গত মাসের শেষ দিন, অর্থাৎ ৩০ জুন দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ১২ জেলা ডেঙ্গুমুক্ত ছিল। কিন্তু গত ২৪ দিনে এসব জেলায়ও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। এখন আর দেশের কোনো জেলা ডেঙ্গুমুক্ত নয়।
এই ২২ দিনে রোগী বেড়েছে সাড়ে ৪ গুণ, যা গত মাসের শেষ দিনের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত জেলার সংখ্যাও।
যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গতকাল দেশের চুয়াডাঙ্গাকে ডেঙ্গুমুক্ত দেখিয়েছে। কিন্তু জেলার সিভিল সার্জন অফিস ও আমাদের চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জেলায় চারজন রোগী ভর্তির তথ্য জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন জেলা সদর হাসপাতালে ও একজন জীবননগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এসব রোগী গত শনিবার রাতে ভর্তি হয়েছে। এর আগে পর্যন্ত এই জেলা ডেঙ্গুমুক্ত ছিল। এই তিনজন রোগী ঢাকা থেকে আক্রান্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে সিভিল সার্জন অফিস।
ডেঙ্গু আক্রান্ত ৬৪ জেলার মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি রোগী রয়েছে ঢাকা মহানগরসহ ঢাকা জেলায়, ২১ হাজার ৪০৮ জন। এই সংখ্যা দেশের মোট রোগীর ৬১ শতাংশ। অথচ গত মাসের শেষ দিনে এই ৬৪ জেলায় রোগী ছিল ৬ হাজার ১১৪ জন, যা সে সময়ের মোট রোগীর ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ গত ২২ দিনে তুলনামূলকভাবে ঢাকায় রোগী কমেছে ও ঢাকার বাইরে বেড়েছে।
বিশেষ করে সর্বশেষ গত রবিবারও ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে রোগীর সংখ্যা বেশি ছিল। সেদিন ঢাকায় রোগী ছিল ১ হাজার ৬৪ ও ঢাকার বাইরে রোগী ছিল ১ হাজার ২২৮ জন, যা একদিনে মোট ভর্তি রোগীর ৫৪ শতাংশ। এ নিয়ে এ বছর চার দিন ঢাকার বাইরে বেশি রোগী ভর্তির ঘটনা ঘটল। এর মধ্যে ২১ জুলাই ৮৯৬ জন রোগীর মধ্যে ঢাকার বাইরে ৪৯৩ ও ঢাকায় ৪০৩ জন, ২০ জুলাই ১ হাজার ৭৫৫ জনের মধ্যে ৯১০ ঢাকার বাইরে ও ঢাকায় ৮৪৫ জন এবং প্রথম ১৪ জুলাই ৪৪৯ জনের মধ্যে ২৬৫ ঢাকার বাইরে ও ঢাকায় ১৮৪ জন ভর্তি হয়।
ধীরে ধীরে ঢাকার বাইরে রোগী ছড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সিভিল সার্জনরা স্থানীয়ভাবে এডিস মশার বিস্তার ও ঢাকা থেকে মানুষের মাধ্যমে ভাইরাস বহন করাকে চিহ্নিত করেছেন। তারা বলেছেন, স্থানীয়ভাবে এডিস মশা পাওয়া গেলেও এডিস নিধনে স্থানীয় সরকার প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে রাজধানীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন বিভিন্ন জেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) ঢাকায় জনসংখ্যা বেশি। এখানকার জনসংখ্যা অনুপাতে ডেঙ্গু রোগী বেশি হচ্ছে। এ ছাড়া এখানে ঢাকার বাইরে থেকেও রোগী আসছে। এখানে এডিসের ঘনত্ব বেশি। এ পর্যন্ত যতগুলো জরিপ হয়েছে, তাতে দেখা গেছে ঢাকায় সর্বাধিক এডিস মশা ও লার্ভা বেশি পাওয়া গেছে।
ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ার কারণ হলো গ্রামও শহর হয়ে গেছে। অপরিচ্ছন্ন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ হয়েছে। যেখানে নোংরা ময়লা ও স্বচ্ছ পানি জমে থাকছে। আমরা পরিষ্কার করছি না। ভবনের ছাদে পানি জমে থাকছে। ঢাকা থেকে মানুষ বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। তারা রোগটির ভাইরাস বহন করছে। সেই সঙ্গে ভেক্টর এডিস মশাও স্থানান্তর হচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি রোগী ৩৫ হাজার ছাড়াল : ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে এ বছর হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ৩৫ হাজার ছাড়িয়েছে। নতুন করে নয়জনের মৃত্যু হওয়ায় মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৫ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ হাজার ২৯৩ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই সংখ্যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ ভর্তি রোগীর সংখ্যা। সবমিলিয়ে এবার ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৩৫ হাজার ২৭০ জনে। এর মধ্যে জুলাই মাসের ২৩ দিনেই ভর্তি হয়েছে ২৭ হাজার ২৯২ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে ৭ হাজার ৪৬৩ জন রোগী। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৪ হাজার ৩৯৫ এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩ হাজার ৬৮ জন।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চট্টগ্রামে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী ছিল চট্টগ্রামে ২ হাজার ২০৮ জন। তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ১ হাজার ৫৪৩ ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬৬৫ জন। এরপর বেশি রোগী রয়েছে ১ হাজার ৪৪৬ জন। তাদের মধ্যে বরিশাল জেলায় ৪৩২ ও বরিশালের শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ হাজার ১৪ জন। এরপর বেশি রোগী পটুয়াখালীতে ৬৫৯, ময়মনসিংহে ৪৯৩, লক্ষ্মীপুরে ৪৩৬, গাজীপুরে ৩৮৫ ও ভোলায় ৩৮১ জন। এ ছাড়া ৩০০-এর ঘরে রোগী রয়েছে মাদারীপুর, রাঙ্গামাটি, কুমিল্লা ও বরগুনায়। ২০০-এর ঘরে রোগী রয়েছে মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর ও খুলনায়।
