রাস্তায় রক্তাক্ত সহকর্মী সীমানা নিয়ে ব্যস্ত পুলিশ

রাজধানীর ফার্মগেটে ভোররাতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশ কনস্টেবল মনিরুজ্জামান তালুকদার রাস্তায় পড়ে ছিলেন। তাকে তাৎক্ষণিক উদ্ধার না করে সীমানার ঠেলাঠেলিতে ব্যস্ত ছিল টহল পুলিশ।

পুলিশের তেজগাঁও থানার যে টহল দল (সিয়েরা-৬১) প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, এলাকাটি তাদের সীমানার বাইরে ছিল। ফলে তারা আহত মনিরুজ্জামানকে দ্রুত হাসপাতালে না নিয়ে খুঁজতে থাকে এলাকাটি কোন টহল দলের অধীনে। ‘সিয়েরা-৬১’-এর টিম লিডার ঘটনাস্থল থেকে কর্তব্যরত বিভিন্ন দলের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগের ওয়্যারলেস বেতার মারফত বারবার কল করতে থাকেন। এ ছাড়া কারওয়ান বাজার পুলিশ ফাঁড়ি ও থানায় দায়িত্ব তদারকি কর্মকর্তাকেও ফোন করেন। এতেই কেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ।

খবর পেয়ে যখন ওই এলাকার টহল টিম ‘স্পেশাল-৬১ কল সাইন’ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন আহত মনিরুজ্জামানকে আশপাশ থেকে ছুটে আসা কয়েকজন মিলে অটোরিকশায় তুলছিলেন। কিন্তু তিনি লম্বা হওয়ায় অটোরিকশায় আটানো যাচ্ছিল না। পরে পুলিশের টহল দলের গাড়িতে করেই নেওয়া হয় হাসপাতালে। এসব করতে করতে কেটে যায় প্রায় আধা ঘণ্টা, এরই মধ্যে মারা যান মনিরুজ্জামান। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এ ঘটনায় শাস্তির মুখে পড়তে যাচ্ছেন পুলিশের দুই সদস্য (এসআই ও পরিদর্শক)। অথচ পার পেয়ে যাচ্ছেন তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি), এডিসি, এসি, থানার ওসি ও প্রথম খবর পেয়েও তৎক্ষণিক হাসপাতালে না নেওয়া এসআইসহ দায়িত্বে থাকা অন্যরা।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট অন্যরা এ দায় এড়াতে পারেন কি না, জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্যরা দায় এড়াতে পারেন কি না, এটি পুলিশ কমিশনার মহোদয় দেখবেন। তিনি বিবেচনা করবেন।’

জানা গেছে, ঈদের ছুটি শেষে গ্রামের বাড়ি শেরপুরের শ্রীবরদী থানার কুরুয়া থেকে গত ১ জুলাই ভোরে ঢাকায় পৌঁছান ডিএমপির ট্রাফিক তেজগাঁও বিভাগের কনস্টেবল মনিরুজ্জামান। ভোর ৪টার পরপরই তিনি বাস থেকে নামেন ফার্মগেটের আল রাজি হাসপাতালের সামনে। সেখান থেকে মোহাম্মদপুরে বাসায় যাওয়ার জন্য রাস্তার উল্টো দিকে আনোয়ারা পার্কের দক্ষিণ পূর্ব কোণে গিয়ে দাঁড়ান। সেখানেই তিন ছিনতাইকারী তাকে ঘিরে ধরে সবকিছু ছিনিয়ে নিতে গেলে বাধা দেন মনিরুজ্জামান। তখন ছিনতাইকারীরা উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে তার মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ সময় পুলিশের পোশাকে ছিলেন না তিনি। মৃত্যুর পর পুলিশ জানতে পারে মনিরুজ্জামান পুলিশেরই সদস্য।

এ হত্যাকা-ে জড়িত থাকার অভিযোগে ছিনতাইকারী রাব্বি, লিটন ও কামরুলকে গ্রেপ্তার করেছে তেজগাঁও থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা-তেজগাঁও বিভাগ।

