জাল স্বাক্ষরের ফাঁদে বেচারা ক্যাশিয়ার

প্রবাসীদের বৈদেশিক আয় (রেমিট্যান্স) বৈধ পথে ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে পাঠানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে নানা প্রণোদনা। ফলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা বেড়েছে। তবে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সিল ও স্বাক্ষর নকল করে জাল রেমিট্যান্স পেমেন্ট স্লিপের মাধ্যমে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। চলতি বছর দেশের সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে পাঁচটি ব্যাংকের ১১টি শাখা থেকে এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে ৬০ লাখ ৬৭ হাজার টাকা তুলে নিয়েছে এক চক্র। আর এসব ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ক্যাশ অফিসারকে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে কোনো মামলাও করেননি। ঢাকা জেলা পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ভুক্তভোগীদের একজন ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের হাসনাবাদ শাখার জুনিয়র ক্যাশ অফিসার মো. মহিউদ্দিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতারক চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শাখার রেমিট্যান্স তোলার প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করেছিল। গত ৩ মে তারা ব্যাংকটির রেমিট্যান্স অফিসারদের সিল ও স্বাক্ষর হুবহু নকল করে জাল রেমিট্যান্স পেমেন্ট সিøপ বানিয়ে সরাসরি ক্যাশ কাউন্টারে আসে। এ সময় তারা আমার কাছে তিনটি রেমিট্যান্স পেমেন্ট স্লিপ জমা দেয়। এরপর আমি তাদের ৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা দিয়ে দিই। পরে যাচাই করতে গেলে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে।’ মহিউদ্দিন আরও বলেন, ‘আমি এ টাকা নিজের কাছ থেকে ব্যাংকে দিয়ে দিয়েছি।’

এ ঘটনায় তিনি ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলার তদন্তে নেমে ঢাকা জেলা পুলিশ গত ১৫ জুলাই চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। এরপরই তদন্তে বেরিয়ে আসে এ চক্রের রেমিট্যান্স জালিয়াতির ভয়ংকর তথ্য।

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতারক চক্রের সদস্যরা অপেক্ষাকৃত ব্যস্ত ও দুর্বল নিরাপত্তার ব্যাংকের শাখা খুঁজে বের করে। কোনো ব্যাংকের শাখা টার্গেট করার আগে তারা ব্যাংকটি কয়েকবার রেকি করে। এরপর ওই ব্যাংকের রেমিট্যান্স অফিসারের স্বাক্ষরের নমুনা সংগ্রহ করে। আরেকটি গ্রুপ ওই স্বাক্ষর জাল করে নকল রেমিট্যান্স পেমেন্ট স্লিপ তৈরি করে ব্যাংকটির ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে রেমিট্যান্সের টাকা তুলে নেয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বৈধভাবে দেশে পাঠাতে রয়েছে কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, যাদের মাধ্যমে এ রেমিট্যান্স ইলেকট্রনিক ট্রান্সফার হয়। এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, মানি গ্রাম, রিয়া, মানি সোর্স। এরা অনেকটা কুরিয়ার সার্ভিসের মতো কাজ করে। দেশের ব্যাংকগুলো এদের মাধ্যমেই রেমিট্যান্স গ্রাহকে দেয়। বিদেশ থেকে যিনি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন তিনি যাকে পাঠাচ্ছেন তাকে শুধু একটি কোড নম্বর বলে দেন।

ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকগুলোতে রেমিট্যান্স ডেস্ক রয়েছে। যখন একজন গ্রাহক ব্যাংকে রেমিট্যান্স তুলতে যান তখন রেমিট্যান্স ডেস্কে গিয়ে একটি গোপন নম্বর বলেন (প্রবাসীর দেওয়া) এবং একই সঙ্গে গ্রাহক তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি দেন। রেমিট্যান্স ডেস্কের অফিসার সফটওয়্যারের মাধ্যমে সবকিছু যাচাই-বাছাই করে একটি রেমিট্যান্স পেমেন্ট স্লিপ দেন গ্রাহককে যেখানে টাকার অঙ্ক লেখা থাকে। গ্রাহক সেই স্লিপ নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে গেলে ক্যাশ অফিসার তাকে টাকা দিয়ে দেন। তবে ক্যাশ কাউন্টারে ক্যাশিয়ারের পুনরায় যাচাই করার সুযোগ থাকলেও সেটি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে যাচাই করেন না তারা। আর এ সুযোগই নিচ্ছে প্রতারক চক্রগুলো। চক্রটি একসঙ্গে ছয় থেকে সাতজন যায় ক্যাশ কাউন্টারে। ফলে ক্যাশ অফিসার দ্রুত কাজ করতে গিয়ে যাচাই না করেই টাকা দিয়ে দেন। এ ছাড়া তারা সিল ও স্বাক্ষর এত নিখুঁতভাবে জাল করে যে, ক্যাশ অফিসারের বোঝার সুযোগ থাকে না।

