হাসপাতালে যেতে সাত ঘণ্টা হাঁটলেন ক্যানসার রোগী

গোলাম কিবরিয়া। বয়স ৬২। থাকেন টঙ্গী কলেজ গেট। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ক্যানসার রোগী। নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন মহাখালী জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। চিকিৎসকের পরামর্শে ১২ বছরের নাতি রাব্বিকে নিয়ে গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৮টায় যাচ্ছিলেন মহাখালীর দিকে। কিন্তু বাদ সাধে বিএনপির পথযাত্রা। রাস্তায় নেই কোনো ধরনের যানবাহন। আতঙ্কের মধ্যেই নাতিকে নিয়ে শুরু করেন হাঁটা। এক ঘণ্টা হাঁটার পর আশা করেছিলেন কোনো একটা যানবাহন পাবেন। রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া কোনো যানবাহন না থাকায় বাধ্য হয়েই হাঁটতে থাকেন তিনি। ক্লান্ত হয়ে পড়লে মাঝেমধ্যে বিশ্রাম নিয়েছেন। প্রায় সাত ঘণ্টা হেঁটে তিনি পৌঁছান হাসপাতালে। গোলাম কিবরিয়ার মতো হাজার হাজার লোকজন ভোাগান্তির মধ্যে পড়েছেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের বেশি বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়েছে। ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের জন্য কাজ করেন বলে জানান দেন। অথচ তাদের হটকারিতার কারণে সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে।

জানা গেছে, গত দুদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পথযাত্রা ও শোভাযাত্রার কর্মসূচি নিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে উত্তেজনা ছিল। পাশাপাশি রাস্তায় যানজট ছিল অকল্পনীয়। দুটি দলের কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ লোকজনও ক্ষুব্ধ। বিএনপি সকালে ও আওয়ামী লীগ বিকেলে অনুষ্ঠান করায় ঢাকার রাস্তায় যাত্রীর কাহিল হয়ে পড়েছে। আধা ঘণ্টার স্থানে যেতে হয়েছে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায়। অনেকে নির্দিষ্ট সময়ে অফিস, বিশ^বিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ বা হাসপাতালে যেতে পারেননি। আবার কোথাও কোথাও অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেকে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের গালাগাল পর্যন্ত করতে দেখা গেছে।

গতকাল দুপুরে গাজীপুরা, টঙ্গী, উত্তরা ও খিলক্ষেত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিএনপির পদযাত্রার কারণে অন্যদিনের তুলনায় বাড়তি যানজট ছিল সড়কে। ফলে বিভিন্ন গন্তব্যের মানুষজনকে ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার বাসা থেকে অনাবিল পরিবহনের একটি বাসে করে সানজিদা আক্তারের সঙ্গে দেড় বছর বয়সী জেরিন যাচ্ছিল রামপুরায় খালার বাসায়। বিএনপির পদযাত্রার ফলে সৃষ্ট যানজটে বেলা সোয়া ৩টায় মধ্য বাড্ডা এলাকায় পৌঁছায় তারা। তীব্র গরম ও দীর্ঘ সময় যাত্রা করে কিছুটা অসুস্থবোধ করে শিশু জেরিন। কোনো উপায় না পেয়ে মধ্য বাড্ডায় বাস থেকে নেমে ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকেন মা সানজিদা। কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে হাঁটতে থাকা সানজিদা কোনো অসুবিধায় পড়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বাসে বসে ছিলাম। এজন্য বাচ্চা অসুস্থবোধ করছে। তাই বাস থেকে নেমে গেছি। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত জনগণের বিষয়টি দেখা। আমরা তাদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছি। আসলে তারা মানুষের কষ্ট বুঝতে চায় না। নিজেদের স্বার্থে রাজনৈতিক নেতারা কাজ করেন।’ পরে কথা হয় অনাবিল পরিবহনের চালকের সহকারী রাকিবের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অন্যদিন সকাল ১০টায় গাজীপুর থেকে বাস ছাড়লে বাড্ডা আসতে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা লাগে। আজ (বুধবার) টঙ্গী ও উত্তরায় লম্বা সময় ধরে আটকে থাকার পর পুরো সড়কে থেমে থেমে আসতে হয়েছে। এর চেয়ে বিরক্ত আর কী হতে পারে।’

দুপুর ২টায় এয়ারপোর্ট এলাকায় কথা হয় জয়দেবপুর এলাকার ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি সকাল ৯টায় বাসা থেকে বের হয়েছি গুলিস্তান এলাকায় যাওয়ার জন্য। উত্তরায় ফ্লাইওভারে দীর্ঘ সময় আটকে থাকার পর হেঁটে নিচে নেমে ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলে যাচ্ছি। অন্যদিন এ সময়ে মালামাল কিনে ফিরে আসতে পারি। আজকে সড়কে বিএনপি-আওয়ামী লীগের মিছিলের জন্য পুরো রাস্তা আটকে গেছে।’

ক্যানসার রোগী গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘হাসপাতালে আসতে কী যে কষ্ট পেয়েছি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। ছোট একটি বাচ্চাও আমার সঙ্গে কষ্ট করেছে। টঙ্গী থেকে মহাখালী যেতে বেশ কয়েকটি জায়গায় বিশ্রাম নিতে হয়েছে। একবার চেয়েছিলাম বাসায় ফিরে যাই। কিন্তু ডাক্তার না দেখালে শরীর বেশি খারাপ হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছে। হাঁটার সময় মোটরসাইকেল চালকদের অনুরোধ করা হয়েছিল। কেউ কেউ নিতে চাইলেও যানজটের কারণে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।’ তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নেতাদের কাছে অনুরোধ, ছুটির দিনগুলোতে মারামারি করেন। কর্মসূচি দেন। এতে সাধারণ লোকজন একটু হলেও নিস্তার পাবে। আর না হয় আমার মতো রোগীরা হেঁটে হেঁটে চিকিৎসকদের কাছে যাবে।’