রিজার্ভের তিনটা হিসাব কেন

এত দিন বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার একটা হিসাব দিয়ে আসছিল। এখন থেকে দেবে তিনটা; একটি সনাতনী হিসাব পদ্ধতিতে করা, দ্বিতীয়টি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিধান মতে করা, আর তৃতীয়টি নিট, যেটি সাধারণ্যে প্রকাশ্য নয়। আইএমএফের কথা হলো, যে গরু গোয়ালে নেই, তার হিসাব কেতাবে অন্তর্ভুক্ত করে স্থিতির স্বাস্থ্যে স্ফীতি আনা চলবে না। ঋণদাতা সংস্থাটির ব্যবস্থাপত্র হলো রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলসহ (ইডিএফ) অন্যান্য তহবিলে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্থানান্তরিত রয়েছে, অর্থাৎ যে পরিমাণ মুদ্রা চাহিবামাত্র লভ্য হবে না, তা স্থিতি থেকে বাদ দিয়ে হিসাব করতে হবে। এই পদ্ধতি অনুসরণে প্রতিষ্ঠানটি ৩০ জুন, ২০২৩ তারিখের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা মজুদের তল-সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল ২৪.৪৬ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি ২৩.৫৬ বিলিয়ন ডলার, যদিও আমাদের আগের পদ্ধতি অনুসারে ওটার মজুদ ২৯.৯২ বিলিয়ন। প্রথমোক্ত দুটোই গ্রস হিসাব; রিজার্ভ সংশ্লিষ্ট বকেয়া দায় এবং বছরের মধ্যে  পরিশোধযোগ্য ঋণের সুদাসল বাদ দেওয়া হলে নিট উপাত্ত পাওয়া যাবে, সেটা হয়তো আরও দুই তিন বিলিয়ন কম হতে পারে। কিন্তু গভর্নর বাহাদুরের কথা হলো যে, বিশ্বের কোনো দেশই নিট রিজার্ভের তথ্য প্রকাশ করে না। কাজেই তিনিও সেটা করবেন না। ২০২১ সালে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে সেই মজুদের অবনমন ঘটে সেটা এখন হয়ে গেছে ২৩.৫৬ বিলিয়ন। অনেকেই আতঙ্কিত বোধ করছেন। অর্থনীতিবিদরা নানা রকম কথাবার্তা বলছেন। আমি খাদ্যশস্যের মতো স্পর্শকাতর পণ্যের মজুদ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছি, সেই আলোকে কিছু কথা বলা প্রাসঙ্গিক মনে করছি।

খাদ্যনীতিতে ৩০ জুন তারিখে খাদ্যশস্যের অন্যূন ১০ লাখ মেট্রিক টন মজুদ নির্বাহ করার বাধ্যবাধকতা আছে। দেশের প্রধান ফসল বোরো কাটার ভরা মৌসুমে এই মজুদের আবশ্যকতা অনেকের কাছেই খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তার ওপর ২০১৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত অনুকূল আবহাওয়া ও সরকারের নীতি সহায়তায় খাদ্যশস্যের বাড়ন্ত ফলন থেকে জুন মাসে এই পরিমাণ মজুদ গড়া ছিল অত্যন্ত সহজ একটা কাজ। এর মধ্যে ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কায় ২৫ হাজার টন চাল রপ্তানিও করা হয়েছিল। তখন খাদ্যশস্য, বিশেষ করে চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে অতিক্রম করে ফেলেছিÑ এমন একটা উন্নাসিকতা আমাদের পেয়ে বসেছিল। এরপর ২০১৭ সালের মার্চ মাসে শ্রীলঙ্কায় ৫০ হাজার টন চাল রপ্তানির প্রস্তাব আসে। কিন্তু খাদ্য অধিদপ্তর থেকে মে-জুন মাসে সংগ্রহতব্য বোরো ফসলের সংগ্রহ সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে ঐ সময় চাল রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া সমীচীন হবে না মর্মে জানানো হয়। এতে মন্ত্রণালয় তখন খাদ্য অধিদপ্তরের ওপর ভীষণ নাখোশ হয়। এপ্রিল মাসে সিলেটে অকাল বন্যার প্রভাবে ঐ বছর চালের দাম এত বেড়ে যায় যে, ৩০ জুন ত্রাণ খাতের মালামাল বিলি বণ্টনের পর চালের মজুদ দাঁড়ায় মাত্র ১,৩৫,০০০ টন; দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য তা ছিল এক অশনি সংকেত। ঐ বছর শ্রীলঙ্কায় চাল রপ্তানি করা হলে তখন বিরোধী পক্ষ নিশ্চয়ই আমাদের কাণ্ডকারখানা চীনের এৎবধঃ খবধঢ় ঋড়ৎধিৎফ কালের সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ পেত। চীনে তখন একদিকে খাদ্যশস্য রপ্তানি চলছিল, আবার অন্য দিকে খাদ্যাভাবে মানুষ মৃত্যুবরণ করছিল।

বৈদেশিক মুদ্রা হলো অন্য কোনো দেশ থেকে পণ্য ও সেবা ক্রয় করার জন্য ব্যবহৃত আর্থিক ক্ষমতার একটা একক। আর বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বলতে কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রায় গচ্ছিত সম্পদের মজুদকে বোঝায়। দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা-রিজার্ভের অনুকূল প্রভাব নানামুখী। দেশের বাইরের দেনা-পাওনা পরিশোধ ও মুদ্রানীতি প্রভাবিত করতে এর ব্যবহার সর্বজনবিদিত। অর্থনীতির ঘাত-প্রতিরোধ ক্ষমতা ও নমনীয়তা বৃদ্ধি করতে এর ভূমিকা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। দেশীয় মুদ্রামানের অবাঞ্ছিত অবমূল্যায়ন ঘটলে এই মজুদ ব্যবহার করে বাজারের ঘাত-প্রতিরোধ করা হয়। যে কোনো সংকটে দ্রুত পণ্য ও সেবা আমদানিতে উদ্বৃত্ত বৈদেশিক মুদ্রার ভূমিকার কোনো তুলনা নেই; আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পণ্যের সরবরাহ বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতি বাগে আনা যায়। উচ্চ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা ও প্রণোদনা জোগায়। তাছাড়া, দেশের বিভিন্ন সেক্টরের অবকাঠামো উন্নয়নে এটা বিশেষ তহবিল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

কতটা বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ দেশ ও অর্থনীতির জন্য নিরাপদ তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। তবে এ বিষয়ে অঙ্গুষ্ঠ বিধি (Rule of thumb) হলো ৩ মাসের আমদানি বিলের সমপরিমাণ শক্ত মুদ্রা। তবে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার যে, সরকার তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি আস্থাশীল হয় যে, গৃহীত সময়োপযোগী সংস্কার কর্মকাণ্ডের ফলে অদূর ভবিষ্যতে টেকসই ভিত্তিতে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে, তবে ৩ মাসের অঙ্গুষ্ঠ বিধি কোনো অলঙ্ঘনীয় বাধা নয়। কঠিন সময়ে খাদ্যশস্যের নিরাপত্তা মজুদ গড়তে গিয়ে আমরা এর সত্যতা পেয়েছি।   

এখন মাসে গড়পড়তা ৫.৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে; বিগত মে মাসে যেটা ছিল ৬.৪৬ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবে দেশের রিজার্ভ ৩ মাসের বিল পরিশোধের জন্য পর্যাপ্তই বলা চলে। কাজেই আপাতত শঙ্কার কোনো কারণ নেই; তবে সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হলো সাম্প্রতিককালে রিজার্ভ ক্ষয়ের হার; প্রতি মাসে গড়পড়তা এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মুদ্রা ভাণ্ডার থেকে বিযুক্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ডলারের খরচ কমাতে গিয়ে আমাদানিতে নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। অথচ এদেশের রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় ৪০ থেকে ৫০ ভাগ কাঁচামাল, মধ্যবর্তী ও মূলধনী পণ্য আমদানি করতে হয়। ফলে সামনের দিকে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তৃতীয়ত, মুদ্রাপাচার রোধ করা এবং আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে বিদেশি মুদ্রা দেশে নিয়ে আসার কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। কাজেই, কয়েক মাসের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না করা গেলে খাদের কিনারায় উপনীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশে বৈদেশিক মুদ্রার বড় ক্ষয় শুরু হয় ২০২১-২২ অর্থবছরে; তখন মোট ৮৯.৩৩ বিলিয়ন ডলার আমদানি বিল পরিশোধ করতে হয়। বাণিজ্য লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দেয় ৩৩.২৪ বিলিয়ন ডলার এবং চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়ায় ১৮.৬৮ বিলিয়ন ডলার। এটাই বৈদেশিক ভাণ্ডারের ওপর বেশি চাপ তৈরি করে। বিগত অর্থবছরে অবশ্য এই ঘাটতির পরিমাণ কমে আসতে থাকলেও পরিস্থিতি উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয়। এর জন্য নানামুখী স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কার্যক্রম নেওয়া দরকার।

