রাজনীতিতে চিকনবুদ্ধির ব্যারিকেড

খুচরা আলাপে চিকনবুদ্ধির জয়জয়কার। ফলে খুচরা আড্ডায়, গসিপে এই ধরনের মানুষের কদর আছে। অনেকক্ষেত্রে বাকপটুতা তাদের বেশ বুঝদার অর্থে জ্ঞানী হিসেবেও ভাবায় সাধারণকে। কিন্তু ঝামেলা হচ্ছে সিরিয়াস আলাপে এই ধরনের চিকনবুদ্ধি বিপজ্জনক। কারণ তাদের লক্ষ্য থাকে তর্কে জেতা, অনেকটা রাজনীতির ভেতর পলিটিকস ঢুকিয়ে মাঠজয় করা।

একটা পুরনো গল্প দিয়ে আরেকটু বলা যাক। চিকনবুদ্ধির বাঙালি গফুর মিয়া দুধ বিক্রি করেন। তো তিনি তার সামান্য চিকনবুদ্ধি খরচ করে ১০ লিটার দুধে ৫ লিটার পানি মিশিয়ে ১৫ লিটার করলেন। নগদ লাভের টাকা নিয়ে তিনি গেলেন চাল কিনতে। দোকানির কি চিকনবুদ্ধি নেই? তিনি আগে থেকেই কাঁকর মেশানো চাল ধরিয়ে দিয়ে ওজনে আধা কেজির লাভ পকেটে পুরলেন। এদিকে মাছ বিক্রেতার তো দুধ, চাল কিনতে হয়। তাই তার তো চিকনবুদ্ধি কম থাকলে চলবে না, তিনি দ্বিগুণ দামে ফরমালিন মেশানো পচা মাছ ধরিয়ে দিয়ে লাভ বুঝে নিলেন। তো এই গল্পে যে উইন উইন সিচুয়েশন, চিকনবুদ্ধির চক্র এমনটা রাজনীতিতেও দেখছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই উইন উইন সিচুয়েশনে খুচরা বিক্রেতাদের চিকনবুদ্ধিতে বাজারে যে ভেজাল ছড়িয়ে দিচ্ছে তাতে আখেরে সবারই হার। রাজনীতিতেও তাই।

ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দলের চিকনবুদ্ধি ও তার মোকাবিলার বলি হচ্ছেন পাবলিক। আরও স্পষ্ট করে বললে চিকনবুদ্ধির পলিটিকস করতে গিয়ে মানুষের দুর্ভোগকেই বাড়িয়ে তোলা এখানকার স্বাভাবিক চর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে জনদুর্ভোগের প্রশ্ন বরাবরই উপেক্ষিত, মুখের কথা হিসেবে আমরা দেখে আসছি। অবশ্য বিরোধী দলকে মোকাবিলায় প্রথমত ক্ষমতাসীন দলকে চিকনবুদ্ধির বান মারতে দেখি আমরা। আর বিরোধীরা সেই ফাঁদে পড়ে অথবা টিকে থাকার জন্য চিকনবুদ্ধির চক্রে নামেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, পাবলিকের অধিকারের কথা বলে বিরোধীরা আন্দোলনে নামেন আর যে পাবলিকের অসুবিধার কথা তুলে তাদের পথরোধ করার চেষ্টা করে ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশ; চিকনবুদ্ধির ফেরে পড়ে সেই পাবলিকের কথা তখন আর বিবেচনাতেই থাকে না কারও। গায়ের জোর, গোঁয়ার্তুমি প্রধান হয়ে ওঠে। আর চিড়ে চ্যাপ্টা পাবলিক তাদের এসব চিকনবুদ্ধির দৌরাত্ম্য বুঝলেও, দুর্ভোগ পোহানো ছাড়া কিছুই করতে পারে না। যেমন ননসেন্স যুক্তি দিয়ে চায়ের দোকানে জিতে যাওয়া চিকনবুদ্ধির প্রতিভায় বাকহারা হয়ে থাকে বাকি অডিয়েন্স, অনেকটা তেমনই।

মজা হচ্ছে, বাকহারা হয়ে পড়া ওই অডিয়েন্স কিন্তু তর্কে জিতে যাওয়া চিকনবুদ্ধির যুক্তি যে ননসেন্স, সেটা বুঝেও কিছু বলে না বা বলতে পারে না। রাজনীতিতেও তেমনি। ধরেন এর আগে, বিরোধীদের কর্মসূচি সামনে রেখে বাস ধর্মঘটের কথা। ঠিক যে যে জেলায়, যে যে বিভাগে, যেদিন যেদিন বিরোধীদের সমাবেশ ঠিক সেই সেই জেলায়, সেই সেই বিভাগে, সেই সেই দিনে পরিবহন ধর্মঘট থাকার চিকনবুদ্ধি কি পাবলিক বুঝতে পারে না? কিন্তু কী করার আছে, পাবলিকের? এই বিচিত্র পরিবহন ধর্মঘটের ভোগান্তিকে হজম করে যাওয়া পাবলিক এমন প্রশ্নও তুলছে না যে, যেসব দাবিতে ওই ধর্মঘটগুলো ডাকা হয়েছিল তার কী মীমাংসা হলো?

