দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৫৬ লাখ টন। চাহিদা পূরণে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের পাশাপাশি সামান্য কিছু আমদানি করতে হয়। সম্প্রতি বিশে^র দ্বিতীয় উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশ ভারত হঠাৎ করেই চাল রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এতে দেশটির রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এশিয়ার অন্যান্য দেশে পড়তে শুরু করেছে। দেশের চালের বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। তবে দেশে এবার ধানের বাম্পার ফলন ও পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় চালের বাজার স্থিতিশীল রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে এবার চাহিদার থেকে ২৭ লাখ টন বেশি চাল উদ্বৃত্ত রয়েছে। ফলে ভারতের চাল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব দেশে চালের বাজারে পড়ার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। কিন্তু ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, নির্বাচনী বছর ও সরকারের শেষ সময়ে তারা ভর্তুকি দিয়ে হলেও দেশের চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে চাইবে। যার ফলে দেশের প্রধান খাদ্য উপকরণ চালের বাজার অস্থির হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের বাজারদরের তালিকা অনুযায়ী, গতকাল সোমবার ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি সরু চাল বিক্রি হয়েছে ৬০ থেকে ৭৫ টাকায়। মাঝারি মানের চাল (পাইজাম) ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় এবং মোটা চাল ৪৮ থেকে ৫২ টাকায়। যদিও বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট ৬২-৬৪, বিআর-আটাশ ৩৩-৪৮ ও নাজির শাইল ৬৬ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী আউয়াল তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ মুহূর্তে দেশের চালের বাজারে স্থিতিশীল রয়েছে। ভারত চাল রপ্তানি বন্ধ করলেও এর প্রভাব দেশের চালের বাজারে নেই। তা ছাড়া সরকারের শেষ সময় হিসেবে তারা চাইবে দেশের প্রধান খাদ্যসামগ্রীতে ভর্তুকি দিয়ে হলেও চালের বাজার ঠিক রাখতে।
কারওয়ান বাজারের চালের পাইকার ব্যবসায়ী শাওন একই কথা বলেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তুলনামূলক কেনাবেচা কম হলেও বাজারে চালের সংকট নেই। পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে চালের দাম। তা ছাড়া এবার বোরো ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে। সব মিলিয়ে বাজারে চালের দাম বাড়ার কোনো কারণ দেখছি না।
সূত্র বলছে, কৃষকপর্যায়ে এবার ধান, গমের উৎপাদন ভালো হওয়ায় সরকার স্থানীয়ভাবে এ দুটি খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করবে। ইতিমধ্যে চাল সংগ্রহ শুরু করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ টনের ওপর ধান-চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। আগামী ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ১২ লাখ ৫০ হাজার টন চাল-ধান কেনা হবে।
বর্তমানে দেশের চালের বাজার স্থিতিশীল থাকা ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় চাল আমদানির প্রয়োজন নেই বলে মনে করছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। বরং চাহিদার তুলনায় মজুদ বেশি থাকায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে আনা হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে আট লাখ টন চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হলেও চলতি অর্থবছরে এ সংখ্যা দুই লাখ টনে নামিয়ে আনা হয়েছে।
অবশ্য দেশে বাম্পার ফলন হলেও অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কারসাজি নিয়ে বাজার বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন। তারা বলছেন, ভারতের নিষেধাজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে চালের বাজার অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা করবেন চালের মজুদকারীরা। তাদের হাত থেকে জনগণকে রক্ষায় সরকারের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
জানতে চাইলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের অনেক পণ্য ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। সে ক্ষেত্রে ভারত সরকার কোনো পণ্যের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দিলে দেশের ব্যবসায়ীরা এর থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। অতীতে আমরা দেখেছি পেঁয়াজের বাজার নিয়ে তারা লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এবার চালের ক্ষেত্রে তাদের একই কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, শুধু ধান নয়, দেশের যেকোনো পণ্যে উৎপাদন ভালো হলে তার সুবিধা জনগণ পান না। ব্যবসায়ীদের অসাধুতায় বাজারে চালের দাম তেমন একটি কমেনি। চাহিদার থেকেও ২৭ লাখ টনের বেশি চালের উদ্বৃত্ত থাকার পরও বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। এ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে চালের বাজার কঠোর মনিটরিংয়ে রাখতে হবে। তা না হলে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি ভোক্তাদের ভোগাবে। কেননা আমরা জানতে পেরেছি করপোরেট ব্যবসায়ীরা প্রচুর পরিমাণে ধান-চালের মজুদ করেছেন এবার।