সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ের চূড়ান্ত আন্দোলনের অংশ হিসেবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। এসব দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করছে। তারা মনে করছে, বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়। তাদের দাবির সঙ্গে না মিললে আরও কয়েকটি দল জাতীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলেছে। ফলে রাজনীতিতে এক ধরনের বিভাজন তৈরি হয়েছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, সরকার এবার বিদেশি চাপেও পর্যুদস্ত। ফলে তাদের আন্দোলন সফল হওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সরকার হটানোর লক্ষ্যে বিএনপি সমমনা দলগুলো ছাড়াও আলাদাভাবে সরকারবিরোধী অবস্থানে থাকা দলগুলোকে কাছে টেনে শক্তি বাড়াতে চায়। পাশাপাশি বিদেশিদের দেখাতে চায় সরকার ও তার মিত্র কিছু দল ছাড়া বাকিরা দলটির সঙ্গে আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহাসমাবেশ থেকে এক দফা দাবি মানতে আলটিমেটাম দেওয়া হবে। দাবি না মানলে সরকার পতন আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে। তবে যে কর্মসূচিই নেওয়া হোক না কেন তা আজ বুধবার সবার সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত করা হবে।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দফায় দফায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতায় জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। সরকার সমর্থক মুষ্টিমেয় কিছু সুবিধাবাদী ছাড়া খোদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও ভালো নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের যেসব সদস্য বাড়াবাড়ি করছেন তাদের পরিবার ভালো নেই। জনগণ চায় বিএনপি তাদের পক্ষ হয়ে রাজপথে শক্ত অবস্থান নিক।’
পদযাত্রা কর্মসূচি ও সর্বশেষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তারুণ্যের সমাবেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এটাই আমাদের আশা-ভরসার জায়গা। সাধারণ মানুষ যখন কোনো আন্দোলনে শামিল হয় তখন সে আন্দোলন ব্যর্থ হয় না। তার প্রমাণ ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৯০-এর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন।’
সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও দলটি গঠিত লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। তারা সরকার পতনে বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজপথে আন্দোলনে নামছে। জামায়াতের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ না থাকলেও তারা বলেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। সব রাজনৈতিক দল এখন এক ছাতার নিচে চলে এসেছে। এটাই আমাদের সফলতার পথ দেখাচ্ছে।’
গত বছরের জুলাই থেকে জেলা ও বিভাগীয় সমাবেশের মাধ্যমে আন্দোলন জোরদার করে বিএনপি। ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর সমাবেশ থেকে ১০ দফা দাবি ঘোষণা করে দলটি। এরপর ৩০ ডিসেম্বর থেকে দাবি আদায়ে একাধিক কর্মসূচি পালন করে। গত ১২ জুলাই থেকে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে সরকারবিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নামে। আগামীকাল দলগুলো রাজধানীতে পৃথকভাবে সমাবেশ করবে। সমাবেশ সফল করতে তারা দফায় দফায় প্রস্তুতি সভা করছে।
গতকাল মঙ্গলবার শাহজাহানপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বাসায় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নেতারা প্রস্তুতি সভা করেছেন। অঙ্গ সংগঠনগুলো সভা করছে। মহাসমাবেশের দিন জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, রাজধানীর রাজপথে ধারাবাহিক উপস্থিতির ওপরই জোর দিয়ে মাঠ দখলে রাখতে চান তারা। তবে সরকারের দিক থেকে আঘাত এলে প্রয়োজনে কঠোর কর্মসূচির দিকে যেতে বাধ্য হবেন তারা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারের আন্দোলন ব্যর্থ হলে স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি হিসেবে আমরা টিকে থাকতে পারব কি না সেটাই বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দেবে। দেশের জন্যই এ আন্দোলনে জয়ের বিকল্প আমরা দেখছি না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সারা দেশে অসংখ্য নেতাকর্মী, সমর্থক রয়েছে বিএনপির। তারা এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। যেটা আগে দেখা যায়নি। এই আন্দোলনে জনগণ সম্পৃক্ত হয়েছে। দেশের জনগণ যে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয় সে আন্দোলন ব্যর্থ হয় না। জনগণের সমর্থন থাকার পরও বিএনপি সফল না হলে রাজনৈতিকভাবে কঠিন সংকটে পড়বে। তাই নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই দলটি চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে মনে হয়।’
এর মধ্যেই ক্ষমতাসীদের জোট ও যুগপৎ আন্দোলনের বাইরে থাকা দলগুলোকে নিয়ে নিজেদের পাল্লা ভারী করতে চাইছে বিএনপি। যুগপৎ আন্দোলনে ৩৬ দলের নেতৃত্বে থাকা বিএনপির উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে তারা দেখাতে চায় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা দলগুলোর মধ্যে প্রায় সব দলই এই সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় না। ইতিমধ্যে সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ আন্দোলনে ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) ও বিএনপির মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। এনডিএমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- আগামীতে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের যে কর্মসূচি তাতে যোগ দেবে দলটি। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি।
একাধিক সূত্রের দাবি, ইতিমধ্যে ইসলামী আন্দোলন ও এবি পার্টির সঙ্গে বিএনপির একাধিক দায়িত্বপাপ্ত নেতার আলোচনা হয়েছে। যেহেতু দুটি দলই এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে আন্দোলনে রয়েছে, তাই তাদের যুগপৎ আন্দোলনে শামিল করা সহজ হবে। দল দুটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলীয় ফোরামে আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানাবে তারা।
জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল প্রায় সমস্বরে বলেছে, এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। জাতীয় পার্টি যারা পার্লামেন্টে আছে তারা পর্যন্ত পরিষ্কার করে বলেছে, এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের পীর সাহেব বলেছেন, এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও বলেছে। ৩৬টি দল যুগপৎভাবে ঘোষণা দিয়েছি, এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই। এই দাবিতে আন্দোলনে সঙ্গী হতে যারাই চাইবে সবাইকে নিয়ে মাঠে আমরা থাকব।’
এবি পার্টির সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের নীতিগত অবস্থান হচ্ছে স্বতন্ত্র আন্দোলনের পক্ষে। যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে শরিক হতে আমাদের কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। আমরা এখনো চিন্তা করিনি তাদের সঙ্গে যুগপৎভাবে চলার। আমরাও একদফার আন্দোলনে রয়েছি। পাশাপাশি আমাদের দুটি দফা আছে। আন্দোলন সংগ্রামে যেহেতু ঐক্য রয়েছে তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় দল হয়তো সিদ্ধান্ত নেবে।’
২০২১ সাল থেকে বিএনপি বর্তমান সরকারের অধীনে সব নির্বাচন বর্জন করে এলেও ইসলামী আন্দোলন ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে সংসদের উপনির্বাচনে অংশ নিয়েছে। গত জুনে অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর থেকে ইসলামী আন্দোলনের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত ১২ জুন অনুষ্ঠিত বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের মেয়র প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমের ওপর হামলার প্রতিবাদে ঢাকাসহ সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে দলটি। জুন মাসেই বিএনপিসহ বিভিন্ন দলকে আমন্ত্রণ জানিয়ে মতবিনিময়ও করেছে। গত শনিবার ঢাকায় সমাবেশ করে ইসলামী আন্দোলন বিএনপির আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। দলটি জাতীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে আসছে।