রাজনীতিতে পলিটিকসের নামে এই চিকনবুদ্ধির খেলা না হয় গণতন্ত্রের নামে করতে দেওয়া লাগল। যেমন একই দিনে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি। এর ফলে দুই দলের সমান কভারেজ করতে গিয়ে তাদের বক্তব্য, দাবি-দাওয়ার চাইতে ‘পাল্টাপাল্টির’ দ্বৈরথটাই প্রধান খবর হয়ে যায়। আর পাবলিক তাদের এই চিকনবুদ্ধির নিকুচি করতে করতে যানজটের শহরে কর্মদিবস মোকাবিলা করে অফিস করে, বাড়ি ফেরে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক গীতিআরা নাসরিনের ফেসবুক পোস্ট উদ্ধৃত করা যায়। তিনি সেখানে বলেছেন, ‘‘রাজনৈতিক দলগুলো পাবলিক পরিসরে তাদের কর্মসূচির জুলাই-ডিসেম্বর ষান্মাসের একটা দিনপঞ্জি দিয়ে দিলে পাবলিকের প্রভ‚ত সুবিধা হতো। কেউ কেউ ক্যালেন্ডারে তারকা চিহ্ন (*) দিয়ে ‘চাঁদ দেখা সাপেক্ষে’ লেখার মতো, ‘অন্য দলের কর্মসূচি দেওয়া সাপেক্ষে’ এই তথ্যটিও যুক্ত করতে পারেন।’ ’

এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির পেছনে অপরপক্ষের বক্তব্য যেমন মনোযোগ পায় না, তেমনি যে পক্ষের আসলে বলার মতো কথা নেই তারা কেবল বিরোধিতার খবরেই শিরোনামে থাকতে পারে। এতে কি তাদের যে আসলে কোনো কথা নেই, সেটাকে আড়াল করা যায়?

কিন্তু প্রশ্ন হলো পুলিশ প্রশাসন কি এই চিকনবুদ্ধির খেলায় নামতে পারে? আমরা দেখে আসছিলাম সরকারি দলের সভা-সমাবেশে অনুমতি, শর্ত, জনদুর্ভোগের কথা না তুলেই যথাস্থানে হয়ে যেতে। হয়তো তারাও অনুমতি নেন, কিন্তু সেখানে অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে কোনো টানাপড়েন হয় না। পুলিশ কোনো শর্ত আরোপ করে তাদের অনুমতি দেয় কি না জানা যায় না। কিন্তু বিরোধীদের বেলায় এ সবকিছুই আলোচনায় আসে। জনদুর্ভোগ আর নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে, শর্ত, ধরপাকড়, মামলা তল্লাশিসহ নানা তৎপরতায় বিরোধীদের সভা-সমাবেশে এক ধরনের চিকনবুদ্ধির ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দিচ্ছিল পুলিশ।

সর্বশেষ সমাবেশ নিয়েও বিএনপিকে পুলিশের এই চিকনবুদ্ধিকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পাল্টা সমাবেশ তো আছেই। পুলিশ যথারীতি বলল, ‘গণদুর্ভোগের কারণে বিএনপিকে নয়াপল্টনে কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করতে অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে তারা চাইলে রাজধানীর গোলাপবাগে সমাবেশ করতে পারে।’ পুলিশ বিএনপিকে বৃহস্পতিবার সমাবেশ করলে গোলাপবাগে আর শুক্রবার করলে নয়াপল্টনে করার প্রস্তাব দেয়। আন্দোলন, সংগ্রামের নিজস্ব গতিই অবশ্য দিন, ক্ষণ আর জমায়েতের স্থান তৈরি করে নেয়। বিএনপির আন্দোলনে সেই গতি এখনো আসেনি। আইন ভেঙে, পুলিশি বাধা ডিঙিয়ে মহাসমাবেশ করতে পারবে না বিএনপি। ক‚টনীতিকদের কাছেও বিএনপির আন্দোলনের অহিংস ভাষা বদলে গেলে বিপদ। বিদেশিরা চান বিএনপি অহিংস ও নিয়মতান্ত্রিক পথে চলুক। কিন্তু এই চিকনবুদ্ধিও ব্যারিকেড সরাতে বিএনপি বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। তারা জনদুর্ভোগকে অ্যাড্রেস করে পুলিশের শর্ত মেনে সমাবেশ একদিন পিছিয়েছে। নিজেদের পছন্দের জায়গা নয়াপল্টনেই তারা সমাবেশ করবে।

