গনি মিয়াদের সামান্য ক্ষতি

গফরগাঁওয়ের গনি মিয়া। একসময় ময়মনসিংহ শুধু বড় জেলাই ছিল না ঢাকা, কলকাতা, দিল্লি বা রাওয়ালপিন্ডি থেকে তার দূরত্ব যেমন ছিল বেশি, তেমনি দুর্গমও বটে। এখন টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ সবই আলোকিত শুধু নয়, বৃহত্তর ময়মনসিংহের সংসারে সাবালক জনপদ। কিন্তু গফরগাঁওয়ের নাবালকত্ব কাটতে সময় লাগছে বৈকি। শোনা যায়, তার দেশ নাকি খুব শিগগিরই মধ্যম আয়ের দেশে প্রমোশন পাবে। তখন গফরগাঁওয়ের গনি মিয়াদের আদব-কায়দা, অভাবের স্বভাব, জ্ঞান কান্ডজ্ঞানে জিপিএ ফাইভ তো দূরের কথা জিপিএ ২ পাওয়ার যোগ্য লেখাপড়া, স্বাস্থ্যসেবা ঘটে জোটেনি। সন্দেহ নেই, সেখানকার বেগুন এখনো বড় সাইজের হয় বটে, কিন্তু চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছোড়ার বদভ্যাস, হাটে মাঠে ঘাটে হাত তোলা মানে দুর্নীতি, প্রতারণা, প্রবঞ্চনার লোকালয় হিসেবে জাতে উঠতে এখনো সময় লাগছে। আলোর নিচে যেমন অন্ধকার, বড় বড় লোকালয়ের পশ্চাদভূমি যেমন ঢাকার অদূরে কালীগঞ্জ, খুলনার কাছে ডুমুরিয়া, কলকাতা ও যশোরের কাছে শৈলকুপা ও হরিণাকুন্ডু তেমনি ময়মনসিংহের গফরগাঁও নানান কিসিমের ত্যক্ত, বিরক্ত, পরিত্যক্ত এমনকি বামপন্থি মানুষের অভয়ারণ্য ছিল একসময়। এমনটি এক দিনে হয়নি।

সেই গফরগাঁওয়ের গনি মিয়া। এমডিজি, এসডিজির অনেক গোলের সাফল্যের দাবিদার দেশ ও সমাজে এখনো গনি মিয়ারা গোলশূন্য। আর্জেন্টিনার বড় গোলকিপার সেদিন ঢাকায় এসে তাদের জার্সি যে দিয়ে গেল, এটা দিয়ে কী বোঝাতে চাইল গনি মিয়ার মাথায় এখনো ঢোকেনি। এখনো লোকে বলাবলি করে, গনি মিয়া একজন কৃষক। তার নিজের জমি নেই, সে অন্যের জমি চাষ করে খায়। হ্যাঁ, একসময় এমনতর পরিচয় তার ছিল। কিন্তু এখন গনি মিয়াদের সামান্য ক্ষতির বদৌলতে কারও কারও আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। এখন বিনামূল্যে বিতরণকৃত পাঠ্যবইয়ে তার কথা নেই। থাকবেই বা কেন। দেশের সব মানুষের মাথাপিছু আয় যখন হাজার হাজার টাকা তখন গনি মিয়াদের মাথাপিছু আয়ের হিসাব মেলে না, তাই তাদের নাম পরিচয় সেখানে অপাঙ্্ক্তেয় তো বটেই। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়েছে ধনী-গরিব সবাইকে ৮০০/৯০০ টাকার পাঠ্যবই বিনামূল্যে দিয়ে তাদের হাজার হাজার টাকার গাইড বই কেনাতে হচ্ছে। গনি মিয়াদের ট্যাক্সের টাকায় পুরো বেতন দিয়ে রাখা শিক্ষকদের ক্লাসে না পড়িয়ে কোচিং ক্লাসে পড়ানোর নামে ন্যায়নীতি নির্ভরতার জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে গনি মিয়াদেরই পকেট মারা হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবায় এখন সেবার নাম-গন্ধ নেই, ক্লিনিকের কসাইখানায় গনি মিয়ারা।

গনি মিয়াদের কেউ কেউ এখন সামাজিক নিরাপত্তা জালে আটকা। তাকে খাওয়ানো-পরানো এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব পয়সা বানানোওয়ালাদের হাতে চলে গিয়েছে। যাদের হাত ঘুরে সামাজিক নিরাপত্তার টাকা আসে তা দিয়ে দরিদ্রতার অসহায়ত্বেও গ্লানি ঘোচে না, বরং বাড়ে। অথচ তাদের ঘরের বেকার ও বখে যাওয়া সন্তানদের সদগতির লক্ষ্যে তাদের দক্ষ করে বিদেশে পাঠানো যেত, তাহলে তো সেটাই হতো সামাজিক নিরাপত্তা বোধের বাস্তব বিধান।