কী ঘটেছিল সেই ভোরে : প্রত্যক্ষদর্শী দিনমজুর হযরত আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি ধাম-িতে কাজ শেষ করে নাখালপাড়ার বাসায় ফেরার পথে ফার্মগেটে দেখতে পান এক লোক রাস্তার পাশে পড়ে আছে। ২০-২৫ জন তাকে ঘিরে রেখেছে, পুলিশও আছে সেখানে। কিন্তু কেউ আহত লোকটিকে হাসপাতালে নিচ্ছে না। পরে তিনিসহ কয়েকজন মিলে তাকে একটি অটোরিকশায় তোলেন, তখনো বেঁচে ছিল আহত ব্যক্তি। তখন পুলিশের একটি দল অটোরিকশা থেকে নামিয়ে ওই ব্যক্তিকে তাদের গাড়িতে তুলে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হয়। সঙ্গে হযরত আলীও যান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মনিরুজ্জামানের রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার তথ্য ভোররাত সোয়া ৪টার দিকে প্রথম পান ডিএমপির তেজগাঁও থানার রাত্রিকালীন টহল দল ‘সিয়েরা-৬১’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই লিটন কর। ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের সামনে এক রিকশাচালক তাকে জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় একজন আহত হয়ে রাস্তার পাশে পড়ে আছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে এসআই লিটন দেখেন এলাকাটি তার সীমানার বাইরে। তিনি আহতকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে খুঁজতে থাকেন ঘটনাস্থল কার এলাকায় পড়েছে। তেজগাঁও থানার কর্তব্যরত বিভিন্ন টহল দলকে ওয়্যারলেসে পরপর দুবার কলও দেন তিনি। ভোররাত ৪টা ২৩ মিনিটে তিনি মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান কারওয়ান বাজার পুলিশ ফাঁড়ি দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই অপূর্বকে।

এসআই অপূর্ব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাকে বলেছিল সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে একজন। আমি তাকে বলেছিলাম দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাও।’

কিন্তু হাসপাতালে না নিয়ে ৪টা ২৪ মিনিটে এসআই লিটন ‘স্পেশাল-৬১ কল সাইন’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই মাসুদুর রহমানকে ফোন করেন। এ সময় এসআই মাসুদের টহল গাড়ি সামরিক জাদুঘরের সামনে দিয়ে মণিপুরীপাড়া আবাসিক এলাকার দিকে চাচ্ছিল। ফোন পেয়ে ৪টা ২৯ মিনিটে এসআই মাসুদ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন পথচারীরা একটি অটোরিকশায় ধরাধরি করে তুলছেন আহত মনিরুজ্জামানকে। তখন তিনি অটোরিকশা থেকে নামিয়ে নিজের টহল গাড়িতে করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। তখন বাজে ৪টা ৪৫ মিনিট। এরই মধ্যে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান মনিরুজ্জামান।

জানতে চাইলে এসআই লিটন কর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পানি ভবনের সামনে থেকে আনন্দ সিনেমা হলের সামনে গেলে এক রিকশাচালক আমাকে জানায় সড়ক দুর্ঘটনায় একজন আহত হয়ে পড়ে আছে। আমি দ্রুত সেখানে গিয়ে দেখি লোকজন তাকে অটোরিকশায় তুলছে। এ সময় আমি মাসুদ স্যারকে ফোন দিয়ে জানাই। স্যার আসার পর অটোরিকশা থেকে নামিয়ে স্যারের গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘রক্ত দেখে আমার শরীর কাঁপছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করব। তখন সিনিয়র স্যারদের জানিয়েছিলাম।’

এ ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত করা পুলিশ সদস্যরা হলেন তেজগাঁও থানার এসআই মাসুদ এবং পরিদর্শক (তদন্ত) শাহ আলম। তেজগাঁও থানার ওসি অপূর্ব হাসান ছুটিতে থাকায় ঘটনার সময় ওসির দায়িত্বে ছিলেন শাহ আলম।

এসআই মাসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি খবর পাওয়ামাত্র দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়েছি।’

ঝুঁকিপূর্ণ হলেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়নি

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গত বছর ও চলতি বছরের মামলার পরিসংখ্যান বলছে, তেজগাঁও বিভাগ ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির শীর্ষে। এমন পরিস্থিতিতেও গত ঈদের সময় পুলিশের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা। এমনকি তেজগাঁও থানার ওসিসহ অনেকেই চলে যান ঈদের ছুটিতে।

নাম প্রকাশ না করে তেজগাঁও থানার এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, ঈদের সময় থানার ওসিসহ অনেকে ছুটিতে যাওয়ায় জনবল কম ছিল। এ ছাড়া বাড়তি নিরাপত্তার কোনো নির্দেশ বা ব্যবস্থা ছিল না।’

চুরি, ডাকতি ও ছিনতাইয়ের ঝুঁকির শীর্ষে থাকা তেজগাঁও বিভাগ নিয়ে করা একটি বিশেষ প্রতিবেদন ঈদের ছুটির শুরুর দিন গত ২৮ জুন দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরির সময় তেজগাঁও বিভাগের ডিসি আজিমুল হককে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, বিষয়টি তার জানা নেই, খোঁজ নিয়ে দেখবেন।

তেজগাঁও থানা সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি জানানো হয়। এরপরও ঈদুল আজহার ছুটিতে নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত কোনো ব্যবস্থা নেননি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।