দুই টিকায় সম্ভাবনা সংশয়

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দিতে ডেঙ্গুর দুটি টিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর একটি জাপানের টাকেডা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ (টিএকে-০০৩), অন্যটি ফ্রান্সের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সানোফির ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’। এর মধ্যে ডেংভ্যাক্সিয়া বিশ্বের সর্বপ্রথম ডেঙ্গুর টিকা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মেক্সিকোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রথম দেশটিতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ ব্যবহারের অনুমতি দেয়। আর ডেঙ্গুর দ্বিতীয় টিকা হিসেবে গত পাঁচ বছর আগে আসে ‘কিউডেঙ্গা’।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকার বিষয়টি প্রথমে আলোচনায় আনেন যুক্তরাজ্যের লেস্টার ইউনিভার্সিটির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ডা. খোন্দকার মেহেদী আকরাম। টিকা বিষয়ে এই গবেষকের সঙ্গে দেশ রূপান্তরের কথা হয় গত সোমবার রাতে। গত বুধবার সোসাইটি ফর মেডিকেল ভাইরোলজিস্টস টিকার বিষয়টি আলোচনায় আনেন। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার টিকার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সীর সঙ্গে দেশ রূপান্তরের কথা হয়।

এই গবেষক ও ভাইরোলজিস্ট জানান, এই দুই টিকার মধ্যে ‘কিউডেঙ্গা’ এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পর্যায়ে আছে। সাড়ে চার বছর ধরে এই ট্রায়াল চলছে। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্তে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে ইতিবাচক ফল মিলেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’র কার্যকারিতা নিয়ে। কারণ এই টিকার এমন কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, যা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আশানুরূপ নয়। বরং ফিলিপাইনে এই টিকার প্রয়োগে বেশ কিছু শিশুমৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। অবশ্য এই দুই টিকার একটিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত নয় বলে জানা গেছে। তবে এসব টিকা বিশ্বের অনেক দেশেই প্রয়োগ হচ্ছে এবং বেসরকারিভাবে মানুষ কিনছে বলেও জানিয়েছেন এই দুই গবেষক ও চিকিৎসক। তারা বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ডেঙ্গুর টিকা প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন।

অবশ্য টিকার বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকার বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ সরকারের গঠিত টিকা-সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (নাইট্যাগ) থেকেও এ ধরনের কোনো প্রস্তাব আসেনি।

এসব টিকা এখনো নিরাপদ নয় বলে জানিয়েছেন আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব টিকা এখনো নিরাপদ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। যেসব দেশ এসব টিকা করছে, সেখানে ঢিমেতালে ট্রায়াল চলছে। কভিডের মতো তাদের সহযোগিতা করা হলে ট্রায়াল দ্রুত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এই টিকা নিরাপদ না। কোনো দেশেই এটা প্রয়োগ হচ্ছে না। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য অনুমোদন দেওয়া আছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্যেই আছে।

সরকারি পর্যায়ে এই টিকা নিয়ে দেশে অনেক আগেই আলোচনা হয়েছে বল জানান এই বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ যখন বাজারে আসে, তখনই এটা দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ফিলিপাইনে যখন শিশুরা মারা গেল, তখন সবাই সতর্ক হয়ে গেল। আমরা এমন কিছু করব না যাতে ইপিআইয়ের (সরকারের টিকাদান কর্মসূচি) অন্যান্য টিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এটা পরিপূর্ণভাবে নিরাপদ হলে তখন ভাবা যাবে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ২০১৭-১৮ সালে ফিলিপাইনের শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তখনই বাংলাদেশে প্রায় প্রয়োগ হতে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছিল। টিকা লাগবে। টিকা ছাড়া নিয়ন্ত্রণ হবে না। কিন্তু সেটা পরিপূর্ণভাবে নিরাপদ হওয়ার পরই প্রয়োগ করতে হবে।

ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কিউডেঙ্গা : ডা. খোন্দকার মেহেদী আকরাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই টিকা সম্প্রতি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে জনসাধারণের ওপর প্রয়োগের অনুমতি পেয়েছে।

আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বা অনাক্রান্ত চার বছরের শিশু থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের মানুষ কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন নিতে পারবে।

