অনৈতিকতা ও অনাস্থার প্রলম্বিত ছায়া 

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৪ এএম

বাংলাদেশে ব্যবসা করতে চান? তাহলে ‘সংকট’ নিয়ে ব্যবসা করুন। এখানে পুঁজি কম, চাহিদা বেশি, প্রতিযোগিতা সীমিত এবং মুনাফার সম্ভাবনা বেশি। ‘সংকট’ তৈরি হলে, ক্রেতা দরদাম করেন না। শুধু বলেন, ‘যা আছে, দেন।’ বাজারে এটি পরীক্ষিত ব্যবসায়িক মডেল। তেল নেই? মানুষ পাম্পে ছুটবে। গ্যাস নেই? মানুষ সিলিন্ডার কিনবে। পেঁয়াজ নেই? দাম যত হোক, রান্না বন্ধ করা যাবে না। ডিমের দাম বাড়বে? খাবারের তালিকায় ডিম থাকবেই। ওষুধের দাম বাড়বে? সমস্যা নেই। অসুস্থ মানুষ দরদাম করে ওষুধ কেনেন না। সংকট যত তীব্র, বিকল্প তত কম। বিকল্প যত কম, মুনাফার সুযোগ তত বেশি। কখনো প্রকৃত সংকটের আগে, গুজব ছড়িয়ে পড়ে সংকটের। তারপর শুরু হয় দৌড়। পাম্পে লাইন, বাজারে ভিড়, দোকানে মজুদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আতঙ্ক। মানুষ যত বেশি কিনে, বাজারে তত ‘সংকট’ তৈরি হয়। গুজব সংকট তৈরি করে, সংকট চাহিদা বাড়ায়, বাড়তি চাহিদা দাম বাড়ায়, আর বাড়তি দাম মুনাফা বাড়ায়। অবশ্য সব সংকট কৃত্রিম নয়। যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজার, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন ঘাটতি, আমদানি সমস্যা বা সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে, সংকট হতে পারে। কিন্তু যখন মজুদদারি, কৃত্রিম সরবরাহ-সংকোচন, সিন্ডিকেট ও গুজব যুক্ত হয়, তখন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। সংকট তখন অর্থনৈতিক সমস্যা থাকে না, হয়ে ওঠে ব্যবসার সুযোগ। 

সংকটের সময়, বাজারে অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। সরকার বলে, পণ্যে সংকট নেই। ব্যবসায়ীরা বলেন, সরবরাহ কম। ভোক্তা বলেন, দাম বেড়েছে। আর বাজার বলে, সবাই ঠিক বলছেন, শুধু দাম একটু বেশি। এই ‘একটু বেশি’ সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেট ভেঙে দেয়। যে পরিবার বাজারে ১০ হাজার টাকা খরচ করত, তাদের একই পণ্য কিনতে ১২ হাজার বা ১৫ হাজার টাকা লাগতে পারে। আয় না বাড়লেও, ব্যয় বাড়ে। তখন পরিবারকে অন্য কোনো খাতে কাটছাঁট করতে হয়। পণ্যের সংকট শুধু বাজার সমস্যা নয়। এর প্রভাব স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনমানে পড়ে। কিন্তু আমাদের সংকট ব্যবস্থাপনা, অনেক সময় সংকট শুরু হওয়ার পর শুরু হয়। দাম বাড়ার পর অভিযান। পণ্য উধাও হওয়ার পর, বাজার তদারকি। গুজব ছড়ানোর পর বিবৃতি। মজুদ ধরা পড়ার পর জরিমানা। এ ধরনের ব্যবস্থা সংকট মোকাবিলা করে না, সংকটের খবর মোকাবিলা করে। রাষ্ট্রের কাজ হওয়া উচিত, সংকটের আগে তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নজর রাখা। বাজারে পণ্যের সরবরাহ, আমদানি ও মজুদ তথ্য জনগণের জন্য সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। তথ্যে শূন্যতা থাকে না। সেখানে গুজব এসে বসে। পণ্যের প্রকৃত সংকট থাকলে, তা গোপন না করে জনগণকে জানাতে হবে। কত দিনের মজুদ আছে, বিকল্প সরবরাহ কোত্থেকে আসবে, সংকট কত দিন থাকবে এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য থাকলে আতঙ্ক কমে। আর আতঙ্ক কমলে, মজুদ কমে। জনগণকে শুধু ‘চিন্তার কারণ নেই’ বললে হবে না। মানুষ জানতে চান কেন সংকট হলো, সমাধান কী, কত দিনে সমাধান হবে এবং তাদের কী করতে হবে?

অন্যদিকে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো জরুরি। একটি পণ্য বা জ¦ালানির সরবরাহ যদি অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে বাজারে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হবে। তখন সরবরাহের সামান্য পরিবর্তন দামের ওপর প্রভাব ফেলে। প্রতিযোগিতামূলক বাজার, শক্তিশালী ভোক্তা অধিকার, কার্যকর বাজার তদারকি এবং দ্রুত বিচার এগুলো ছাড়া সংকটের ব্যবসা বন্ধ করা কঠিন। এখানে ভোক্তার ভূমিকা আছে। আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা বাজারকে অস্থিতিশীল করে। গুজব প্রতিরোধ, নাগরিকের দায়িত্ব। আবার সব দায় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। বাজারের এই সংকট-সংস্কৃতি, আমাদের একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। কেন আমরা এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করছি, যেখানে সংকটের সময় মানুষের কষ্ট মুনাফার সুযোগ হয়ে ওঠে? 

বাজার যদি মানুষের দুর্বলতার ওপর দাঁড়িয়ে মুনাফা করে, তখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যবসায়ী পণ্য সরবরাহ করেন, মুনাফা করেন। কিন্তু দূষিত বাজারে কেউ মুনাফা করেন, পণ্য আটকে রেখে। এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝা রাষ্ট্রের কাজ। পাশাপাশি সমাধানের পথ তাদেরই খুঁজতে হবে। সংকটকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। কিন্তু সংকটকে মুনাফার উন্মুক্ত উৎসবে পরিণত না করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, তথ্যের স্বচ্ছতা, বাজারে প্রতিযোগিতা, কঠোর জবাবদিহি এবং দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা। কারণ দুর্বল মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। উচ্চআয়ের মানুষ, দাম বাড়লেও পণ্য কিনতে পারেন। কিন্তু নিম্নআয়ের মানুষ পণ্য কেনা কমান। ফলে সংকটের অর্থনীতি  বৈষম্য বাড়ায়। সংকট ব্যবস্থাপনার সাফল্য শুধু বাজারে পণ্য আছে কিনা, তা দিয়ে মাপা যাবে না। দেখতে হবে, একজন সাধারণ মানুষ সেই পণ্য কিনতে পারছেন কিনা? 

সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন আমরা কি সংকট সমাধানের অর্থনীতি চাই, নাকি সংকটকে মুনাফার শিল্পে পরিণত করার অর্থনীতি?

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত