বৈরিতা ও বিপর্যয়

গেল তিন সপ্তাহ ইউরোপ ভ্রমণে আছি। দেশে ডেঙ্গুর ডিগবাজি, বড় বড় দলের সমাবেশ এবং প্রকৃতির পিচ্চি ঘূর্ণিঝড়ের আনাগোনোর খবরাখবর পাচ্ছি। ডেনমার্কের রাজনৈতিক আকাশ না হলেও প্রাকৃতিক আকাশকে বাংলার থেকে ভিন্নতর মনে হলো না। সারা দিন সঞ্চরণশীল মেঘের আনাগোনা। মেঘদূতের মেঘেরা যেমন ক্ষণে ক্ষণে মত পাল্টিয়ে দূরদেশে চলাচল করে প্রেয়সীর বার্তা পৌঁছাতে চায়, এখানে মনোমুগ্ধকর মেঘমালার মধ্যে তার কোনো ব্যতিক্রম দেখিনে। ঘন মেঘ যখন সূর্যের আলো ঢাকে তখন ঠান্ডা বাতাস দেয় এবং বারি বর্ষণে উৎসাহ জোগায়। এ রকম কতবার যে তার কান্নাকাটি শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। এই কিছুক্ষণ আগে মেঘেদের আন্তঃকলহ শুনলুম। আমার দেশে বিরোধী দল আর সরকারি দল যেমন ঝগড়াঝাটিতে লিপ্ত, সেখানে মেঘ ডাকলে তারা বজ্রপাত ঘটানোর মতো সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়ে, এখানে এমন মনে হলো না। হতে পারে এরাও ভিসা না পাওয়ার ভয়ে ভদ্র হতে চলেছে। বাইরে বাতাস বৃষ্টি ও মেঘের গর্জন তবে ১৫৪ ধারায় আটকানোর মতো কোনো মতলবে তারা নেই।

ডেনমার্কে এখন জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ, বাংলাদেশে আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণ এসেছে। বাংলাদেশেও অবিরাম বর্ষা আর কুমারী নদীর বুক প্রণয়ের জোয়ারে কেঁপে ওঠার পালা, ডেঙ্গু আর সড়কে প্রাণপাতের খবরে তা তলিয়ে যাচ্ছে। বাংলার খাল-বিল-নদী এমনিতে নাব্যে সতিত্ব হারা। ফলে অল্প বিস্তর বৃষ্টিতে তারা ভরে ওঠে কানায় কানায়। বিপদসীমা পেরিয়ে আশপাশে বন্যার কারণ ঘটায়। আজ থেকে শতবর্ষের আগে রবীন্দ্রনাথ কেমনতর শ্রাবণের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন? এ সময় তিনি যখন পদ্মায় বোটে তখন দেখতেন আকাশ কালো করে মেঘেরা বারি বর্ষণের আয়োজনে মেতেছে। পদ্মার পয়মন্ত ইলিশের ঝোলের তরকারি খেয়ে তার ঘুমে যাওয়ার পালা। তখন আমি এই ডেনমার্কে নতুন মেঘের বারতা পাচ্ছি। মোবাইল ফোনে ঘণ্টায় ঘণ্টায় পাল্টাচ্ছে বৃষ্টির পূর্বাভাস, বৃষ্টি আসে যায় এই রোদ এই ছায়া। শ্রাবণ মেঘের মেলায় রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলায় যেমন মেতেছিলেন শতবর্ষের  আগের সেই কবি।

সত্যজিৎ রায় তার অশনি সংকেত ছবির টাইটেল সং-এ মেঘের গর্জন, ধানের খেতে উদ্বেলিত বাতাসের চিত্রকল্প এঁকে দেখাতে চেয়েছিলেন অশনি সংকেত, বাংলার কৃষি খাত, দুর্ভিক্ষের আকালের হাতছানি। এখনো তেমনি মনে করার কারণ যদিও মহা মন্দাভাব লেগে আছে অধিকাংশ অর্থনীতিতে, তারপরও আপাতত এই ইউরোপে দেখছি তাদের অসুবিধা হচ্ছে না। দেশে দেশে ভূ-রাজনীতিতে কোন্দল বাড়ছে। আধিপত্য বিস্তারের জন্য দেশে দেশে সভ্য-অসভ্যদের খুনসুটি খেলা চলছে।

