উপনির্বাচনেই কথা রাখা গেল না

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন। বাংলাদেশে আগামী সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার তাগিদ নিয়ে তিনি ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেট সেক্রেটারি ডুনাল্ড লু এসেছিলেন। কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ অন্যদের সঙ্গে।

জেরার সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবাই আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। এছাড়া আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ মূল্যায়ন করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রাক-তথ্যানুসন্ধানী দলও এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। দলটি প্রধান রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। আরও বলবেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রাক-তথ্যানুসন্ধানী দলকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। বর্তমান সরকার ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই এমন নির্বাচন সম্ভব।

কিন্তু এরই মধ্যে ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচনে এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর স্টিকার ঝুলছিল হামলাকারীদের গলায়। এর আগে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এক মেয়র প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, ওই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সিইসি মন্তব্য করেছিলেন, ‘তিনি তো ইন্তেকাল করেননি’। পরে অবশ্য সিইসি এ মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।

সম্প্রতি শেষ হওয়া সিটি নির্বাচন ও উপনির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণ করেনি রাজনীতিতে অন্যতম বৃহত্তর দল বিএনপি। রাজনীতির মাঠে তৃতীয় বৃহত্তর শক্তির দল বলতে যা বোঝায় তাও নেই। অর্থাৎ নির্বাচনগুলো মূলত আওয়ামী লীগ, ছোট ছোট রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে হয়েছে। যেখানে আওয়ামী লীগের সহজ বিজয়ই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু দেখা গেছে এর মধ্যেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকরা নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যা আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

কথায় বলে মর্নিং শোজ দ্য ডে। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা দিয়ে বিদেশিদের আশ^স্ত করার চেষ্টা করেছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। বিরোধীরা তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকারের অধীন ছাড়া বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বলে জানিয়েছে। যে শঙ্কা থেকে তারা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে চায় নাÑ মনে করি ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচন শেষে প্রমাণ হয়ে গেছে। যেখানে ভোট পড়েছে মাত্র ১২ থেকে ১৪ শতাংশ।

যেখানে বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থী নেই। সেখানে এমন একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নিজের প্রতিদ্ব›দ্বী ভেবেছেন যিনি রাজনীতির সঙ্গে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট না, যার পরিচয় একজন ইউটিউবার হিসেবে। তাকে নির্বাচনী প্রচারে যেমন বাধা দেওয়া হয়েছে, নির্বাচনের দিনও তার ওপর হামলা করেছে। যার অর্থ এই দাঁড়ায় শাসক দলের প্রার্থীর পক্ষ থেকে পেশিশক্তি প্রদর্শন করা হয়েছে। একজন প্রার্থীর গায়ে হাত তুলতেও তারা দ্বিধা করেনি।

যা আগামী জাতীয় নির্বাচনে অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়াবে। এই নির্বাচনে হিরো আলমের জায়গায় বড় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হলে তা বড় সহিংসতায় রূপ নিতে পারত সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কারণ বড় দল হলে পেশিশক্তি প্রদর্শনের ঘটনা হতো সমানে সমান।

নির্বাচনের আগে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, নির্বাচনে আইন শৃঙ্খলার কোনো অবনতি ঘটবে না। যদি ঘটে তবে তিনি নাকে খত দিয়ে চলে যাবেন। হিরো আলমের ওপর হামলার শুরু হয় ভোটকেন্দ্রের ভেতরেই। পুলিশ তাকে গেইট পার করে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগের স্টিকার ঝুলানো লোকদের কাছে।

তারা যখন হিরো আলমের ওপর হামলা করে তখন কোনো পুলিশ সদস্য এগিয়ে আসেনি। তাদের নোটিস করা হলে ভোটকেন্দ্রের পুলিশ বলেছে ভোটকেন্দ্রের বাইরের বিষয়ে তাদের করার কিছু নেই। প্রশ্ন হচ্ছে একজন নাগরিক আক্রান্ত হলে তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার কাজ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। সেটা ভোটকেন্দ্রে হোক বা বাইরে। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা তা করেনি। মার খেয়ে হিরো আলম যখন পালাল তখন পুলিশ ফুটেজ দেখে কয়েকজনকে আটক করে।