পাঁচ ব্যাংকের রেমিট্যান্স হাতিয়ে নিয়েছে : ঢাকা জেলা পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চক্রটি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় দেশের পাঁচটি ব্যাংকের ১১টি শাখা থেকে একইভাবে রেমিট্যান্সের টাকা তুলে নিয়েছে। এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ফরিদপুর ভাঙ্গা মালিগ্রাম শাখা থকে তুলে নেয় ৩ লাখ ৪৯ হাজার ঢাকা। এ শাখার ব্যবস্থাপক মো. সেলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনটি জাল রেমিট্যান্স পেমেন্ট স্লিপের মাধ্যমে ক্যাশিয়ার মনির হোসেনের কাছ থেকে এ টাকা নিয়ে গেছে। ক্যাশিয়ার মনির ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন। ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ কেন মামলা করেনি জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।

একইভাবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের নবাবগঞ্জের গালিশপুর শাখা থেকে ৯ লাখ ৯০০, কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ শাখা থেকে ৫ লাখ ৮৬ হাজার ও ঢাকার ডেমরা শাখা থেকে ৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা তুলে নেয় চক্রটি। এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের গোপালগঞ্জ মুকসুদপুর শাখা থেকে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৫০ টাকা তুলে নিয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের নড়াইল লোহাগড়া শাখা থেকে ৮ লাখ ৭৪ হাজার ৭৫০, খুলনার দৌলতপুর শাখা থেকে ১ লাখ ৬ হাজার ৮০০ ও নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ শাখা থেকে ১১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা তুলে নিয়েছে রেমিট্যান্স প্রতারক চক্র।

জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংকের নিতাইগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেমিট্যান্সের টাকা প্রতারণার মাধ্যমে তুলে নেওয়ার বিষয়ে আমরা কোনো মামলা করিনি। আমি গত মে মাসে এখানে যুক্ত হয়েছি। ফলে কীভাবে ওই টাকা সমন্বয় করা হয়েছে, তা আমার জানা নেই। খোঁজ নিতে হবে।’

রূপালী ব্যাংক মুন্সীগঞ্জ শাখা থেকে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০, অগ্রণী ব্যাংকের ঝিনাইদহ শাখা থেকে ৬ লাখ ৯৫ হাজার ও জনতা ব্যাংকের ঝিনাইদহ শাখা থেকে ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা তুলে নেয় প্রতারক চক্র।

কী ঘটেছিল সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের হাসনাবাদ শাখায় : ব্যাংকটির কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকের সিসি টিভি ফুটেজে দেখা গেছে, গত ৩ মে ব্যাংকিং কার্যক্রম চলাকালে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে মুখে মাস্ক পরে তিনজন পুরুষ ১ নম্বর কাউন্টারে যান। সেখানে গিয়ে ক্যাশ অফিসার মো. মহিউদ্দিনের কাছে তিনটি রিয়া রেমিট্যান্স স্লিপ (রিয়া হচ্ছে টাকা পাঠানোর একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান যা ব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে রেমিট্যান্স পাঠায়) ৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা তুলে নেয়। একই সময় চক্রটি ক্যাশ অফিসার মো. মিনহাজুলের ২ নম্বর কাউন্টার থেকে বোরকা পরা দুই নারী রিয়া রেমিট্যান্স পেমেন্ট স্লিপ দিয়ে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০ টাকা তুলে নিয়ে যায়। এ সময় ব্যাংকের মধ্যে আরও চার-পাঁচজন লোক সন্দেহজনক ঘোরাঘুরি করছিল। পরে যাচাইকালে ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ বুঝতে পারে পাঁচটি রিয়া রেমিট্যান্স পেমেন্ট সিøপই ভুয়া। এগুলোর ওপর রেমিট্যান্স পেমেন্ট সিøপ দেওয়ার দায়িত্বে থাকা অফিসারের স্বাক্ষর, সিল এবং শাখার ভেরিফাই স্বাক্ষরিত সিল সবই জাল।

ব্যাংকটির হাসনাবাদ শাখার টাকা তুলে নেওয়ার বিষয়ে তদন্তকালে পুলিশ জানতে পেরেছে, রেমিট্যান্স পেমেন্ট স্লিপের সঙ্গে দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্রও ভুয়া। এ ঘটনায় জড়িত চক্রের সদস্য রিপন মিয়া ওরফে হোন্ডা রিপন, রহিম মুন্সি, মো. জুয়েল, কুলসুম বেগম ও আসাদুজ্জামান স্বপনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কেরানীগঞ্জ সার্কেল) শাহাব উদ্দিন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা অনেকটা বিকাশ প্রতারণার মতো। গ্রেপ্তারকৃত চক্রটি ব্যাংক কর্মকর্তাদের বোকা বানিয়ে নকল রেমিট্যান্স পেমেন্ট স্লিপ (রিয়া) দেখিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়েছে।’