটি গ্রামে ছিল এবং আছেও, তবে পূর্বের তুলনায় ভাটির টান পড়েছে। গ্রামেও সামাজিকতার সম্পর্ক-সম্প্রীতি পূর্বের তুলনায় কম হলেও, এখনো আছে। কিন্তু শহরে সেটা একেবারেই নেই। অথচ পেশা ও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ শহরমুখী হওয়ার পর, শহরের পরিসর বৃদ্ধিতে শহরের মানুষের সংখ্যাও বেড়ে যায়। গড়ে ওঠে নতুন শহর, নতুন নতুন আবাসিক এলাকা। এই শহরগুলোতে বসবাসকারীরা সবাই দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রাম থেকে আগত। অঞ্চলভেদে প্রত্যেক পাড়ায় বসবাসকারীদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের নিবিড় সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হয়। সেটা অভিভাবক থেকে সমবয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করে। প্রতিটি পাড়ায় ক্রমান্বয়ে গড়ে ওঠে তরুণ-যুবকদের ক্লাব। এই ক্লাবকে কেন্দ্র করে ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও পাঠাগার গড়ে ওঠে। অর্থাৎ একটি সাংস্কৃতিক বলয়ের সৃষ্টি হয়। প্রত্যেক পাড়ায় মাঠ ছিল। ছিল সুপরিসর খোলামেলা স্থান। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, গান, নাচ, আবৃত্তি, বিতর্ক, দেয়াল পত্রিকা, সংকলন প্রকাশ, বার্ষিক নাটক মঞ্চায়ন-বিচিত্রানুষ্ঠান প্রভৃতি কর্মকাণ্ডে ছিল মুখরিত। জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন কচি-কাঁচার মেলা, মুকুল ফৌজ, খেলাঘর আসর, চাঁদের হাটের শাখা সংগঠন ছিল পাড়ায়-পাড়ায়। এতে কিশোর বয়সী প্রত্যেকের মননশীলতা, সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। জাতীয় বিভিন্ন দিবস কেন্দ্র করে পাড়ায় পাড়ায় সংকলন প্রকাশ করা ছিল অনিবার্য। প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশাপাশি স্থানীয়দের রচনাও সংকলনে ঠাঁই পেত। সেই সংকলন পাড়ায় এবং বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে প্রকাশনার খরচ নির্বাহ করা হতো। অর্থাৎ শহরের প্রায় প্রতিটি পাড়ায় সামাজিকতার প্রাণবন্ত পরিবেশ বিরাজ করত। পাড়া সংস্কৃতির মাধ্যমেই প্রজন্মান্তরে দেশের খ্যাতিমান সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়াবিদ অজস্র ব্যক্তির প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।
ধর্মীয় সামাজিক উৎসব-পার্বণে সবাই সবার বাসায় যাওয়া-আসা ছিল অনিবার্য। সামষ্টিক সামাজিকতায় নিজেকে অনিরাপদ ভাবার অবকাশ ছিল না। ছিল না একাকিত্বের অসামাজিক জীবনযাপনও। পাড়া সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক মানবিক সমাজ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু স্বাধীন দেশে দ্রুতগতিতে সেই সামষ্টিক সামাজিকতা লোপ পেতে পেতে এখন আর অবশিষ্ট কিছু নেই। এখন গ্রামেও প্রজন্মান্তরে সবাই আর সবাইকে চেনে না। ঠিকুজি জানার পর হয়তো চেনে। গ্রামগুলোতেও ছিল এক বা একাধিক ক্লাবঘর। সেখানে খেলাধুলার পাশাপাশি নানাবিধ