প্রথম কাজ হবে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে রিজার্ভের হিসাবায়নে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা। গভর্নর বাহাদুরের নিট হিসাব প্রকাশ না করার দৃঢ় অঙ্গীকার আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিপরীত ফল এনে দিতে পারে। যে পদ্ধতিতেই হিসাব করা হোক না কেন, মানুষ এখন আর বড় কোনো অঙ্ক বিশ্বাস করতে চাইবে না; গোপনে সংরক্ষিত ছোট নিট অঙ্কটি খুঁজে বের করতে চাইবে। কাজেই অতিরিক্ত খাটাখাটি না করে শুধু নিট স্থিতিটা প্রকাশ করলে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, অনাবশ্যক বিলাস পণ্যের আমদানি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তবে রপ্তানি যাতে ব্যাহত না হয়, তার জন্য কাঁচামাল ও সংশ্লিষ্ট অন্তর্বর্তী পণ্যের আমদানি কোনোক্রমেই ব্যাহত করা যাবে না। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও নিখুঁত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে যখন দলে দলে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা দেশে প্রবেশ করছিল, তখন ঐ দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিল খুবই তিক্ত। কিন্তু নৈকট্যের কারণে সেদেশ থেকে চাল আমদানি করা ছিল অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে সহজ, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তা ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী সিদ্ধান্তে সেখানে গিয়ে আমরা যে চুক্তি সম্পাদন করি, সেই চালই প্রথম দেশে প্রবেশ করে এবং আমরা তাতে প্রভূত স্বস্তি লাভ করি। এখানেও অনুরূপ গতিশীল ও উদ্ভাবনমূলক কাজ করা যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে আমদানির ক্ষেত্রে ওভার-ইনভয়েসিং এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং-এর কথা বারবার বলে আসছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও এই জাতীয় অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। এখানে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন নীতি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে কার্যকর করা হলে অবস্থারও দ্রুত উন্নতি হতে বাধ্য। 

বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের সবচেয়ে প্রচলিত মাধ্যম হলো হুন্ডি। অর্থমন্ত্রী নিজেই একবার উল্লেখ করেছেন যে, যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আসে, তার সমপরিমাণ মুদ্রার লেনদেন হয় অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে। এর মানে শুধু হুন্ডি প্রতিরোধ করে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা যায়। বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলারের বিপরীতে টাকার প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ করে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব মর্মে অর্থনীতিবিদদের অভিমত। এটা করতে গড়িমসি কেন? একদিকে দুর্বিষহ মুদ্রাস্ফীতি, আরেক দিকে আমানতের সুদের হারে টুপি; পুঁজিবাজারের অবস্থাও টালমাটাল। এই প্রেক্ষাপটে অনেক রাঘব বোয়াল নাকি মূলধনী মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে ডলারের মজুদ গড়ে তুলেছেন। ত্রুটিপূর্ণ মুদ্রানীতিতে এটা বিচিত্র কিছু না।         

অভিযোগ আছে যে ঋণখেলাপিরা ইচ্ছা করেই তাদের ঋণের একটা বড় অংশ প্রকল্পের বাইরে সরিয়ে নেন এবং সেটা সুযোগ-সুবিধা মতো বাইরে পাচার করে দেন। ফলে খেলাপি হয়ে প্রতিষ্ঠানে লালবাতি জ্বললে তাদের কোনো সমস্যা নেই। এদের নিয়ন্ত্রণ করা কি রাষ্ট্রের জন্য এতই কঠিন?

ঋণ প্রদানের সময় বেশি বেশি করে শর্ত আরোপ করায় অনেকেই আইএমএফকে গালমন্দ করে থাকেন। আইএমএফ সাধারণত অর্থনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়ে শর্তগুলো আরোপ করে থাকে, যেগুলোর অধিকাংশ হয়ে থাকে রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয়। সরকার এইসব অজনপ্রিয় শর্তের বোঝা মাথায় নিয়ে ঋণ গ্রহণ করেছে, তাও আবার নির্বাচনের বছরে, এটা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী কাজ। আশা করব সংস্কার বাস্তবায়নেও দলটি সমধিক সাহসিকতা ও আন্তরিকতা দেখাবে।

লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট

rulhanpasha@gmail.com