প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে গত দুদিন রাজধানী ছিল স্থবির। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনে বসে থেকে বিরক্ত হয়ে সাধারণ মানুষ হেঁটে গন্তব্যে গেছেন। হাসপাতালগামী লোকজন পড়েছিলেন অবর্ণনীয় দুর্ভোগে। তারা না পারছিলেন হাঁটতে, না পারছিলেন যানবাহনে বসে থাকতে। শুধু হাসপাতালগামীরাই নয়, রাজধানীতে যাতায়াতকেন্দ্রিক সবকিছুতে এই দুর্ভোগের কালো ছায়া পড়েছিল।
সাধারণত সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এ ধরনের পদযাত্রা বা শোভাযাত্রা করে দলগুলো। কিন্তু এবার তারা সাপ্তাহিক ছুটির ধার ধারেনি। কর্মদিনেই কর্মসূচি দিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এ ধরনের কর্মসূচি আরও দেওয়ার পরিকল্পনা করছে রাজনৈতিক দলগুলো। এসব দলের কাছে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কোনো মূল্যই নেই। তারা ব্যস্ত নিজেদের শক্তি দেখাতে।
জনগণের ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের আগে আমাদের দেশে এটা কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধী দলগুলো মনে করে দাবি আদায়ে রাজপথে শক্তি দেখাতে হবে। তাহলে জনগণ পক্ষে আসবে। সরকার দাবি মানতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো জনগণ এগুলো দেখে বিরক্ত হয়, যা আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বোঝেন না। উন্নত দেশগুলোর মতো টক শো কিংবা অন্যভাবে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার চর্চা আমাদের দেশে শুরু হয়নি। সেটি শুরু হলে জনগণ বেঁচে যেত। তবে এখন এই ডিজিটাল যুগে সামাজাকি যোগাযোগমাধ্যম, টিভি চ্যানেল সবই আমাদের আছে। রাজনৈতিক দলগুলো বিকল্প চিন্তা করলে জনগণ বেঁচে যাবে। তবে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন রাজনীতিবিদরা আনতে না পারলে জনগণকে এই ভোগান্তি মেনে নিতে হবে। আশা করি তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।’
গতকাল বুধবার খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা মোড়ে জড়ো হন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনের রাস্তার উল্টো পাশে ট্রাকের ওপর করা হয় মঞ্চ। রাস্তার দুই পাশে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের অবস্থানের কারণে বিকেল ৩টা থেকে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে করে মহাখালী থেকে সাতরাস্তা হয়ে মগবাজারগামী পরিবহনগুলো সমস্যায় পড়ে। ফলে সমাবেশস্থলের দুই পাশে তীব্র যানজট তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের সমাবেশের আগে বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর পলওয়েল মার্কেটের সামনে থেকে যাত্রা শুরু করে বিএনপি। বিমানবন্দর সড়ক, কুড়িল বিশ্বরোড, নতুন বাজার, বাড্ডা, রামপুরা ব্রিজ, আবুল হোটেল, খিলগাঁও, বাসাবো, মুগদাপাড়া, সায়েদাবাদ হয়ে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় গিয়ে শেষ হয়। এসব কর্মসূচির সময় তীব্র যানজট দেখা দেয়।
১২ জুলাই বুধবার বিএনপি নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক দফা দাবি ঘোষণার জন্য সমাবেশ ডাকে। একই দিন একই সময়ে আওয়ামী লীগ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে সমাবেশ ডাকে। প্রধান দুটি দলের সমাবেশ ও বৃষ্টির কারণে রাজধানীবাসী চরম ভোগান্তিতে পড়ে। সাধারণ জনগণ বিভিন্নভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেকে তাদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেছেন।
গতকাল বুধবার বাড্ডায় একজন পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিএনপির কর্মসূচির কারণে রাস্তায় গাড়ি নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। আমাদের কথা কেউ ভাবে না। বিএনপি কর্মসূচি দিলে গণভবন, বঙ্গভবন, নির্বাচন কমিশন, সচিবালয় কিংবা মন্ত্রী-এমপিদের বাড়ির সামনে কর্মসূচি পালন করুক। বিরোধী দলগুলোর প্রতি আমাদের আবেদন, তারা কর্মসূচি পালন করুক। কিন্তু সেই কর্মসূচিতে যেন জনগণের ভোগান্তি না হয়।’
জনগণের দাবি আদায়ে আন্দোলনের কথা বললেও বাস্তবে জনগণের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি। অন্যদিকে বিএনপির কর্মসূচির দিন শান্তি ও উন্নয়নের শোভাযাত্রার নামে পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। রাজপথে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি থাকায় রাজধানীতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় রাস্তায়। কখন গন্তব্যে পৌঁছাবে তা কেউ বলতে পারছে না। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বড় দুটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির কারণে তাদের যে ভোগান্তি, তা নিয়ে তারা ভাবে না।
কর্মসূচির দিন রাজপথে তীব্র যানজট ও জনগণের ভোগান্তির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে একটা অগণতান্ত্রিক, অবৈধ সরকার অস্ত্রের জোরে জনগণের ভোট ছাড়া ক্ষমতায় বসে আছে। জনগণের দাবি নিয়ে রাজপথে প্রতিবাদ করতে নামলে গুলি করে আমাদের নেতাকর্মীদের হত্যা করে। এ অবস্থায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে আমাদের কর্মসূচি ঘোষণা করতে হয়। তারপরও আমরা যেহেতু জনগণের পক্ষে আন্দোলন করছি, তারা বিষয়টি ভাববে। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে। আমরা জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেব।’
অন্যদিকে পদযাত্রায় জনগণের ভোগান্তির বিষয়টি জানিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির আন্দোলন মানেই সহিংসতা। বিগত দিনে দেশের জনগণ তা দেখেছে। তারা রাজপথে কর্মসূচি দিলে সম্পদ ও জনগণের জানমাল রক্ষায় আমাদেরও রাজপথে অতন্দ্রপ্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হয়। আমাদের সজাগ থাকতে হয়।’
জনগণের ভোগান্তির বিষয়ে জানতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সঙ্গে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সমাবেশ না হলে কি দেশের মানুষ শান্তিতে থাকে? দেশের জনগণ এমনিতেই অশান্তিতে আছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি তেলের ঊর্ধ্বমূল্যসহ নানা কারণে সাধারণ জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। তাদের জন্য সরকারের কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। আইয়ুব, ইয়াহিয়া কিংবা স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও এভাবে নানান কথা বলা হতো। ভোগান্তি হয় বলে কর্মসূচি বন্ধের পক্ষে আমি নই। গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক অধিকার পালন বন্ধ করার ঘোর বিরোধী আমরা। আজকে বিএনপি করছে। আগামীতে আমরাও রাজপথে নামব সরকারের পদত্যাগের দাবিতে। দেশের জনগণ রাস্তায় নামছে এখন।’ সরকারি দল আওয়ামী লীগের শান্তি ও উন্নয়ন শোভাযাত্রার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘শান্তির নামে অশান্তি তৈরি করতে তারা রাজপথে নামে। নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় তারা। যারা দুরভিসন্ধিমূলক মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়, তারা বলতে পারে এসব কথা। যারা সমালোচনা করবে, তারা ছুটির দিনে কর্মসূচি দিলেও নানা কথা বলবে।’