জেলা জজকে হাইকোর্ট

আপনি যেটা করেছেন সেটা ভুল নয় ক্রাইম

যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে জামিন আবার জামিনের আদেশে টেম্পারিংয়ের (ঘষামাজা) অভিযোগ। এমন পরিস্থিতিতে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইলের উদ্দেশে হাইকোর্ট বলেছে, ‘আপনি যেটা করেছেন, সেটা ভুল নয় ক্রাইম (অপরাধ)। ভুল এক জিনিস আর করাপশন (দুর্নীতি) আরেক জিনিস। একটি অপরাধ ঢাকতে গিয়ে আরও কিছু অন্যায় করেছেন।’ ওই বিচারকের বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানির পর আদেশের জন্য আগামী ২৭ জুলাই ধার্য করে আদালত।

শুনানিকালে প্রায় ৪০ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিলেন বিচারক মোহম্মদ ইসমাইল। একপর্যায়ে হাতজোড় করে হাইকোর্টের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন তিনি। বিচারকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ রাজা ও সুপ্রিম কোর্ট বার সম্পাদক আবদুন নূর দুলাল। অন্যপক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ বি এম আলতাফ হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার।

দুই মাস আগে কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিন না-মঞ্জুরের পর একই দিন হাজতবাস উল্লেখ করে আসামিদের জামিন দেওয়ার ঘটনায় ওই বিচারককে গত ২১ জুন তলব করে হাইকোর্ট। গত বুধবার আদালতে হাজির হয়ে হলফনামা দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন তিনি। হাইকোর্ট ওইদিন তাকে ভর্ৎসনা করে তার বিচারিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আবেদন যথাযথ না হওয়ায় গতকাল আবারও শুনানির দিন ধার্য করে হাইকোর্ট। গতকাল বিচারকের আইনজীবীরা নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে আরেকটি আবেদন করেন।

মামলার নথি ও আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হুমকি ও আইনশৃঙ্খলা বিঘœ ঘটনার অভিযোগে জেলার রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছ ভুট্টোসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ ও আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী দ্রুত বিচার আদালতে নালিশি মামলা করেন স্থানীয় খোদেস্তা বেগম রিনা। এ মামলায় গত ১১ এপ্রিল হাইকোর্ট আসামিদের ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়ে কক্সবাজার অধস্তন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। ২১ মে আসামিরা কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে জামিন চাইলে তাদের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হয়। একই দিন আসামিরা জেলা ও দায়রা আদালতে আবেদন করলে বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল আসামিদের হাজতবাস দেখিয়ে তাদের জামিন মঞ্জুর করে আদেশ দেন। পরে এ আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন খোদেস্তা বেগম। বাদীর অভিযোগ, জামিন না-মঞ্জুরের আদেশের কোনো প্রত্যয়িত অনুুলিপি কিংবা নথি যাচাই না করে এবং আসামিরা হাজতে না থাকলেও তাদের দীর্ঘ হাজতবাস দেখিয়ে জামিন দেন ওই বিচারক।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেন, আদেশের একটি অংশে আসামিদের দীর্ঘ হাজতবাস বিবেচনায় জামিনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পরে ‘দীর্ঘ হাজতবাস’ শব্দটি ঘষামাজা করা হয়েছে। অস্বাভাবিক এ বিষয়টি হাইকোর্টের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। শুনানিকালে হাইকোর্ট বিচারকের উদ্দেশে বলে, ‘জামিন দেওয়ার কিছু নিয়ম আছে। দুপক্ষকে রাখতে হয়। হাজতবাসের মেয়াদ দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে জামিন দিলেন। কোনো রেকর্ড (নথি) ছিল না। শুধু আইনজীবীদের এফিডেভিট (হলফনামা) দেখে জামিন দিলেন।’ আদালত আরও বলে, ‘পেনসিল দিয়ে কাটাকুটি করে নিজের আদেশ নিজেই টেম্পারিং করেছেন। এখন দোষ চাপাচ্ছেন স্টাফদের ওপর।’

বিচারকের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, ‘আমরা নিঃশর্ত ক্ষমা চাইছি।’

এ পর্যায়ে বিচারককে ডায়াসের সামনে ডেকে নিয়ে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বলেন, ‘আপনার অফিস থেকে এই আদেশ যাবে, আপনি দেখবেন না? আপনার অবগতি ছাড়া তো আদেশ লেখা হবে না। এটা ভুল নয় টেম্পারিং। এটি ক্রাইম। আপনি টেম্পারিং করেছেন। ভুল এক জিনিস আর করাপশন আরেক জিনিস।’

বিচারক ইসমাইল এ সময় হাতজোড় করে হাইকোর্টের উদ্দেশে বলেন, ‘মাই লর্ড, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি ক্ষমা চাইছি।’ 

হাইকোর্ট বলে, ‘আপনার অনুতাপ হওয়ার কথা। কিন্তু সে অনুতাপ তো দেখছি না। এখানে (হাইকোর্ট) আসার আগে আপনি টেম্পারিং করে এসেছেন।’ 

বিচারকের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, ‘একজনের ভুলের জন্য বিচার বিভাগের দুর্নাম হবে এটি আমরাও চাই না।’

বাদী পক্ষের আইনজীবী এ বি এম আলতাফ হোসেন এ সময় বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা লজ্জা পাচ্ছি।’

হাইকোর্ট বলে, ‘আমরাও লজ্জা পাচ্ছি। এটি করতে তার বুক কাঁপেনি। একটা অপরাধ করতে গিয়ে আরও কিছু অন্যায় করেছেন তিনি।’ 

একপর্যায়ে দাঁড়িয়ে থাকা কক্সবাজারের বিচারক বলেন, তিনি অসুস্থবোধ করছেন। বসতে চান। হাইকোর্ট তাকে বসতে দেওয়ার কথা বলে। দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে আগামী বৃহস্পতিবার আদেশের জন্য দিন ধার্য করে হাইকোর্ট।