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনের যে এলাকায় আমি অছি সেখানে গেল কয়েকদিন  কিছু সামুদ্রিক পাখি কখনো করুণ স্বরে কখনো চপল হরিণির মতো আচরণে, শব্দে আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে চলছে। বোঝা যায় আশপাশে কিংবা কাছে সমুদ্র আছে। সেখান থেকে দলছুট হয়ে তারা মরখোাঁ এলাকার এই আবাসিক এলাকায় বেড়াতে এসেছে। এমনও তো হতেই পারে তারা আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, সহমর্মিতা প্রকাশ করতে এসেছে। এসব পাখির সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েও হচ্ছে না। রবীন্দ্রনাথ টোকিও বে’র বাসায় জানালা দিয়ে যেমন দেখতেন পলাতকা একটি পাখিকে, তাকে নিয়ে লেখা তার কবিতা ‘পুরবী’ কাব্যগ্রন্থে ঠাঁই পেয়েছে।

এখানকার পাখিরা আমাকে যেন অনেকটা নিজের মনে করে দেখা করতে এসেছে। এমনো তো হতে পারে সুন্দরবনের বাবাহকু (বাঘ, বানর, হরিণ, কৃমির) পরিষদ থেকে তারা কোনো বিশেষ বার্তা পেয়েছে। আমি যে এখানে আছি এটা তারা মনে হয় জেনে গেছে, তারা তাবৎ বিশে^র পাখি সম্প্রদায়ের পক্ষে কোনো বিশেষ বার্তা বা আর্জি আমাকে জানাতে চায়। আজকাল ঘরের কথা পরকে না জানিয়ে, সবাইকে একসঙ্গে না নিয়ে নাকি কোনো খেলা জমে না।

কয়েক বছর আগে মার্কিন নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প তো বলেই দিলেন প্যারিসের ঘোষণা তারা মানবেন না। কিয়েটো কনভেনশনর? এসব আবার কী? আমি বা আমরা যা করব এবং বলব সেটাই সবাই শুনবে এই হচ্ছে তাদের বদ্ধমূল ধারণা। কিন্তু এখন কী দেখি? ট্রাম্প বাইডেন সাহেবদের দেশও তো প্রায়শ অকাল বন্যায়, অকাল বাতাস, খরা ও প্রাকৃতিক নানান অনাচারে ভুগছে। নিজের দেশের দিকে সে সব ব্যাপারে করণীয় কিছু ভাবার চাইতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে কত বড় বড় বাণী বা স্যাংশন দিতে তারা কসুর করছে না। তারা কি মনে করেন যে প্রকৃতি তাদেরও ছেড়ে কথা বলবে?

প্রকৃতি তার বিচারে কোনো পক্ষপাতিত্ব করে না। সেখানে বশংবদ রাজা বা কিংবা কানা কোনো বিচারক নেই। তারা নিরপেক্ষ, প্রকৃতি কারও একক সিদ্ধান্তে ‘নির্বাচিত’ নয়, ‘নিয়োগপ্রাপ্ত’ও নয়। প্রকৃতিকে প্রতিশোধ নিতে উদ্দীপ্ত করার মতো অমার্জনীয় অপরাধ আর নেই।