সাংস্কৃতিকচর্চার ক্ষেত্র উন্মুক্ত ছিল। প্রতি শীত মৌসুমে প্রতিটি ক্লাবের আয়োজনে নাটক মঞ্চায়ন, যাত্রা, পালাগান, বিচিত্রানুষ্ঠান হতো। এতে স্থানীয়রাও অংশ নিত। উচ্চশিক্ষার পর পেশার কারণে অনেকে গ্রাম ত্যাগ করে শহরে চলে যায়। অনেকের গ্রামে জীবন-জীবিকার ভিত্তি থাকলেও নিজ সন্তানদের উন্নত শিক্ষার অভিলাষে পরিবার সমেত শহরের ভাড়া বাসায় চলে যাচ্ছে। এই প্রবণতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। নিজেরা গ্রামের স্কুলে শিক্ষাগ্রহণ করলেও নিজ সন্তানদের ক্ষেত্রে গ্রামের শিক্ষাঙ্গনের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। তাই পেশা ও জীবিকা গ্রাম বা জেলা শহরকেন্দ্রিক থাকলেও তারা সন্তানদের শহরের উন্নত-আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার অভিপ্রায়ে গ্রাম ত্যাগ করে শহর অভিমুখে ছুটছে। এতে সাংস্কৃতিকভাবে গ্রাম আরও দরিদ্র হয়ে পড়েছে। সমষ্টিগত সাধারণ মানুষই এখন গ্রামে বসবাস করে। গ্রামে এখন ব্যান্ডশোসহ হিন্দির আগ্রাসন ঢুকে গ্রামের আদি সংস্কৃতি এবং সমষ্টিগত সামাজিকতা পরিহারের প্রবণতা ক্রমেই তীব্রতর হয়ে পড়েছে। আমাদের সংস্কৃতির অন্তর্গত সাংস্কৃতিক বিনোদনও প্রায় পরিত্যক্ত। প্রযুক্তির উন্নয়নের ছোঁয়া শহর পেরিয়ে গ্রামে প্রবল বেগে বিস্তার লাভ করেছে। আমরা ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক যান্ত্রিক জীবনাচারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছি। গ্রামও সেই রাহুমুক্ত কিন্তু আর নেই।
শহরের যে পাড়া সংস্কৃতি ছিল, সেটা ফ্ল্যাট সংস্কৃতির প্রবল প্রভাবে এবং বিদ্যমান ব্যবস্থায় টিকতে পারেনি। শহরের সর্বাধিক বাড়ি ছিল একতলা-দোতলা। সরকারি কলোনিগুলো সর্বাধিক তিনতলা। এখন শহরে বহুতল অট্টালিকায় চাপা পড়েছে শহরের অতীত সংস্কৃতি-সামাজিকতা। পাশাপাশি ফ্ল্যাটে বসবাস করলেও কারও সঙ্গে কারও সামাজিক সম্পর্ক নেই। সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে কেউ কারও নয়। সবাই নিজ পরিবারকেন্দ্রিক। শহরে এখন মাঠ খুঁজে পাওয়া যায় না। নেই উন্মুক্ত খোলামেলা স্থানও। পুঁজিবাদী উন্নয়ন সবই গ্রাস করে নিয়েছে। পয়ঃবর্জ্য, বৃষ্টির পানি নির্গত হতে না পারার কারণে জলাবদ্ধতার মধ্যে আটকা পড়েছে শহরের মানুষ। বাস্তবে নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত শহরের মানুষ। এ সব দুরবস্থা থেকে পরিকল্পিত উপায়ে নিষ্কৃতি পাওয়ার উপায় নেই। কেননা রাষ্ট্র, সরকার এবং নগরের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের, স্থানীয় সরকারের ন্যূনতম উদ্যোগ-পরিকল্পনা বলে বাস্তবে কিছুই নেই।
প্রশ্ন থাকে আমাদের সামাজিক জীবন ১৮০ ডিগ্রি উল্টে যাওয়ার মূল কারণ কী? অনেকে বলবেন কালের বিবর্তন। সেটা স্বীকার করলেও বিবর্তনের মূল রোগটি শনাক্ত করা কঠিন কিন্তু নয়। ব্যাধিটি হচ্ছে, পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাই মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করে চলেছে। যার প্রভাব কেবল পাড়া সংস্কৃতিকে নির্মূল করেনি। নির্মূল করেছে প্রত্যেকের আত্মীয়-পরিজনদের মধ্যকার সম্পর্ক-সম্প্রীতিকেও। পুঁজিবাদের মৌলিক দর্শনই হচ্ছে আত্মকেন্দ্রিকতায় সীমিত। পুঁজিবাদ সমষ্টির উন্নতির আদর্শ ধারণ করে না। সমষ্টির ওপর ব্যক্তির শোষণকেই উৎসাহ জোগায়। তাই সর্বাগ্রে জরুরি রোগটি চিহ্নিত করে রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। অর্থাৎ বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বদল না ঘটানো পর্যন্ত আমাদের সমষ্টিগত মুক্তির কোনো উপায় নেই। তাই পুঁজিবাদবিরোধী গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা যেমন আবশ্যক, তেমনি অপরিহার্যও।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
mibabla71@gmail.com