কার্ডে বিদেশি মুদ্রা লেনদেন বেড়েছে ৫১৬ শতাংশ

করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বিশ^ব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেই কার্ড ব্যবহার করে বিদেশি মুদ্রার লেনদেন ব্যাপক হারে বেড়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে নীতিমালা সহজ করায় কার্ডের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রার লেনদেনে আগ্রহী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। নীতিমালা সহজ করার পর গত দুই বছরে লেনদেন বেড়েছে ৫১৬ শতাংশ। আর সর্বশেষ এক বছরে এই মাধ্যমের ব্যবহার বেড়েছে ৮৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মে মাসে কার্ডের মাধ্যমে ৬৬১ কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা লেনদেন হয়েছে। একক মাস হিসেবে দেশের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বেশি লেনদেন। গত বছরের মে মাসের চেয়ে এই লেনদেন প্রায় দ্বিগুণ। ২০২২ সালের মে মাসে এ ধরনের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৫৮ কোটি টাকা। এছাড়া ২০২১ সালের জানুয়ারিতে নতুন নীতিমালা করার পর ওই বছরের মে মাসে কার্ডে বিদেশি মুদ্রার লেনদেন হয়েছিল ১০৭ কোটি টাকা। সে হিসেবে দুই বছরের ব্যবধানে কার্ডের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রার লেনদেন বেড়েছে ৫১৬ শতাংশ।

ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে বিদেশ ভ্রমণ ও চিকিৎসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ডলার সংকটের কারণে ভ্রমণকারীরা বিদেশে কার্ডের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনেকে বেশি সুবিধাজনক বলে মনে করছেন। এতে কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে।

সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের ১১ মাসে অর্থাৎ জুলাই-মে সময়ে কার্ডভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ২ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে এই সময়ে কার্ডের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রার লেনদেন বেড়েছে ১৪৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

ব্যাংকাররা বলছেন, বিদেশ ভ্রমণকালে মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করে থাকেন। কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন ভ্রমণকারীদের জন্য তুলনামূলক সুবিধাজনক। কারণ এতে নগদ অর্থ বহনের ঝামেলা এড়ানো যায়। পাশাপাশি দেশের ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোতে ডলারের ঘাটতি চলছে। ফলে ভ্রমণকারীরা বিদেশে খরচ মেটাতে কার্ডের ব্যবহার বাড়িয়েছেন।

এদিকে, বিদায়ী অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশে ডলারের বড় ধরনের সংকট আর কার্ব মার্কেটে ডলারের আকাশছোঁয়া দামের কারণে মানুষকে ডলার না কিনে কার্ডের মাধ্যমে ডলার লেনদেনের পরামর্শ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম মানুষকে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে নগদ ডলার না নিয়ে কার্ডের মাধ্যমে ডলার নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়েছে, যার কারণে ভ্রমণ ও চিকিৎসা খরচ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এক বছরে আগে সৌদিতে যে খাবারের জন্য ১৫ ডলার খরচ হয়েছে; এখন তার জন্য লাগছে ৩০ ডলার। সে কারণেই লেনেদেনের পরিমাণটাও বেড়ে গেছে। ভিসা বা মাস্টারকার্ডের মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক দ্বারা ইস্যুকৃত কার্ডগুলো সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে গৃহীত ও জনপ্রিয়। ভ্রমণকারীরা মূলত বিমান ভাড়া, ভ্রমণ খরচ, হোটেল বুকিংসহ কেনাকাটার খরচ মেটাতে এ ধরনের কার্ড ব্যবহার করে থাকেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক কার্ডধারী ব্যক্তিগত এনটাইটেলমেন্ট হিসেবে বছরে ১২ হজার ডলার পর্যন্ত খরচ করতে পারেন। কার্ডের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন বৃদ্ধি দেশের মুদ্রা বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে বলে জানান ব্যাংকাররা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মে মাসে কার্ডের মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রার লেনদেন এপ্রিলের তুলনায় ৫ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা বা ১১ শতাংশ কমেছে। মে মাসে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন হয়েছে ৪২ হাজার ১২১ কোটি টাকা। আগের মাস এপ্রিলে এই অঙ্ক ছিল ৪৭ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। ব্যাংকাররা বলছেন, মে মাস রোজার ঈদের পরের মাস ও কোরবানি ঈদের আগের মাস হওয়ায় এই সময়ে গ্রাহকদের লেনদেন কম হয়েছে।