বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীর প্রতি ১০ জনে ১ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন বায়ু দূষণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণে। বায়ুদূষণের কারণে সারা বিশ্বে মোট জিডিপির প্রায় ৩.৫০% ব্যয় হয়, পরিমাণে যা ৩ ট্রিলিয়ন ডলার প্রায়। ধারণা করা হচ্ছে, বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যু ধূমপানে মৃত্যুর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। এছাড়া সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউএয়ার’ এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বায়ু দূষণে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কথা চিন্তা করলে প্রথমে ঢাকার কথা মাথায় আসে। কিন্তু আমাদের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের ফলে দেশের সর্বত্রই বেড়ে চলছে বায়ুদূষণের সমস্যা।
সম্প্রতি ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভারমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একদল গবেষক দিনাজপুর শহরে একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তারা সেখানের বায়ুতে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ 'পার্টিকুলেট ম্যাটার' এর উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। পার্টিকুলেট ম্যাটার হলো বাতাসে ভাসমান অবস্থায় থাকা কঠিন বা তরল পদার্থের (যেমন: রোড ডাস্ট, ফ্লাই ডাস্ট, স্মগ প্রভৃতির) মাইক্রোস্কোপিক কণা। এসব পার্টিকুলেট ম্যাটার শুধুমাত্র প্রাকৃতিক কারণেই সৃষ্টি হয় না। মানব সৃষ্ট কিছু কার্যক্রম এর জন্য দায়ী। যেমন: জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, ইটভাটা ও কলকারখানা ধোঁয়া, গৃহস্থালীর বিভিন্ন কার্যক্রম ও বিল্ডিং কন্সট্রাকশনের ফলে সৃষ্ট ক্ষুদ্র ধাতব কণা প্রভৃতি।
পার্টিকুলেট ম্যাটারের পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য ৬ চ্যানেল বিশিষ্ট এয়ার পার্টিকুলেট কাউন্টার (০.৩-১০ মাইক্রো-মিটার) ব্যবহার করেন তারা। গবেষকেরা জানান, দিনাজপুর শহরের ২৬টি স্থানের সংগ্রহকৃত নমুনা পর্যালোচনা করে প্রায় সবগুলো স্থানেই আশঙ্কাজনকভাবে পার্টিকুলেট ম্যাটারের মাত্রাতিক্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। যার ফলে বেড়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। বিশেষ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্কের রোগের আশঙ্কা। এই বস্তুকণাগুলো এতই ক্ষুদ্র যে তা মানুষের শ্বাসনালিতে ডিফিউসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রক্তে পৌঁছে গিয়ে হার্টের ব্লক, মস্তিষ্কে স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক এস. বিপুলেন্দু বসাক জানান, দিনাজপুর আমার জন্মস্থান হওয়ায় সেখানের বায়ুদূষণ পরিস্থিতি নিয়ে আমি চিন্তিত ছিলাম, যার ফলে গবেষণা প্রকল্পটি আমি সেখানে পরিচালিত করি। আমরা যে স্থানসমুহের নমুনা সংগ্রহ করেছি তার প্রতিটি নমুনার ফলাফলই অস্বাস্থ্যকর থেকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে পড়েছে। অটো রাইস মিল হতে নির্গত ধোঁয়া, যত-তত্র বিল্ডিং নির্মাণ করা, শ্যালো মেশিন চালিত যানবাহন ও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহৃত পরিবহন ব্যাবস্থা থেকে নির্গত ধোঁয়া প্রভৃতি এই দূষণের অন্যতম কারণ। এই শহরের প্রতিটি মানুষ বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, "জলবায়ুর পরিবর্তনও এর অন্যতম একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। যেটিও আমাদের গবেষণার প্রমাণিত হয়েছে। শুধুমাত্র আর্থিক লাভের কথা চিন্তা করে যত্র তত্র যে অটো রাইস মিলগুলো ব্যাবসা পরিচালনা করছে, এখনই সেটির লাগাম ধরতে না পারলে দূষণরোধ পরবর্তীতে কঠিন হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য দিনাজপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
‘অসুস্থ শহরকে সুস্থ করে তুলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য শহরে পরিণত করতে পারি’ এই লক্ষ্যেই গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানান গবেষক দল ও তাদের প্রধান বিপুলেন্দু বসাক।