এই ডেনমাকের্, নরওয়েতে দেখলুম ঘন সবুজ বনানী। এখানে কার্বন নিঃসরণের হার যথেষ্ট কম আর অক্সিজেন তো কানায় কানায় ভরা। এখানে উইন্ডমিল মাঠে ময়দানে, এমনকি সমুদ্রেও বিনা জীবাশ্ম ও ফসিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন উদার, খালি মাঠে সোলার প্যানেলের সমারোহ। রিনিউইবল এনার্জি ব্যবহারে দক্ষ ও পারঙ্গম এসব দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশের তালিম নেওয়ার সময় এখনো আছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ডেনমার্ক থেকে উইন্ড মিল বিনিয়োগের খবর পাচ্ছি। শুনে ভালো লাগল। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে, নদী বেষ্টনীতে উইন্ড মিল কার্যকর করণের সুযোগ বেশ। আমাদের এখন উচিত প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়, প্রকৃতির কাছ থেকেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ চাওয়ার পথে হাঁটা। আমাদের বিদ্যুতের প্রয়োজন তবে সেই প্রয়োজন মেটাতে নয় ছয় পদ্ধতিতে যাওয়াটা আদৌ সমীচীন নয়। কেননা তাতে সমস্যারা সমস্যা সৃষ্টিতে উৎসাহী হবে।

আমাদের তিন প্রধান খাত জ্বালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। দেখতে হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আয় বাড়ানোর পথে তস্কররা যেন লাভের গুড় পিঁপড়ে দিয়ে খাওয়ানোর পথে আমাদের না নিয়ে যায়। বেপথে যাওয়ার কারণ সৃষ্টি করে আরও বেপথমুখী করার এন্তেজামের মতো আত্মঘাতী প্রবণতা আর থাকতে পারে না। আমাদের উন্নয়ন দরকার, কিন্তু সেই উন্নয়নের নাম করে আমাদের যেন প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতায় না জড়াতে হয়। আমাদের যা আছে তাই নিয়ে আমাদের চলতে হবে। আমাদের প্রকৃতির কাছে ফিরতে হবে। পরমুখাপেক্ষী উন্নয়ন অভিসারে প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদের আরাধ্য হতে পারে না। 

পাঁচটি সিগাল পাখির এক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আমার কিছুক্ষণ আগে আলাপ হলো। তারা আমাকে জানাল আমরা আমাদের এখন এ এলাকার, সে এলাকার এভাবে দেখতে চাচ্ছি না। আপনাদের সুন্দরবনের পক্ষীকুলের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। সেখানকার আবাসস্থলে কীভাবে অত্যাচার, অনাচার, অবিচার চলছে তার একটা বেতার প্রতিবেদন আমাদের কাছে এসেছে গত পরশু দিন। প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্বে আপনারা জড়িয়েই আছেন। কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে বিশে্বর সেরা ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট উজাড় ও আনব্রোকেন সমুদ্রসৈকত প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার সব আয়োজনে উৎফুল্ল বোধ করে, ন্যায়নীতি-নির্ভরতার দুয়ারে তালা লাগিলে, গণসেবা পেতে উঠতে বসতে দুর্নীতির দুরাচারে প্রকৃতি বড়ই রুক্ষ।

পাখিদের প্রতিনিধিদল এটাও শোনাল আমায় ‘আপনাদের ঢাকা শহরের সিসার উপস্থিতি বাড়ছে তো বাড়ছে, ঢাকা শহরে পক্ষীকুলের সমিতি সেটা সুন্দরবনের হেড কোয়ার্টারকে জানিয়েছে। ঢাকা শহরের বড় বড় গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। তাতে কার্বন নিঃসরণ এবং অক্সিজেন উৎপাদন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, পাখিদের মৌলিক অধিকার নিরাপদে রাতযাপনের যন্ত্রণা বাড়ছে।’ আমার মুখের ওপর তারা বলে ফেলল, আপনাদের পরিকল্পনা কমিশন থেকে করা প্রকল্পপত্রে হাতিরঝিলের মধ্যে একটি কৃত্রিম দ্বীপ বানিয়ে সেখানে পক্ষীদের জন্য অভয়ারণ্য তৈরি এবং রাতের রিসোর্ট তৈরির কথা ছিল। অনেক বছর পর গাছ লাগানো শুরু হয়েছে বটে কিন্তু সেখানে মানুষদের যাওয়ার জন্য পথ তৈরি করে রাখা হয়েছে। তাহলে অভয়ারণ্য হবে কী করে বলুন।’

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

mazid.muhammad@gmail.com