মাকে পুলিশের নির্যাতন কিশোরীর আত্মহত্যা!

রাজধানীর পল্লবীতে এক নারীর কাছ থেকে কথিত মাদক উদ্ধার অভিযানে গিয়ে টাকা দাবি ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে পল্লবী থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া পুলিশের চাহিদা অনুযায়ী ওই নারীকে ছাড়ানোর টাকা দিতে না পেরে তার কিশোরী মেয়ে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে বলে জানিয়েছে স্বজনরা। গত সোমবার রাত ১১টার দিকে পল্লবী থানার আদর্শনগর এলাকায় এ ঘটনার পর এলাকাবাসী অভিযানে যাওয়া পুলিশ সদস্যদের আটকে রেখে বিক্ষোভ শুরু করে।

খবর পেয়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্যদের ছাড়িয়ে নিয়ে যান। পরে রাত ২টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

তবে পুলিশের দাবি, সোমবার রাতের ওই অভিযানে মাদকসহ লাভলী আক্তার নামে এক নারীকে আটক করা হয়। এ সময় বাধা দেয় তার মেয়ে বৈশাখী আক্তার। পুলিশের হাত থেকে মাকে ছাড়িয়ে নিতে একপর্যায়ে বাসার ভেতর আত্মহত্যার অভিনয় করতে গিয়ে গলায় ফাঁস লেগে মৃত্যু হয় বৈশাখীর। আর এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশ বৈশাখীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে।

মারা যাওয়া বৈশাখীর মামা সুজন অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার বোন লাভলীর বিরুদ্ধে গাঁজা কারবারের অভিযোগ তুলে সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে আদর্শনগরের ১১ নম্বর রোডের ২১ নম্বরের বাসায় যায় পল্লবী থানা পুলিশের একটি দল। এ সময় পাঁচ পুলিশ সদস্য ও কয়েকজন সোর্স বাসায় ঢুকে লাভলীর কাছে গাঁজা আছে দাবি করে তাকে আটকের পর ছেড়ে দিতে ৫ লাখ টাকা চায়। টাকা দিতে না পারায় লাভলীকে তারা মারধর করে। এ সময় তার মেয়ে বৈশাখীকে একটি কক্ষে আটকে রাখে পুলিশ। মায়ের ওপর নির্যাতন দেখে বৈশাখী ক্ষুব্ধ হয়। মাকে না ছাড়লে সে আত্মহত্যা করবে বলে হুমকি দেয়। একপর্যায়ে গলায় দড়ি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। এ ঘটনার পর এলাকাবাসী পুলিশের পাঁচ সদস্য ও কয়েকজন সোর্সকে আটকে রেখে বিক্ষোভ মিছিল করে। খবর পেয়ে মধ্যরাতে থানা থেকে পুলিশের একটি বড় দল এসে এলাকার লোকজনকে লাঠিপেটা করে পাঁচ পুলিশ সদস্যকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) জসীম উদ্দিন মোল্লা বলেন, সোমবার রাতে পল্লবী থানার একটি টিম মাদক উদ্ধারে ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় লাভলী নামে এক নারীর কাছ থেকে ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে গ্রেপ্তার করে বাসা থেকে থানায় নিয়ে আসতে চাইছিল পুলিশ। তখন ওই নারীর মেয়ে বৈশাখী আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে পুলিশকে বাধা দেয়। একপর্যায়ে মেয়েটি আত্মহত্যা করে। পরে এলাকাবাসী ওই মেয়েটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। সেই ভিডিও ফুটেজ স্থানীয়দের কাছে আছে। এ ছাড়া লাভলীর কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের যে অভিযান সেই ফুটেজও আছে।

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে। মেয়েটির বাবা তার মেয়ের আত্মহত্যার বিষয়ে একটি ইউডি (অপমৃত্যু) মামলা করেছেন। তা ছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনেও একটি মামলা হয়েছে।

মাদক কেনাবেচার অভিযোগে বৈশাখীর বিরুদ্ধে চারটি এবং তার মা লাভলীর বিরুদ্ধে সাতটি মামলা রয়েছে বলেও পুলিশের দাবি।