ঢাকার বাইরে এডিস নিধনে সংকট, চিকিৎসাও সীমিত : চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. ইলিয়াস চৌধুরী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার ডেঙ্গু বেশি হবে সেটা আমরা দুই-তিন মাস আগে থেকেই বলে আসছি। কোনো মাস ডেঙ্গু ছাড়া ছিল না। আমাদের কীটতত্ত্ববিদরা জেলার নির্মাণাধীন সব জায়গায় এডিস মশার লার্ভা পেয়েছেন। গত বছর আইইডিসিআরের টিম এসে এখানে সার্ভে করেছে। তখনই তারা বলেছেন, এ বছর ঢাকার পর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি হবে। আমরাও আগে থেকে সতর্ক ছিলাম। থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ার কারণে এখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ও পানি জমছে। সেখানে এডিস মশা ডিম পাড়ে। ওখান থেকে লার্ভা উৎপন্ন হয়। এজন্য এখানে এডিস মশা বেশি ও ডেঙ্গুও বেশি।
আগের সতর্কতা অনুযায়ী ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে এই সিভিল সার্জন বলেন, এডিস মশা নিধনের যাদের দায়িত্ব, তারা সে ব্যবস্থা নেবেন। আমরা আমাদের হাসপাতাল আগে থেকেই সতর্ক করে রেখেছি। চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছি।
এই কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভেতর সিভিল সার্জনের কোনো হাসপাতাল নেই। সিভিল সার্জন শুধু সতর্কবার্তা দিতে পারে। তারপরও আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে কীটতত্ত্ববিদদের বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে সার্ভে করিয়েছি। সিটি করপোরেশনও সার্ভে করেছে। কিছু কিছু জায়গায় গত বছরের চেয়ে এবার আরও বেশি এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে। আমরা এ বিষয়গুলো সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। মেয়র মশা নিধনের জন্য চেষ্টা করছেন।
চট্টগ্রামে ঢাকার মতো এত বেশি লোকবল ও ব্যবস্থাপনা নেই বলে জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এই জেলায় মাত্র দুটি সরকারি হাসপাতালÑ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আন্দরকিল্লায় ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভরসা। সেখানে দুই-তিনজন করে রোগী ভর্তি আছে। আমরা প্রটোকল মেনে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
চট্টগ্রামের মানুষ ঢাকার মানুষের মতো এত হাসপাতালমুখী নন বলে জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, এখানে আর্থিক সংগতি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে বাসায় বসে চিকিৎসা নিতে চায়। অনেক সময় ডেঙ্গুর শক সিনড্রোম দেখা দিলে হাসপাতালে আসে। তখন বাঁচানো কষ্ট হয়ে যায়। আমরা সব রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সবাইকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমরা উঠোন বৈঠক করেছি। মাইকিং করছি। কিন্তু ডেঙ্গু মৌসুমের কারণে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কী হবে, সেটা বলতে পারছি না।
বরিশাল জেলার সিভিল সার্জন ডা. মারিয়া হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে ডেঙ্গু বাড়ার প্রধান কারণ গত কোরবানি ঈদের সময় ঢাকা থেকে যারা এসেছেন, তারা রোগটি বহন করে এনেছেন। এখানে সে সময় রোগী ছিল না। ঈদের পর হঠাৎ রোগী বেড়ে গেল। দেখা যাচ্ছে, রোগীদের অধিকাংশেরই ঢাকায় ভ্রমণের রেকর্ড আছে ও তাদের বাড়ির কেউ না কেউ ঢাকা থেকে এসেছেন। এটাই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ।
এখানে কী পরিমাণ এডিস মশা বা এডিসের লার্ভা আছে, সেটা সিটি করপোরেশনের সার্ভে করার কথা। এসব সার্ভে করার কোনো ইউনিট আমাদের নেই। তাই আমরা বলতে পারছি না এডিসের লার্ভা আছে কি না।
এই কর্মকর্তা বলেন, বরিশাল বিভাগের পক্ষ থেকে নাজিরপুরসহ তিনটি জায়গায় এডিস মশার সার্ভে করেছিল। সেই রিপোর্ট আমাদের কাছে নেই। এডিস মশা এখানে থাকতে পারে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিকে প্রথমে সচেতন হতে হবে। আমরা সমস্ত জায়গা পরিষ্কার করে উঠতে পারিনি। মশারি টাঙাতে হবে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।