দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা কমছে, কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। গত পাঁচ দিনে নারীদের আক্রান্তের হার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। কিন্তু সংখ্যায় মৃত্যু বেড়েছে। ১৮ জুলাই মৃত্যু ৫৭ শতাংশ এবং আক্রান্তের ৩৭ শতাংশ ছিল নারী। সেদিন পর্যন্ত মৃত্যু ছিল ১২৭ জন। তাদের মধ্যে নারী ৭৩ ও পুরুষ ৫৪ জন। কিন্তু গতকাল শনিবার শতাংশ হিসাবে নারীর মৃত্যু একই জায়গায়, অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ৫৭ শতাংশে স্থির ছিল। কিন্তু সংখ্যায় তা বেড়ে ৯৫ জন হয়েছে ও মোট পুরুষ মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৭২ জনে। অথচ নারী আক্রান্ত কমে ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে এবং পুরুষ আক্রান্ত বেড়ে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
এদিকে মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবার নতুন কীটনাশক এনেছে। বিটিআই নামের এই কীটনাশকের প্রথম চালান চট্টগ্রামে পৌঁছেছে। কীটতত্ত্ববিদরা নতুন এই কীটনাশককে কার্যকর বললেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তা ব্যবহারে এখনো উদ্যোগ নেয়নি।
নারীর মৃত্যু বাড়ছেই : ডেঙ্গুতে নারী মৃত্যু বাড়ার কারণ হিসেবে দেরিতে হাসপাতালে আসা ও চিকিৎসা শুরুর কথা বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে নারীদের বেশি মৃত্যু হওয়ার প্রকৃত কারণ এখনো অনুসন্ধান করা হয়নি। তবে তারা চিকিৎসা দেরিতে শুরু
করছেন ও দেরিতে হাসপাতালে আসছেন, এটা কারণ হতে পারে। এ ছাড়া নারীরা আক্রান্ত হলে গুরুত্ব দিচ্ছেন না এটা বেশি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, চলাফেরা বেশি করা এবং সতর্কতা অবলম্বন না করায় ডেঙ্গুতে পুরুষরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।
এমন অবস্থায় গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) আরও ১১ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের এবং ঢাকার বাইরে ২ জনের। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত এ বছর মারা গেল ১৬৭ জন। মৃত্যুর এই সংখ্যা দেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসে এখনো তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। এর আগে গত বছর মৃত্যু ছিল ২৮১ এবং ২০১৯ সালে ১৭৯ জন।
এ বছর এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যুর ৭২ শতাংশই ঘটেছে এ মাসের গত ২২ দিনে; অর্থাৎ এ সময় মারা গেছে ১২০, যা গত মাসে ছিল ৩৪ জন।
অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় আবারও বছরের সর্বোচ্চ ২ হাজার ২৪২ জনের হাসপাতালে ভর্তির রেকর্ড হয়েছে। এর আগে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল গত ১৯ জুলাই ১ হাজার ৭৯২ জনের। এ নিয়ে এ বছর ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৩০ হাজার ৬৮৫ জন। তাদের মধ্যে ঢাকায় ভর্তি হয়েছেন ১৮ হাজার ৮৮৫ জন ও ঢাকার বাইরে ১১ হাজার ৮০০ জন।
বেশি মৃত্যু ১৮-৪০ বছরের মধ্যে : এবার এখন পর্যন্ত এই বয়সী নারী ও পুরুষ সবচেয়ে বেশি মারা গেছে। এই মৃত্যুর সংখ্যা ৬৫। তাদের মধ্যে ৪৫ জন নারী ও ২০ জন পুরুষ। এরপর ৪০-৬০ বছরের মধ্যে ৩৯ জন ও তাদের মধ্যে ২২ জন নারী ও ১৭ জন পুরুষ; ৬০-৮০ বছরের মধ্যে ১১ জন নারী ও ১৪ জন পুরুষ, মোট ২৫ জন; ১০-১৮ বছরের মধ্যে ৮ জন নারী ও ১১ জন পুরুষ, মোট ১৯ জন মারা গেছে।
মশা মারতে এবার নতুন অস্ত্র বিটিআই : এবার ঢাকার এডিস মশার প্রজনন রুখতে নতুন অস্ত্র হিসেবে কীটনাশক বিটিআই ব্যবহার করবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। সিঙ্গাপুর থেকে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে এই কীটনাশক। কিছুদিনের মধ্যে ঢাকায় আসবে বলে ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে।