কিন্তু পুলিশ যদি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করত, তবে হয়তো পত্রিকার পাতায় হিরো আলমের মুমূর্ষু ছবিটি আসত না। এক্ষেত্রে দেখার বিষয় নির্বাচন চলাকালে ভোটকেন্দ্রের বাইরে কতটুকু এলাকা ভোটকেন্দ্র বলে বিবেচিত হবে। আর হিরো আলমের ওপর যে স্থানে হামলা হয়েছে সেটা নির্বাচনী কেন্দ্রের অংশে পড়ে কি না। মোটা দাগে যদি দেখি, যে আসনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে সেটা পুরোটাই নির্বাচনী এলাকা। আর এ এলাকার মধ্যে কোনো প্রার্থীর ওপর হামলা মানে নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন।

হিরো আলম এখানে টিকটক হিরো আলম না, হিরো আলম একজন সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আরাফাত যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি হিরো আলমও সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী। নির্বাচন কমিশন তার সুরক্ষা দিতে পারেনি। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার সুরক্ষা দিতে পারেনি।

তার মানে কি এই দাঁড়ায় না, নির্বাচন কমিশন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরকারি দলের প্রার্থী ছাড়া বাকিদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। বরিশালের ক্ষেত্রেও আমরা তাই দেখেছি। নির্বাচনের দিন প্রার্থীর গায়ে হাত তোলা কি অতিমাত্রায় স্পর্ধা দেখানো না? সুতরাং বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কাকে তো বাস্তব করে দিচ্ছে সরকারি দলেরই সমর্থকরা। যা বিদেশিদের সামনে ভিন্ন বার্তা দেবে। যে বার্তা নিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বসে আছেন।

বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকেই বলে আসছেন। গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে প্রণীত। সেখানে তারা স্পষ্ট করেই বলেছেÑ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িত বাংলাদেশিদের ভিসা দেবে না। এর আগে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

সরকারের পক্ষ থেকেও সংস্কার কার্যক্রম দ্রæতই চালানো হয়েছে। বিশ্বের ক্ষমতাধর এই দেশটি তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে বিশে^র বিভিন্ন দেশে উলট-পালট ঘটিয়েছে এটা মানতে হবে। যা প্রধানমন্ত্রীও জাতীয় সংসদে বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যে কোনো দেশের ক্ষমতা উল্টাতে পাল্টাতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের মতো করে বিশ্বের অন্য কোনো দেশ থেকে এখনো চাপ আসেনি, এলে সেটা বাংলাদেশের জন্য সুখকর হবে না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন। ইতিমধ্যে সরকারের বিভিন্ন পক্ষ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রতিনিধি দলটি ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচন ও বিএনপির এক দফা কর্মসূচি প্রত্যক্ষ করে ফিরে যাবেন। অর্থাৎ তারা অবস্থান করছেন মূলত দেখতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি অনুসারে বাংলাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে সরকার থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয় কি না এবং সংবিধানের আলোকে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার পরিবেশ আছে কি না।

ইতিমধ্যে বিএনপির সমাবেশ ও আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ তার দেখেছেন। বিএনপির পদযাত্রা ও আওয়ামী লীগের শান্তি যাত্রা দেখে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন পরবর্তী করণীয়।

আগামী নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু করা ও অর্থবহ করাই এই সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। যেমনটি তারা প্রতিনিধি দলকে ইতিমধ্যে বলেছে। কিন্তু ঢাকা-১৭ নির্বাচন শেষে সরকারি দল সে পরিবেশ দেখাতে পারেনি। একজন প্রার্থীর গায়ে হাত তোলা খুবই অমার্জনীয়। প্রার্থী সে যেই হোক। ছোট একটি নির্বাচনে সরকার বা নির্বাচন কমিশন বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। জাতীয় নির্বাচন একদিনে ৩০০ আসন এই প্রশাসন কীভাবে সামাল দেবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

লেখক : সাংবাদিক

zakpol74@gmail.com