সমঝোতা কিংবা লটারিতে ভাগ্য নির্ধারণ চার পরিচালকের

ব্যাংকগুলোতে পরিবারের প্রভাব কমাতে সংশোধন করা হয়েছে ব্যাংক কোম্পানি আইন। নতুন আইনে কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একটি পরিবারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ তিনজন পরিচালক হতে পারবেন। এর ফলে অন্তত চারটি পরিবারকে একজন করে পরিচালক বাদ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবারগুলোকে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে’ পরিচালক সংখ্যা তিনজনে নামিয়ে আনতে হবে। আর সমঝোতা না হলে লটারির মাধ্যমে একজনকে বাদ দিতে হবে।

সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৫(১০) ধারা স্মরণ করিয়ে দিয়ে গতকাল বুধবার এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এখন আর কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের পর্ষদে একই সময়ে এক পরিবারের তিনজনের বেশি সদস্য পরিচালক পদে থাকার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ একটি প্রজ্ঞাপন জারি ব্যাংকের ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

একসময় এক পরিবার থেকে দুজনের বেশি সদস্য একই সময়ে ব্যাংকের পরিচালক থাকতে পারত না। তবে ২০১৮ সালে আইন সংশোধন করে তা বাড়িয়ে চারজন করা হয়েছিল। গত জুন মাসে ব্যাংক-কোম্পানি আইনের সর্বশেষ সংশোধনে তা আবার কমিয়ে তিনজন করা হয়। নতুন সংশোধনী বাস্তবায়নে যেসব ব্যাংকে এক পরিবারের চারজন পরিচালক রয়েছেন, তাদের মধ্যে থেকে একজনকে পদত্যাগ করতে নির্দেশনা দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গত জুনে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন হলেও এখনো চারটি ব্যাংকে চার পরিবারের চারজন করে পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।

গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দেওয়া নির্দেশনায় বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৩ এ ধারা ১৫ এর উপধারা (১০) নিম্নরূপভাবে সংশোধন করা হয়েছে। আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন অথবা কোনো ব্যাংক কোম্পানির সংঘস্মারক বা সংঘবিধিতে যা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো একক পরিবার হতে তিনজনের অধিক সদস্য একই সময় কোনো ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত থাকবে না।

এ অবস্থায়, ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৩ এর ধারা ১৫ এর উপধারা (১০) এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কোনো ব্যাংক কোম্পানির কোনো পরিচালকের পদত্যাগ করা আবশ্যক হলে পরিচালকদের মধ্য থেকে কোনো পরিচালক ওই পদ ত্যাগ করতে হবে এবং তা পরিচালকদের পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। পারস্পরিক সমঝোতায় উপনীত হতে ব্যর্থ হলে তা পরিচালনা পর্যদের সভায় লটারি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে একক পরিবার হতে পরিচালক সংখ্যা তিনজনে নামিয়ে এনে বিষয়টি ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ, ডিভিশন-২-কে অবহিত করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হলো।

খাতবিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের কর্তৃত্ব কিছুটা হ্রাস পাবে। এক পরিবার থেকে তিনজনের বেশি ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন না এ উদ্যোগ ব্যাংকের জন্য ভালো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা জারি করেছে। এখন যেসব ব্যাংকে তিনের অধিক পরিচালক রয়েছে তাদের মধ্যে একজনকে পদত্যাগ করতে হবে। সমঝোতা না হলে লটারির মাধ্যমে একজন বাদ পড়বেন। কী প্রক্রিয়ায় একজনকে বাদ দেওয়া হবে, তা ব্যাংক নির্ধারণ করবে।’

বর্তমানে কয়টি ব্যাংকে তিনের অধিক পরিচালক রয়েছে তা জানতে চাইলে মেজবাউল হক মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, ‘নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলোর কাছে জানতে চাইবে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদি কোনো ব্যাংক নির্দেশনা অমান্য করে তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এদিকে বিদ্যমান আইন ব্যাংক পরিচালকদের মেয়াদ ৯ বছর থেকে বাড়িয়ে ১২ বছর করা হয়েছে। এতে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যাংক ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, একই ব্যক্তি টানা ১২ বছর পরিচালক থাকলে ওই ব্যাংকে পারিবারিক প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। এতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিষদের ওপর চাপ তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে বেনামি ঋণ ও খেলাপি ঋণ বেড়ে যেতে পারে। তবে সংশোধিত অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে কিছু ভালো দিকও রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

বিদ্যমান আইনে কোনো ব্যাংক পরিচালক একই সময়ে অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক থাকতে পারবেন না। তবে এ আইন কার্যকর হওয়ার পর সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে বীমা কোম্পানির পরিচালক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সংশোধনী খসড়ায় কোনো ব্যাংক পরিচালকের একই সঙ্গে বীমা কোম্পানির পরিচালক পদে থাকার সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো পরিচালক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানির পরিচালক হতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে বিদ্যমান আইনে কিছু বলা নেই। কিন্তু নতুন আইনে কোনো ব্যক্তি ব্যাংকের পরিচালক হলে একই সময়ে তিনি অন্য কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি বা এসব কোম্পানির কোনো সাবসিডিয়ারি কোম্পানির পরিচালক থাকতে পারবেন না।