এই কীটনাশক ব্যবহারে ঢাকার কাছাকাছি আবহাওয়া ও জলবায়ুগত অবস্থানে থেকে কলকাতা, সিঙ্গাপুরসহ বিশে^র বিভিন্ন শহর সফলতা পেয়েছে। সে কারণে ঢাকায়ও সফলতা আসবে বলে আশাবাদী ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ এবং কীটতত্ত্ববিদরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস (বিটিআই) এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে এটা বেশ কার্যকর। বিভিন্ন দেশে মশা নিয়ন্ত্রণে এটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এ ব্যাকটেরিয়া মশা, মাছি ও অন্যান্য পতঙ্গের লার্ভা মেরে ফেলে। লার্ভা ধ্বংস হওয়ায় মশার সংখ্যা কমে যায়। এই ব্যাকটেরিয়া পরিবেশবান্ধব; এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। এটি সাধারণত তরল, পাউডার বা ট্যাবলেট আকারে হয়ে থাকে। এটি পানিতে প্রয়োগ করলে জলজ প্রাণীরও ক্ষতি হয় না। বিশে^ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিটিআইয়ের ব্যবহার চলছে।
আরও জানা যায়, ডিএনসিসি পাউডার বিটিআই আনছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর থেকে আনা ৫ টন বিটিআই চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমসে পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষে আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ঢাকায় পৌঁছাতে পারে। কারিগরি কমিটির পরামর্শক্রমে বিটিআই আনছে ডিএনসিসি; এই কীটনাশক প্রথমবারের মতো দেশে ব্যবহৃত হবে। এটি সরকারের রেজিস্টার্ড কীটনাশক।
ঢাকার দুই সিটি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে উত্তর সিটি মশক নিয়ন্ত্রণে টেমিফস, ম্যালাথিউন, নোভা লিউরন, ম্যালেরিয়া ওয়েলবি কীটনাশক ব্যবহার করছে। এই তালিকায় নতুন করে যুক্ত হবে বিটিআই কীটনাশক। আর দক্ষিণ সিটি মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করছে টেমিফস, ম্যালাথিউন ও ডেল্টা ম্যাথরিন। বিটিআই ব্যবহারের বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ সিটি কর্তৃপক্ষ।
এ প্রসঙ্গে কীটতত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিটিআই খুব কার্যকর কীটনাশক। আরও আগে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে এই কীটনাশকের ব্যবহার শুরু করা দরকার ছিল। ডিএনসিসি ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিটিআইয়ের যথাযথ ব্যবহার পদ্ধতি জেনেই এর ব্যবহার করতে হবে; তাহলে এই মৌসুমেও মশা নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সুফল পাওয়া যেতে পারে।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, বিটিআই ভালো কীটনাশক। এটা পরিবেশবান্ধব। তবে এর সুফল পেতে সঠিক জায়গায়, সঠিক সময়ে এবং সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। নতুন কীটনাশক হওয়ায় মশককর্মীদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম শফিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএনসিসির স্বাস্থ্যবিষয়ক টেকনিক্যাল কমিটির পরামর্শক্রমে বিটিআই আনা হচ্ছে। এতে ইতিবাচক সুফল মিলবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. ফজলে সামছুল কবির বলেন, এডিস মশার লার্ভা নিধনে টেমিফস ভালো কাজ করছে। এজন্য বিটিআইয়ের চিন্তা করছে না ডিএসসিসি। এর পরও চলতি বছরে স্বাস্থ্যবিষয়ক কারিগরি কমিটির সভায় বিটিআইয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সেখানে ঢাকার মশা নিয়ন্ত্রণে বিটিআই ব্যবহারের বিষয়ে অনুমোদন মেলেনি।