তবে এলাকাবাসী বলছে, পল্লবী থানার পুলিশ সদস্যরা বৈশাখীর মা লাভলী আক্তারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করত। লাভলী একসময় মাদক কারবার করলেও এখন আর সেই পথে নেই। কিন্তু পুলিশ তাকে দিয়ে ফের মাদক কারবার করানোর চেষ্টা এবং আর্থিক সুবিধা নিচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার রাতের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ বাসাটিতে তাণ্ডব চালানোর একপর্যায়ে তিনতলার একটি কক্ষে বৈশাখীর ঝুলন্ত লাশ দেখতে পেয়ে স্বজনরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

এলাকাবাসী আরও বলেছে, লাভলীকে মারপিটের একপর্যায়ে বিবস্ত্র করে ফেলা হলে এলাকার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ওই বাড়ির নিচে হাজির হন। তারা পুলিশের এমন অভিযান নিয়ে প্রশ্নও তোলেন। নারী পুলিশ সদস্য না এনে এবং সাধারণ পোশাকে এসে একজন নারীকে এভাবে মারধরের কারণও জানতে চান তারা। এরই মধ্যে তিনতলার একটি কক্ষে বৈশাখীর লাশ ঝুলতে থাকার খবর জানাজানি হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছেÑ এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। লাভলীর স্বজনরা বৈশাখীর মৃত্যুর কৈফিয়ত চেয়ে অভিযানে যাওয়া এসআই জহির ও  ফেরদৌসসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। এ খবর পেয়ে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার জসীম উদ্দিন মোল্লা ঘটনাস্থলে আসেন। সে সময় বিপুলসংখ্যক পুলিশও আসে। বাড়িটির ভেতরে হইচই চলার মধ্যে বাইরে এলাকাবাসীর সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী পুলিশের গাড়িও ভাঙচুর করে।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে লাভলী আক্তারে মা রহিমা খাতুন বলেন, কয়েক বছর ধরে তাদের পরিবারের ওপর নানাভাবে নিপীড়ন চালাচ্ছে পুলিশ। গত তিন বছরে এসআই জহির, ফেরদৌসসহ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা কিছুদিন পর পরই তাদের বাড়িতে আসে। এসআই জহির গত শুক্রবারও এসে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। সোমবার  রাতে ফের পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। এসব নিয়ে তর্কবিতর্কের মধ্যে তার মেয়ে লাভলীকে মারতে মারতে বাড়ির নিচে নামিয়ে আনে। চারতলা বাড়ির ১২টি কক্ষের মধ্যে তার মেয়ের কক্ষসহ ভাড়াটিয়াদেরও কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতর থেকে টাকাপয়সা লুট করে নিয়ে যায়। এ ছাড়া লাভলীকে মারধর করে বিবস্ত্র করে ফেলে।

স্বজনরা বলছেন, লাভলী আক্তারের বাবার নাম মাইনুদ্দিন। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে লাভলী দ্বিতীয়। তার স্বামী ইসতিয়াক আহমেদ ডিটারজেন্ট তৈরি করে সেগুলো বাইরে বিক্রি করেন। লাভলী ও তার ছেলেমেয়েরা এ কাজে ইসতিয়াককে সহযোগিতা করেন। লাভলীর চার ভাই আলাদা ব্যবসা করেন। একজনের চায়ের দোকান, আরেকজন সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর কাজ করেন। এ ছাড়া আরেক ভাই আখের রস বিক্রি করেন, আর সবার ছোট ভাই ফুসকা বিক্রি করেন।

লাভলীর  ছোট বোন  পান্না বেগম অভিযোগ করে বলেন, গত শুক্রবার এসআই জহির তার বোন লাভলীর বাসায় আসে দুপুরের দিকে। তখন বাসায় মেহমান ছিল। হঠাৎ এসেই মেহমানদের ধরে নিয়ে যেতে চায়। এসআই জহির তখন টাকা দাবি করে। না দিলে মামলার ভয় দেখায়। এরপর সোনার কানের দুল বন্ধক রেখে ৩০ হাজার টাকা জোগাড় করেন লাভলী। এ ছাড়া বাসা ভাড়া ও জমানো ২০ হাজার টাকা মিলিয়ে ৫০ হাজার টাকা দিলে এসআই জহির চলে যায়। কিন্তু পরদিন আবার এসে ১০ হাজার টাকা নিয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, মারা যাওয়া বৈশাখী তার স্বামী মিন্টুর সঙ্গে বাউনিয়া এলাকায় থাকত। সোমবার সে বাউনিয়া থেকে মায়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিল। এসেই এমন ঝামেলার মধ্যে পড়ে।