এই টিকার কার্যকারিতা বিষয়ে এই গবেষক বলেন, দুই ডোজের কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন ডেঙ্গুজ্বর থেকে সুরক্ষা দেয় ৮০ দশমিক ২ শতাংশ এবং ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোধ করে ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ। এই কার্যকারিতা বজায় থাকে ১৮ মাস পর্যন্ত। তবে কিউডেঙ্গা ভ্যাকসিন ডেঙ্গু সেরোটাইপ-৩-এর বিরুদ্ধে তেমন কার্যকর না।

ডেংভ্যাক্সিয়া নিয়ে শঙ্কা : ডা. খোন্দকার মেহেদী আকরাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজারে এলেও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে এই টিকা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে যারা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়নি (সেরোনেগেটিভ), তাদের জন্য এই ভ্যাকসিনটি নিরাপদ নয়। এ ছাড়াও ৯ বছরের কম বয়সী শিশুরা এই ভ্যাকসিনের উপযুক্তও নয়। কম বয়সী শিশু ও যাদের আগে ডেঙ্গু হয়নি তাদের এই ভ্যাকসিন দিলে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়, এটা এক ধরনের ভ্যাকসিনজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। সানোফির ভ্যাকসিনটির ফেইজ-৩ ট্রায়াল করা হয়েছিল এক বছর ধরে। তাই এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটি ট্রায়ালের সময় ধরা পড়েনি।

অন্যদিকে ফিলিপাইনে ২০১৬ সালে আট লাখ স্কুলপড়ুয়া শিশুকে এই টিকা দেওয়া হয়। পরে বেশ কিছু শিশু মারা যায়। তবে টিকায় শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলছেন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফিলিপাইনে তাদের টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে সাত লাখ শিশুকে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছিল। এই টিকা যাদের আগে ডেঙ্গু হয়েছে, তাদের দিতে হয়। কিন্তু কোম্পানি সেটা বলেনি। পরে অনেক শিশু মারা যায়। তখন সেখানে এই টিকা বন্ধ হয়ে যায়। তবে সানোফির টিকার ফিলিপাইনে যত না বাচ্চার মৃত্যু হয়েছে, তার চেয়ে বেশি দেখানো হয়েছে।

ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পরামর্শ : অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ডেঙ্গুপ্রবণ দেশগুলোতে টিকা প্রয়োগ করা হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায় এ বছর থেকে টিকা নেওয়ার কথা। ব্রাজিলে নিচ্ছে। যেসব দেশে ডেঙ্গু নেই, সেসব দেশেও নিচ্ছে। সুইডেনের মতো দেশে বেসরকারিভাবে জনগণ কিনছে। তারা ডেঙ্গুপ্রবণ দেশে যাওয়ার আগে টিকা দিচ্ছে। এসব টিকা বাংলাদেশের মতো ডেঙ্গুর এন্ডেমিক দেশগুলোর জন্য।

এই ভাইরোলজিস্ট বলেন, আমরা সরাসরি দিতে বলছি না। ইপিআই শিডিউলে আনতে হবে, তাও না। বলছি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করতে পারি। এই পাইলটিং থেকে তথ্য নিয়ে যদি ভালো হয়, তাহলে অনুমোদন দিক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের বিষয়ে এই ভাইরোলজিস্ট বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব টিকার প্রি-কোয়ালিফিকেশন করে, তা নয়। তারা টিকা আবিষ্কারের অনেক বছর পর নানা ডেটার ভিত্তিতে অনুমোদন দেয়। কিন্তু দেশগুলো এই টিকা প্রয়োগ করতে পারে।

টিকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব : অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, ডেঙ্গু এখন এন্ডেমিক রোগ হয়ে গেছে। অর্থাৎ বছর জুড়ে সব সময় থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, এখন শুধু ঢাকা শহরে না, ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। যেভাবে নগরায়ণ হচ্ছে, মশা ছড়িয়ে পড়ছে, শুধু মশা মেরে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, টিকা লাগবে।

ডা. খোন্দকার মেহেদী আকরাম বলেন, সরকারের উচিত ডেঙ্গু ভাইরাস দমনে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এবং যত দ্রুত এই উদ্যোগ নেওয়া হবে, ততই মঙ্গল।