পুলিশি আপ্যায়ন কত স্বাদের

ঢাকার বাইরে থেকে ফিরছিলাম গতকাল। বাস যাত্রাবাড়ী পার হয়ে সায়েদাবাদের দিকে যাওয়ার সময় জনপদ মোড় অতিক্রমকালে নেমে পড়লাম। রাত তখন ২টা। নেমেই সিএনজি পেয়ে গেলাম, দরদাম করে উঠে পড়লাম। কিছুদূর গিয়ে পুলিশ লেজার লাইট দিয়ে থামার সিগন্যাল দিলে ড্রাইভার সিএনজি থামাল। দেখলাম বেঞ্চ আর টুল পেতে কয়েকজন পুলিশ বসে, আমাদের দিকে তাকিয়ে। একজন উঠে এসে সিএনজির পেছনে বসা আমাকে বেশ শ্যেন চোখে দেখছে। আমিও মুখটা একটু বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু সে মুখ পাশ কাটিয়ে সিএনজির ভেতরে চোখ বুলাচ্ছে, ব্যাগট্যাগ কিছু নেই সঙ্গে তবু দেখেই চলেছে। বাধ্য হয়ে জানতে চাইলাম কিছু বলবেন? তিনি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাব জানতে চাইলেন, বললাম। এরপরও তাকিয়ে আছে, সিএনজি ছাড়ছে না। ইদানিং যে যাত্রী, পথচারী থামিয়ে মোবাইল ফোন চেক হওয়ার কথা শুনি, ভাবলাম আমার ফোন চেক করবে কি না। কিন্তু সেজন্য তো আমাকে নামতে বলা হতো। নামতে যেহেতু বলেনি, তাই ভাবলাম প্রাথমিক দর্শনধারী পরীক্ষা উতরে গিয়েছি। একটু সাহস করেই তাই বলে ফেললাম, ভাই, বাসায় যাব ছাড়বেন, নাকি নিয়ে গিয়ে খাইয়ে-দাইয়ে ছবি তুলে ছেড়ে দেবেন? হাসিমুখে বললাম, তিনিও স্মিত হাসলেন মনে হলো। তখন জানতে চাইলেন কী করেন? বললাম সাংবাদিক। বললেন, যান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ছবি ও ভিডিও ঘুরপাক খাচ্ছে। শনিবার বিএনপির কর্মসূচিতে মার খাওয়ার পর ডিবি অফিসে নিয়ে তাকে আপ্যায়ন করান ডিবিপ্রধান হারুন অর রশিদ। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আপ্যায়ন ও পুলিশি আপ্যায়নের মধ্যে বিপরীত অর্থবোধকতা আছে জনমুখে। কিন্তু এ ঘটনায় উভয় অর্থের দ্যোতনাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কাজেই পুলিশি আপ্যায়নের নেতিবাচক বাস্তবতা কাটিয়ে ওঠার একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বিএনপি নেতাকে ডিবিপ্রধানের এ আপ্যায়নের ঘটনা ও তার ছবি প্রকাশের উদ্দেশ্য যাই-ই হোক না কেন, ঘটনাটি ভাইরাল হয়েছে। এ জমানায় যেকোনো ঘটনা আর তার উদ্দেশ্য যাই-ই হোক না, বিষয়টা ভাইরালযোগ্য কি না সেটাই প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে সফল কনটেন্ট হিসেবে। ফলে আমাদের একটি ভাইরাল কনটেন্ট উপহার দেওয়ার জন্য ডিবিপ্রধান ধন্যবাদ পেতে পারেন বটে। ডিবি কার্যালয়ের ডাইনিংয়ে কেন পেপার বিছিয়ে খাওয়া হয় ছবি দেখে সে প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ। বিষয়টা নজরে আসার পর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিটি দেখলাম। পত্রিকা বোঝা যায় কিন্তু কোন বা কোন কোন পত্রিকা বিছিয়ে খাওয়া হয় ডিবিতে তা বুঝতে পারা গেল না। ফলে তারা কী কী পত্রিকা পড়েন সে ধারণা পাওয়া গেল না। তবে এক ভিডিওগ্রাফার বন্ধু বললেন, এ ক্ষেত্রে শিল্পনির্দেশনা দারুণ ছিল, কারণ বিভিন্ন নাটক, সিনেমা, ওটিটিতে পত্রিকা পড়ার দৃশ্যে সাধারণত পত্রিকার নাম দেখানো থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকা হয়। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। উপরন্তু, দৃশ্যের যে আটপৌঢ় আবহাওয়া সেটাও ফুটে উঠেছে। তাছাড়া পেপার বিছিয়ে খাওয়ার মধ্যে আন্তরিকতার আবহও সার্থকভাবে উঠে এসেছে। সোনারগাঁও হোটেল থেকে ওই খাবার আনা হয়েছিল বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল। এর পেছনে অবশ্য পেপার বিছানো খাবার টেবিলে সোনারগাঁও হোটেলের দুটি প্যাকেটের দৃশ্য সমর্থন জুগিয়েছে। ডিবি থেকে খাবারের মেন্যু না জানালেও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জানাচ্ছেন, বাসা থেকে নিয়ে আসা খাবার থেকে ভাতসহ হালকা সবজি ও রুই মাছের একটি টুকরা গ্রহণ করি।

