ডেঙ্গুতে আরেক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর দিনে দেশে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে গেছে বলে মনে করছে সরকার। এমন অবস্থায় রোগটি নিয়ন্ত্রণে ‘জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি অবস্থা’ জারি করা যায় কি না, তা নিয়ে ভাবছেন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, এখনো জরুরি অবস্থা ঘোষণার মতো পরিস্থিতি হয়নি। বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জানানো হয়েছে। বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। করোনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তখন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা যেতে পারে।
গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে ডেঙ্গুর জরুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঘোষণার বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় সরকার প্রণীত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা মানা হলে এবং রোগীরা আগেভাগেই চিকিৎসা নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলেও জানান কর্মকর্তারা। এ সময় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এমনও বলেছেন, ডেঙ্গুর ম্যানেজমেন্টের একটা স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল আছে। এই প্রটোকল অনুসরণ করলে ডেঙ্গুতে ক্যাজুয়ালিটি কমানো সম্ভব।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আনোয়ার হোসেন হাওলাদার বলেন, এখনো পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি ঘোষণার মতো অবস্থা হয়নি। যখন কোনো কিছু করার থাকে না, তখন এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু ২০০০ সাল থেকে আমাদের দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ হচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার জন্য একটা স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল আছে। ডেঙ্গুতে এখন যেটা সমস্যা, রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসছে। তখন রোগী শকড (শক সিনড্রোম) পর্যায়ে চলে যায়। তখন রোগী ম্যানেজ করাটা কষ্ট হয়ে যায়। এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তারপরও জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণার বিষয়টি অ্যানালাইসিস করে দেখব।
সচিব আরও বলেন, আমরা চেষ্টা করছি রোগীদের শকড পরিস্থিতি পরিবার পর্যায় পর্যন্ত যেন না যায়। এবার এমন হচ্ছে, জ¦র হলে ট্রিটমেন্টের পর ছেড়ে যায়। কিন্তু পরে প্লাটিলেট দ্রুত কমতে থাকে। তাই জ¦র আসার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু টেস্ট করা উচিত। যদি ডেঙ্গু না হয় তাহলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আর যদি ডেঙ্গু পজিটিভ হয়, তাহলে জ¦র ছেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর একটা ম্যানেজমেন্টের প্রয়োজন হয়। সেই ম্যানেজমেন্ট হাসপাতালেও করা যায়, বাসায়ও করা যায়। এটা করলে ক্যাজুয়ালিটি অনেক কমে আসবে।
একইভাবে ডেঙ্গুর পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি ঘোষণা করার মতো অবস্থা এখনো আসেনি বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, করোনার সময় এমনটা করা হয়েছিল। এবারও যদি সে পরিস্থিতি হয়, নিশ্চয় সেটা করা হবে। এটা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কথা হতে হবে। আমরা আমাদের কনসার্নটা পলিসি লেভেলে জানিয়েছি। এ ব্যাপারে কথা বলে কী সিদ্ধান্ত হয়, সেটা জানানো হবে।
গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে নতুন করে আরও ১ হাজার ৪২৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ও এ সময় মারা গেছে আরও ৬ জন। ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যা গতকালের চেয়ে কম। গত শনিবার ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল এ বছরের সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬২৩ ও মৃত্যুর ছিল সর্বোচ্চ ৭ জন। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত এ বছর মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ২০ হাজার ৮৭৮ ও মৃত্যু ১০৬ জন।
রাজধানীতে স্কুলছাত্রের মৃত্যু : ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীতে ইশাত আজহার নামে এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল ভোরে রাজধানীর ইউনিভার্সাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়।
ইশাত রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী শাখার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিল।
প্রকোপ কমানো যাচ্ছে না : ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানো যাচ্ছে না বলে জানান স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপটা কমানো যাচ্ছে না, আমরা এর ঊর্ধ্বগতিই দেখছি। ডেঙ্গুতে সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ আসছে। কারণ এখন ডেঙ্গুর ধরন বদলে যাচ্ছে। ধরন বুঝতে গবেষণা বাড়াতে বলা হয়েছে। এখনই কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছি। কোন ধরনের ওষুধ কোন মাত্রায় মশা নিধনে কার্যকর তা দেখতে বলেছি। নতুন কিছু থাকলে তা নিয়ে আসতে হবে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, এ বছর ডেঙ্গু রোগী যে অনেক বাড়বে, সেটা আগেই ধারণা করেছিলেন তারা। সেজন্য সিটি করপোরেশনগুলোকে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল।
মুগদার রোগী অন্য কোথাও যেতে চায় না : সংবাদ সম্মেলনে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ঢাকায় সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি আছে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তারপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মুগদা হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা ৫০০, কিন্তু ডেঙ্গুসহ রোগী ভর্তি আছে ৬০০। এতেই বোঝা যায় শয্যার অতিরিক্ত রোগীরা কীভাবে আছে। মুগদায় নার্স বাড়ানো হচ্ছে, আরও বাড়ানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। যথাসাধ্য চেষ্টা করছি চিকিৎসা দিতে।
কিন্তু মুগদার রোগীরা অন্য হাসপাতালে যেতে চায় না বলে জানান এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, মুগদা হাসপাতালের আশপাশের এলাকাগুলোতে, যেমনÑ শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ, কদমতলী, বাসাবো, মুগদা থেকে শুরু করে রামপুরা পর্যন্ত পুরো এসব এলাকায় রোগীর সংখ্যা বেশি। তারা মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম সেখান থেকে রোগী অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু রোগীরা রাজি হয়নি। তারা তাদের বাড়ির এলাকার মধ্যে থাকতে চায়।
রোগী বাড়লে সংকট হবে : ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় এখনো কোনো সংকট তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তিনি বলেন, উদ্বেগজনকভাবে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। অন্যান্য হাসপাতালের খালি শয্যা ধীরে ধীরে ভরে যাচ্ছে। আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি, দেব, কিন্তু যদি রোগীর সংখ্যা বাড়তেই থাকে, তাহলে সংকটে পড়ব। এখনো পর্যন্ত আমাদের কোনো সংকট নেই।
এ কর্মকর্তা বলেন, গত বছর অক্টোবরে ডেঙ্গু প্রকোপের ‘পিক’ সময় ছিল। এ বছর কী হবে তা আমরা এখনো ধারণা করতে পারছি না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার এটি প্রলম্বিত হতে পারে। যেহেতু বর্ষা দেরি করে এসেছে, এটি যাবেও দেরিতে।
বেসরকারি হাসপাতালের প্রতি সতর্কতা : অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগী ভর্তির তথ্য দিচ্ছে না। যারা ডেঙ্গু রোগী ভর্তির তথ্য গোপন করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসায় অতিরিক্ত টাকা আদায় করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ডেঙ্গু আতঙ্কে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক : ডেঙ্গুতে স্কুলের শিক্ষার্থীদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এতে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করেছেন। স্কুলে কমে আসছে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি। ডেঙ্গু রোধে পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর। সেখানে বলা হয়েছে খেলার মাঠ ও ভবনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। মাঠ কিংবা ভবনে জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য যেসব ফুলের টব রাখা হয়েছে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এডিস মশার প্রজননস্থলে যাতে পানি জমতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ এবং শিক্ষক কর্র্তৃক ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায়গুলো প্রতিমুহূর্তে শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে।
এ ব্যাপারে রাজধানীর মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ফাওজিয়া রাশেদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাউশি অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা নিয়মিতভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করছি। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়কে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। অনেকটা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের শিক্ষার্থীরাও স্কুলে আসছে। তবে যদি কেউ অসুস্থ থাকে সেটা ভিন্ন কথা।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৫ বার্তা : দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ মোকাবিলায় টেলিভিশন, রেডিওসহ ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জনস্বার্থে সচেতনতামূলক বার্তা নিয়মিতভাবে পরিবেশনের অনুরোধ জানিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এজন্য পাঁচটি বার্তা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। গতকাল মন্ত্রণালয়ের সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব ডা. মো. শিব্বির আহমেদ ওসমানী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ অনুরোধ জানানো হয়।
এসব বার্তায় বলা হয়েছে ১. জ্বরের শুরুতে অবশ্যই নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করুন। ২. বাসার ভেতরে ও চারপাশে, নির্মাণাধীন ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ভবনের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণ করুন এবং পরিষ্কার রাখুন। ৩. দিনে অথবা রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করুন। ৪. ডেঙ্গুজ¦র কমে গেলে অবহেলা না করে অবশ্যই পরবর্তী জটিলতা এড়াতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ৫. মনে রাখবেন, এ বিষয়ে অবহেলা আপনার ও আপনার পরিবারের জীবন সংশয়ের কারণ হতে পারে।
সব হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার : ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে গত ১০ জুলাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও ৯ জুলাই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুটি সভা হয়। এসব সভায় সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো গণবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাতে বলা হয়েছে, সব সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু টেস্ট ১০০ টাকার পরিবর্তে ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া ও ডেঙ্গু কর্নার চালু করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে স্বাস্থ্যসেবা পেতে ১৬২৬৩ হটলাইন সেবা চালু রয়েছে। এ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে অধিদপ্তর প্রচারণা চালাচ্ছে বলেও জানানো হয়।