গনি মিয়ারা বড্ড হতাশ হয় যখন দেখে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ডিমের সিন্ডিকেটকারীরা এমন কি কালোটাকা, সোনাদানা পাচারকারীরাই বলে এমন ব্যবস্থাপনা বারবার দরকার। এরাই বলে গনি মিয়ারা সবাই ভালো আছে। এ কথা সে কথা বলে তারা নিজেদের আখের গোছায়। গনি মিয়াদের গরিব রেখে, গরিব দেখিয়ে ধনীরা আরও ধনী হয়। সোনার বাংলা শশ্মান কেন, এই প্রশ্ন তুলে সোনার বাংলাকে সোনা দিয়ে মোড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়ে সবাইকে মরণযুদ্ধে নামিয়ে, বিজয় উৎসব করে অন্যরা। বাইরে গনি মিয়াদের সাফল্যের বড় বড় কথা বলে গনি মিয়াদের না জানিয়ে কঠিন শর্তেও ধার-কর্য করে চোখ ধাঁধানো উন্নয়নের ফন্দি আঁটে, আখেরে সব গনি মিয়াকে ঋণগ্রস্ত করে তোলে। সেই ঋণের টাকা লুটপাটে গনি মিয়াদের অন্ধকারে রেখে নিজেদের উড়াল দেওয়ার পাখনা গজায় তাদের। সেখানে না হোক, যেখানে পারে তারা উড়াল দিয়ে পার পাবে, কিন্তু গনি মিয়ারা থেকে যাবে দুর্দশার সাগরে। গনি মিয়ার দুই ছেলে, এক মেয়ের লেখাপড়ার খবর নেই, তারা নিজেরা কাজ করে খেতে পারবে কিনা এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই, তাদের চিকিৎসা হবে কিনা পথঘাট ধোঁয়াশে বিড়ম্বনাদায়ক। সুন্দর সুন্দর রাস্তাঘাটে অনেকে যখন মোটর যান হাঁকিয়ে যাতায়াত করে কখন সেই যানের তলায় পড়ে গনি মিয়াদের দুর্ঘটনার দুর্ভাবনা শেষ হয় না। বড় বড় ডাকাতের বিচার বিলম্বের নামে সবাই ভুলে যায়, কিন্তু গনি মিয়াদের সামান্য ক্ষতির ফয়সালা কে করবে?

যারা প্রকৃত ভূমিহীন তাকে জমি ও ঘর দেওয়ার কথা শোনা যায় বটে, কিন্তু কারও তদবিরে ও চালাকি ছাড়া সে ঘর ও জমি কী তারা পেয়েছে সে খবর কার কাছ থেকে কবে নেওয়া হবে? আগে গাঁয়ের মোড়ল-মাতব্বরা পর্যন্ত অন্তত ভোটের সময় সমাজসেবার সুযোগ চাইতে আসত গনি মিয়াদের কাছে, এখন তার আর নাকি দরকার নেই। বড় বড় শহরের বড় বড় লোকেরা বাইরের লোকের কাছে নালিশ দিয়ে সেই নালিশের বিচার পেতে গিয়ে ভোট চাওয়ার সময় পার হয়ে যায়, ভাবখানা এখন এমন গনি মিয়াদের ভোট তাদের কাছে থাক, আমরা আমাদেরটা ম্যানেজ করতে পারব। দেশে এমন সুবিধাভোগীদের তৈরি করা হয়েছে, সিন্ডিকেট পোষা হয়েছে, গনি মিয়াদের বদলে ভোটের আগে তারা তারস্বরে সমর্থন জানাবে। গনি মিয়ারা আর কত প্রকার উপায়ে উপেক্ষিত হবে? গাঁয়ে মানে না নিজে মোড়ল সেজে গাঁয়ের বারোটা বাজানোর শক্তি ও সাহস পাওয়া যাচ্ছে অনায়াসে, অবলীলাক্রমে। ভূরাজনীতির ভায়রা ভাইরা গনি মিয়াদের ভালো করার কথা বলে নিজেদের দরদাম বাড়ায়। ক্ষমতা দস্যুদের কাছ থেকে বাইরের বড় ডাকাতরা পত্তনি ছাড়া জমিজমা ঘরদোর মনমানসিকতা মূল্যবোধ লিখে নেওয়ার পাঁয়তারা যে করছে তা দেখার বা ধরিয়ে দেওয়ার কেউ নেই।

