চালকের ফোন বন্ধ করবে কে?

লোকাল বা দূরপাল্লার বাস চলন্ত অবস্থায় চালকের ফোন বন্ধ রাখার আইন রয়েছে। ২০০৭ সালের মোটর যান আইনের ১৪০ ধারা অনুযায়ী তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই আইন অমান্য করলে চালকের ১ মাসের কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু সেই আইনের প্রয়োগ নেই। একজন চালক কখনও যাত্রীদের কথা শোনেন না। কোনও যাত্রী কঠোরভাবে শাসন করলে তাকে হেনস্থা হতে হয় চালক ও কন্ডাক্টরের কাছে। শুধু কথাই না, দেখা যায়- রাজধানীর বিভিন্ন পাবলিক বাসের চালকেরা গাড়ি চালাতে চালাতে আবার ভিডিও কলেও কথা বলেন। অশিক্ষিত, গোঁয়ার এবং উগ্র স্বভাবের অধিকাংশ চালক আবার কোনও ধরনের নেশা করা ছাড়া গাড়িও চালাতে পারেন না!

দেশ রূপান্তরে রবিবারে প্রকাশিত সংবাদে জানা যাচ্ছে- একজন চালকের ফোনে কথা বলার কারণে ঝালকাঠিতে একটি যাত্রীবাহী বাস গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুকুরে পড়ে যায়। দুর্ঘটনায় ১৭ জন মারা যান। আহত হন ৩৫ জন। এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মারা গেলেন, তাদের জীবনের দাম তাহলে ( ১৭/৫০০) - ৮৫০০ টাকা? কী চমৎকার মোটর যান আইন! চালক ফোনে ব্যস্ত থাকার কারণে এ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনও তেমন কোনও শাস্তি হয়নি। ফলে দীর্ঘদিনের অভ্যাসমতো চালক নিয়মিত ফোনে কথা বলেই যাচ্ছেন।

গাড়ির যাত্রীরা চলন্ত অবস্থায় পুরোপুরি নির্ভরশীল চালকের ওপর। একজন চালকের হাত, পা, চোখ এবং কান অত্যন্ত ব্যস্ত থাকে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ কাজে। তাদের সতর্ক থাকতে হয়, গাড়ির ব্রেক এবং এক্সিলেটরের বিষয়ে- যা নিয়ন্ত্রিত হয় পা দিয়ে। আর দুই হাতের মাধ্যমে স্টিয়ারিং ধরে তারা নিয়ন্ত্রণ করেন, একটি রাস্তায় কোন কোন গিয়ারে চালাতে হয় এবং গাড়ি চলাচলের গতিপথ। এর মানে হচ্ছে, গাড়ি চলন্ত অবস্থায় কোনোভাবেই হাত-পা-চোখ-কানকে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত রাখা যাবে না। কিন্তু চালকরা কি তা মেনে চলছেন? যদি কোনো চালক এই আইন না মানেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কী ধরনের আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে?

আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি, কোনও চালকের বিন্দুমাত্র শাস্তি হয়েছে গাড়ি চলন্ত অবস্থায় ফোনে কথা বলার জন্য। একজন ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব এসব দেখাশোনার। কিন্তু কে দেখেছে, কবে? উপরন্তু দেখা যায়, ঢাকা শহরে নিয়মিতভাবে প্রতিদিন শতশত গাড়ি থামানো হচ্ছে, গাড়ি এবং ড্রাইভারের লাইসেন্স দেখার নামে। তখন একজন চালক ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির লাইসেন্সের ভিতরে ২০০/৩০০ টাকা ভরে দিচ্ছেন। এরপর ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কিছুক্ষণ ফুসুর ফুসুর। ট্রাফিক পুলিশও গম্ভীর মুখে ড্রাইভিং লাইন্সের কাগজ উল্টাচ্ছেন এবং একসময় পেয়ে যান কাঙ্খিত নোট। ব্যস, সব ওকে। আবার চলতে থাকে গাড়ি। বামহাতে স্টিয়ারিং আর ডানহাতে মোবাইল নিয়ে বিভিন্ন টাইপের কথা, হাসাহাসি করছেন চালক। গাড়ি চলছে, কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই তার মনোযোগ মোবাইলে। তখন দুই পা আর এক হাত সচল থাকলেও ড্রাইভারের মনোযোগ থাকে মোবাইল ফোনে। তিনি ভুলে যান গাড়িতে যাত্রী আছেন কমপক্ষে ৫০-৬০ জন। স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতে বলতে, তিনি চলে যান অন্য জগতে। তখন আর শরীরের হাত-পা-চোখ-কান নিয়ন্ত্রণে থাকে না। ফলে নিশ্চিত দুর্ঘটনা। জীবন যায় গাড়ির যাত্রীদের।

গাড়ি চলন্ত অবস্থায় কোনো চালক যদি ফোনে কথা বলেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কমপক্ষে ১০০০০ টাকা জরিমানার বিধান রাখা উচিত। একইসঙ্গে এই আইন ঠিকমতো চালকরা মেনে চলছে কী না, সে বিষয়ে নিয়মিতভাবে প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কিন্তু এটা কে করবে? গভীরভাবে এ বিষয়ে ভাবতে হবে। সিদ্ধান্ত নিয়ে কঠোর আইনের প্রয়োগ ঘটালে, গাড়ি চলন্ত অবস্থায় চালকদের ফোনে কথা বলার প্রবণতা কমে যেতে বাধ্য। কই, কখনওতো কোনও গাড়ির হেডলাইট বন্ধ করে কিংবা গাড়ি চলাচলের ব্যাক লাইট বন্ধ রেখে রাস্তায় গাড়ি দেখা যায় না! এর মানে হচ্ছে, এসব না থাকলে তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে। আবার বড় ধরনের কোনও অপরাধ করলে গাড়িকে ডাম্পিংয়েও পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু গাড়ি চলন্ত অবস্থায় একজন চালকের ফোনে কথা বলার অপরাধকে কোন পর্যায়ের অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে- আইন অমান্যের জরিমানা এবং শাস্তির বিধান দেখলেই পরিস্কার হওয়া যায়।

চালকদের এ বিষয়ে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং আইন পরিবর্তন করে কঠোর বিধান রাখা না হলে, গাড়ি চলন্ত অবস্থায় চালকদের ফোনে কথা বলা বন্ধ করা যাবে না। এর জন্য কোন কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হবেন- সেটা দেখার দায়িত্ব সরকারের। গাড়ি চলন্ত অবস্থায় চালক ফোনে কথা বলবেন আর নিহত-আহত মানুষদের জীবনের দাম হবে ৫০০ টাকা? এ যেন এক ইচ্ছাজগত, যেখানে মানুষ চালকের হাতে বন্দী!