বিএনপি তাদের মহাসমাবেশ এক দিন পিছিয়েছে- বুধবার রাতে এই খবর প্রচারিত হওয়ার পরপরই শোনা যায়, আওয়ামী লীগও তাদের তিনটি সংগঠনের সমাবেশ পিছিয়েছে। এখানে বিএনপি নানাবিধ চিকনবুদ্ধি প্রতিহত করতে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছে। তাছাড়া পুলিশের বহুল কথিত জনদুর্ভোগকে অ্যাড্রেস করেই বিএনপি যে তাদের কর্মসূচি পেছাতে রাজি হয়েছে গোঁয়ার্তুমি না করে- এটা শুভ লক্ষণ। চিকনবুদ্ধির পলিটিকস করতে করতে এইবার জনদুর্ভোগ জিতেছে। এই জয় জারি থাকুক। যারা একে বিরোধীদের দমনের চিকনবুদ্ধি হিসেবে নেবে, তারা জনগণের কাছে ধরা খাবে। কারণ পাবলিক সব বোঝে। অন্যদিকে যারা একে গায়ের জোর দিয়ে না দেখে পজিটিভলি রেসপন্স করবে তারা এগিয়ে থাকবে। কারণ, অপরপক্ষকে সেটাই অনুসরণ করতে হবে।

গত ছয় মাসের রাজনৈতিক সহিংসতায় ২০ জনের মতো মানুষ নিহত হয়েছে। নিহতদের বড় অংশই বিএনপির লোক। অগুনতি মামলায় অসংখ্য নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। তারপরও ঘেরাও, হরতাল বা অবরোধের মতো কর্মসূচিতে যায়নি দলটি। তারা বারবার নিজেদের সরকারবিরোধী আন্দোলনকে অহিংস বলে আসছে। মানুষও তা বিশ্বাস করা শুরু করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জ্বালাও-পোড়াওয়ের যে চর্চা ছিল, সেখান থেকে বের হয়ে আসার ইঙ্গিত স্পষ্ট। রাজনীতির এই পরিবর্তনে বিরোধীরা তাদের ভ‚মিকা রাখছে। এখন ক্ষমতাসীন দল এই চর্চাকে এগিয়ে নেবে নাকি চিকনবুদ্ধি দিয়ে, উসকানি দিয়ে তাদের রাজপথের পুরনো সহিংসতার পথে টেনে নামাবে- সেটাই দেখার বিষয়। আওয়ামী লীগকে কেবল বিএনপির কর্মসূচির মোকাবিলায় পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে গেলে চলবে না। তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য, কর্মসূচি নিয়ে সামনে আসতে হবে। তা না হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তবে, পুলিশকে জনদুর্ভোগ, জনভোগান্তি, জননিরাপত্তার প্রশ্নে আমারা বিরোধীদের দমনে ক্ষমতাসীনদের চিকনবুদ্ধির সহযাত্রী হিসেবে দেখতে চাই না। আশা করব জনদুর্ভোগ, জনভোগান্তি, জননিরাপত্তার প্রশ্নে সঠিক অবস্থান নিক।

জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। আগামী দিনগুলোতে রাজনীতি আরও বেশি মাত্রায় মাঠে থাকবে। কিন্তু আমরা অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতার দিনগুলোতে ফিরতে চাই না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মসূচি পালনে ও বিপক্ষকে মোকাবিলায় সহিংসতা ও তাতে উসকানির চিকনবুদ্ধি থেকে দূরে থাকবে। এটাও সত্যি যে আন্দোলন-সংগ্রামের চরিত্র আগে থেকে ঠিক করে দেওয়া যায় না। কিন্তু সহিংসতা এড়ানোর প্রজ্ঞা ও সৃষ্টিশীলতা রাজনৈতিক দলগুলোকে দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা রাখতে হবে। না হলে পুলিশের মুখে জনদুর্ভোগ, জনভোগান্তি, জননিরাপত্তা শব্দগুলো হাস্যকর হয়ে উঠবে। আর পাবলিক গান গাইবে-‘সবেতে আছি সব নজরে পড়ে, কে খায় খেয়ে কে ন্যাজ নাড়ে।’

লেখক: কবি ও সাংবাদিক।

jubarysayeed@gmail. com