গনি মিয়াদের কথা আগে যারা ভাবত তাদের আমলে নেওয়ার তাগিদ অনুভব করত তাদের এখন গনি মিয়াদের ব্যাপারে বেশ নির্ভার- নির্লিপ্ত মনে হয়। গনি মিয়ারা কেন সেটা ভেবে পায় না। গনি মিয়াদের সামান্য ক্ষতির বিনিময়ে দেশ ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা এটা বলার বা বোঝাবার বা শোনার যেন কেউ নেই। হালে পানি পাওয়ারও জো নেই। নতুন আয়কর আইন চাপিয়ে দেওয়ার সময় সেটা আরও বোঝা গেল। হাড়ে হাড়ে টের পাওয়ার সময় তো সামনে।

গনি মিয়াদের গ্রামে মৃধা ও চৌধুরী পরিবারের কাছ থেকে একসময় সবাই সমীহ সাহায্য-সহযোগিতা সবই পেত। দুই পরিবারই গ্রামবাসীকে হাতে রাখতে চেষ্টা করত। এখন চৌধুরী পরিবার মৃধা পরিবারকে গ্রামে টিকতেই দিচ্ছে না। চৌধুরী ও মৃধা পরিবার যে যখন পারত গ্রামে হুকুমদারি ও জোরজবরদস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে সবাইকে বশে রাখত। এখন চৌধুরী পরিবার তাদের প্রতিপত্তিকে স্থায়ী করার ইচ্ছায় একা সর্বেসর্বা হয়ে উঠতে চায়। অন্যদিকে মৃধা পরিবার তাদের অতীতের বাড়াবাড়ির কথা ভুলে গিয়ে শুধু পাওয়ার পাবার জন্য চৌধুরী পরিবারকে উৎখাত করতে চাচ্ছে। চৌধুরী পরিবার বিদ্যমান চলমান অন্যায়-অনিয়ম, জুলুম, বাড়াবাড়ি সম্পর্কে সতর্ক হয়ে ভুল স্বীকার করে আসল পথে আসার চেষ্টা না করে তারা যদি মৃধা পরিবারকে নির্মূল করার কাজে লেগে যায় এবং সেভাবে নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য পেতে চায় তাহলে হতভাগ্য গনি মিয়াদের গাঁয়ের উন্নয়নের পরিবেশ কী অবস্থায় দাঁড়াবে? আবার মৃধা পরিবার যদি নিজেদের অতীতের ভুল বা বাড়াবাড়ির পুনরাবৃত্তির পথ থেকে ফিরে আসবে, জিঘাংসায় মেতে উঠবে না এ ধরনের প্রতিজ্ঞা সবার কাছে করতে না পারে, তারা যদি শুধু চৌধুরী পরিবারের ওপর প্রতিশোধের পথ পেতে প্রতিপত্তি ফিরে পেতে চায়, তাহলে গনি মিয়াদের সামনে অন্ধকার ছাড়া কিছু থাকবে না। মৃধা ও চৌধুরী পরিবার ভোল পাল্টিয়ে গ্রামের সবার কল্যাণের কথা মুখে বলে পার পাবে না।

গ্রামের মানুষকে বোকা বানিয়ে তাদের উপেক্ষা করার ফল ভালো হয় না, হয়নি কখনো। গনি মিয়াদের নানাভাবে উপেক্ষা করে, অবজ্ঞা, হেনস্তা করা অব্যাহত রেখে ‘কাউকে পিছে ফেলে নয়’ এ ধরনের বড় বড় কথা বললেই পেছনের লোক সামনে উঠে আসবে না। কথায় ও কাজে নিজেদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হওয়া দরকার। গ্রামের অনেকে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে, উন্নয়নের কথা বলে টাকা-পয়সা সরিয়ে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি করছে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ব্যবসায়, ব্যাংকের টাকা নয়ছয় করে হাতিয়ে নিয়ে সেই শক্তিশালী সিন্ডিকেটরা যদি চৌধুরী পরিবারের পক্ষ নেয়, তখন গনি মিয়াদের পাত্তা না দিয়ে চৌধুরী পরিবার যে উন্নত গ্রাম গড়ার স্বপ্ন দেখাবে তা কি আদৌ টেকসই হবে। গনি মিয়াদের সামান্য ক্ষতির বিনিময়ে তারা বড় ক্ষতিতে নিজেরা তো পড়বেই, পুরো গ্রামবাসীকে সর্বনাশের সামনে ছুড়ে দেবে। এ কথা মৃধা বা চৌধুরী পরিবারের সবাই যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন, দেশটা একলা তাদের নয়; এটি সবার সবার ভালোমন্দ নিশ্চিত করতে সবাইকে সঙ্গে নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

mazid.muhammad@gmail.com