প্রাথমিক বাছাই শেষে ১২টি দলের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) নামে দুটি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আজ সোমবার এ দুটি দলের বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে। গতকাল রবিবার সকালে নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে ইসি সচিবালয়ের সচিব জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
এদিকে ইসির নিবন্ধন তালিকা থেকে বাদ পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাদ পড়া দলের নেতারা। তাদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সব শর্ত পূরণ করলেও পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে। বেআইনিভাবে তাদের নিবন্ধন দেওয়া হয়নি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পেতে আবেদন করেছিল ৯৩টি দল। এর বিপরীতে মাত্র ১২টি দলকে প্রাথমিক বাছাই তালিকায় রেখেছিল ইসি। যার মধ্যে থেকে শেষ পর্যন্ত আরও ১০টি দলকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ইসি সচিব জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দুটি দল প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে। দল দুটি হচ্ছে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি)। কেন্দ্রীয় কার্যালয়, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি, মাঠপর্যায়ে অফিস-কমিটির কার্যকারিতা, প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিল যাচাই, তদন্ত শেষে এ দুটি দল নির্বাচিত হয়েছে। এখন গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে। আপত্তি নিষ্পত্তি করে ২৬ জুলাইয়ের পর চূড়ান্ত করা হবে।
এসব দলের বিষয়ে কারও কোনো দাবি বা আপত্তি আছে কি না, তা জানাতে ১০ দিন সময়ও দিয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। জানানো হয়েছে, আপত্তি পেলে দুপক্ষের শুনানি শেষে নিষ্পত্তি করা হবে। আর আপত্তি না পেলে নিবন্ধন বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ধাপে ধাপে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে অফিস থাকার কথা, কমিটি থাকার কথা, জনবল থাকার কথা... এগুলো সব যাচাই করেছি। পুনরায় যাচাই করে এ দুটি দলের আইন অনুযায়ী সবকিছু থাকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। এরপরই চূড়ান্ত হবে যে, কারা কারা নিবন্ধন পাবে। বাকি ১০টি দল যে তথ্য দিয়েছে, মাঠপর্যায়ে যাচাই করে গরমিল পাওয়ায় তাদের আবেদন বাতিল করা হয়েছে।’
প্রাথমিক বাছাইয়ে টিকলেও চূড়ান্ত বাছাইয়ে বাদ পড়া ১০টি রাজনৈতিক দল হলো এবি পার্টি, বাংলাদেশ হিউম্যানিস্ট পার্টি (বিএইচপি), গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ সনাতন পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি), বাংলাদেশ পিপলস পার্টি (বিপিপি), ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএলডিপি)। এসব রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ও মাঠপর্যায়ের কার্যালয় সক্রিয় রয়েছে কি না, তা দুই দফা যাচাই করেছে ইসি।
এদিকে নিবন্ধন পাওয়া বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) নিয়ে কৌতূহল রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। দলটির নেতাদের বেশিরভাগই একসময় বিএনপির রাজনীতি সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সেখানে কাক্সিক্ষত সুবিধা না পেয়ে তারা নতুন দল গঠন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ইসির নিবন্ধন তালিকা থেকে বাদ পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাদ পড়া দলের নেতারা। গণ অধিকার পরিষদের একাংশের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, ‘আমরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং চারজন নির্বাচন কমিশনার ও সচিব সাহেবকে আমাদের সাংগঠনিক বিষয়ের আপডেটের চিঠি নিয়ে এখানে সশরীরে হাজির হয়েছি। এর আগে সাধারণত আমরা কোনো চিঠি নিয়ে সশরীরে এখানে আসিনি। আমরা মনে করেছি যে, নিবন্ধনের কার্যক্রমটা যেহেতু চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং মাঠপর্যায়ে তাদের যেই কর্মকর্তারা আছেন, তারা বিভিন্ন এজেন্সির দ্বারা প্রভাবিত। ডিজিএফআই, এনএসআই নিবন্ধন কার্যক্রমে বাধাগ্রস্তের পরিবেশ তৈরি করে। আমরা আমাদের কার্যক্রম লিখিতভাবে ডকুমেন্টসহ তাদের কাছে উপস্থাপন করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘৫৩টি জেলা কমিটি রয়েছে। আমাদের কার্যালয় এবং আমাদের কমিটি রয়েছে। সর্বশেষ পুনর্তদন্ত করার জন্য একজন উপসচিব আমাদের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আপনাদের সবকিছু সুন্দর রয়েছে। আশা করি নিবন্ধন পাবেন।” গত বৃহস্পতিবার তিনি নিজে আমাদের বলেছেন, এনএসআই, ডিজিএফআইয়ের প্রেশার রয়েছে। আজকে আবার দেখলাম নির্বাচন কমিশনাররা সেই প্রেশারের কাছে মাথানত করে নিবন্ধন দিল না।’
নিবন্ধন নিয়ে আলোচনায় থাকা আরেক দল এবি পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের বিন্দুমাত্র নিরপেক্ষতা নেই। সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের জন্য গঠিত এ প্রতিষ্ঠানটি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়েছে। আমরা নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিলাম যাতে জনমানুষের কাছে তাদের চেহারা আরও সুস্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়। এবি পার্টি গত দুই বছরে নিবন্ধন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জনভিত্তি তৈরি করেছে। সব শর্ত পূরণের পরও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস এবং সুষ্ঠু নির্বাচন কর্মকা- বিঘিœত করার প্রয়াসে এবি পার্টিকে বেআইনিভাবে নিবন্ধন দেওয়া হয়নি।’
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব দল কারা করছে। কোথায় করছে আমি অন্তত কখনো দেখিনি। কোন স্বার্থে, কার স্বার্থে এ দলগুলো নিবন্ধনের জন্য চূড়ান্ত করা হলো, এটা আমার বোধগম্য নয়। এ ধরনের ঘটনা আমরা অতীতেও দেখেছি। নির্বাচন কমিশনের প্রতি যেটুকু আস্থা তারা সেটুকুও জলাঞ্জলি দিয়েছে। স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থেকে এরকমটা আশা করা যায় না।’