তিনি আরও জানাচ্ছেন, রুই মাছটি ডিবিপ্রধানের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু এই বিএনপি নেতার দেওয়া আরেকটি তথ্যে আমাদের নজর পড়েছে। সেটি হলো, বিএনপির অন্যতম এই জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, ডিবি কার্যালয়ে তার জন্য যে খাবারের আয়োজন করা হয়, ‘তা তার স্বাস্থ্যের পক্ষে উপযোগী ছিল না’। আমরা বলতে চাই, ডিবিপ্রধানের খাবার স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া উচিত। তবে আপ্যায়ন করে সেটার ছবিসহ ভিডিও বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড বলে মন্তব্য করেন এ বিএনপি নেতা। তিনি বলেন, যারা এ কাজটি করেছে এটি অত্যন্ত নিম্নরুচির পরিচায়ক। এক ধরনের তামাশাপূর্ণ নাটক। এতে কি সরকার প্রমাণ করতে চায় যে, আমরা হা-ভাতে? ভিক্ষা করে খাই? গ্রামের ভাষায় বলা হয় ‘খাইয়ে খোটা দেওয়া’। ডিবি অফিসে আমার সঙ্গে যা করা হলো তা ওইরকমই। আমার বাড়িতে তো বিভিন্ন সময় অনেক লোক খায়। এটা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের। কিন্তু এ খাবারের ছবি উঠিয়ে কি আমি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেব? এটা কি আমার জন্য ভালো হবে?

এখন ছবিসহ ভিডিও বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার অবকাশ রয়েছে। নিশ্চিত না হয়ে নিন্দা জানাতে চাই না। কারণ, নিন্দা জানিয়ে ডিবিপ্রধানের আপ্যায়ন না জুটে যদি পুলিশি আপ্যায়ন পেতে হয়, তা হবে দুঃখের। অনেকে বলছেন, এ ছবিটা গয়েশ^র চন্দ্র রায়ের সঙ্গে না হয়ে একদা পুলিশের অন্য আপ্যায়নের শিকার জয়নাল আবদিন ফারুকের সঙ্গে ডিবিপ্রধানের হলে আরও মজার হতো।

আগের ডিবিপ্রধানদের কথা তেমন আলোচনায় না থাকলেও বর্তমান ডিবিপ্রধান এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। চলচ্চিত্র ও বিনোদন জগতের অনেকেই তার সঙ্গে দেখা করতে যান এবং সেসব খবর আমরা প্রকাশ করি ও পড়ি। তার আতিথেয়তার খবরও আমরা পাই। তবে সবার সঙ্গে তিনি বসে খান কি না, তা জানি না। যেমন হিরো আলম তার সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে, পুলিশের ভূমিকায় অভিনয় করে, নির্বাচনে দাঁড়িয়ে ভোটের আগে ও পরে বিভিন্ন সময় দেখা করতে গিয়েছেন। আশা করি আগামীতেও যাবেন। কিন্তু হিরো আলমকে তেমন আপ্যায়ন করতে দেখা যায়নি। দুই-একবার অবশ্য উপহার দিয়েছেন। আমার হিরো আলমকেও আপ্যায়িত হতে দেখতে চাই ডিবি কার্যালয়ে।

আপ্যায়নের নানান উদ্দেশ্য থাকে, আরও বেশি থাকে তা প্রচারের কৌশলের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে এবিএম মূসা লিখিত ‘মুজিব ভাই’ বই থেকে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়- “স্বাধীনতার পরের কথা। দেশে চলছে প্রবল খাদ্যাভাব। মওলানা ভাসানী ভুখা মিছিল নিয়ে গণভবনে এলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর তাঁকে সম্মানের সাথে ঘরে নিয়ে আদর করে খাবার-দাবার দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পরদিন সংবাদপত্রে সেই ছবি ছাপানোর ব্যবস্থা করা হয়। শিরোনাম- ‘ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেয়া মওলানার আহার বিলাস।’

সেই সময় বঙ্গবন্ধু লন্ডনে চিকিৎসা শেষে সুইজারল্যান্ডে বিশ্রামরত। ঘটনা জানতে পেরে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে তখনই রাষ্ট্রদূত মারফত ঢাকায় যোগাযোগ করেন। রাষ্ট্রদূতকে তিনি বলেন- তারা পেয়েছে কি...? কতটুকু জানে তারা মওলানা সম্পর্কে...?”

দুর্ভিক্ষ, খাদ্যাভাব, মঙ্গা এখনো খুব বেশি বিস্মৃত প্রপঞ্চ নয় যে, দেশে এবং মুদ্রা ও মূল্যস্ফীতিতে দিশাহারা সমাজে মিম আকারে নেটিজেনদের চালু সম্ভাষণ ‘বাবু খাইছ?’ কোনো অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণ হবে সেবার ভোজে কী ছিল কেমন ছিল তার স্বাদ। মেয়েদের গুণ বিচার হবে রান্নায় কে কত ভালো। পেট ফাটিয়ে খাওয়ানো হবে আদরের বহিঃপ্রকাশ। ‘তুমি দেহি হুগায়া গেছো, খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো কইরো’ হয়ে ওঠে কেয়ারিংয়ের নজির। দর-কষাকষি থেকে শুরু করে মন-কষাকষি মিটবে মিষ্টি খাওয়াখাওয়ি দিয়ে। তো, এ অবস্থায় জাতীয় সংকট নিরসনের সংলাপে ডিনারের আলাপই মুখ্য হবে- এটা নিয়া বিস্ময়ের কিছু নেই।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক