শান্তির বার্তা না কৌশল

নির্বাচন প্রশ্নে অনড় অবস্থানে থাকা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি অবস্থান কর্মসূচিতে সংঘাতের ঘটনার অন্য দিকটি নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়া বিএনপি নেতা আমানউল্লাহ আমানকে হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিরা দেখতে যান এবং পুলিশের পিটুনিতে আহত গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে ডিবি অফিসে আপ্যায়ন করা হয়। রাজনীতির এমন অভিনব ঘটনা দেখে সব মহলেই আলোচনা চলছে শান্তি-সমঝোতার বার্তা দিতে চেয়েছে সরকার? নাকি চাপে পড়ে ভুল শোধরানোর চেষ্টা করেছে, অথবা এটা আওয়ামী লীগের নতুন রাজনৈতিক কৌশল কি না?

এ ছাড়া আজ সোমবার সারা দেশে বিএনপির সমাবেশ কর্মসূচি পাল্টা আওয়ামী লীগও সমাবেশ ডেকেছিল। কিন্তু পরে তা বাতিল করা হয়েছে।

অন্যদিকে পুলিশের একাধিক সূত্র বলেছে, আপ্যায়নের বিষয়ে বাহিনীর মধ্যে দুই ধরনের মত রয়েছে। কেউ বলছে, এ ঘটনায় পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। কেউ বলছে, বিদেশিদের কাছে ‘ভাবমূর্তি উজ্জ্বল’ করতে এটা করা হয়েছে। তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এতে বিরক্ত হয়েছেন।

অবশ্য আওয়ামী লীগ ও মাঠের বিরোধী দল বিএনপির মন্তব্য ভিন্ন। ক্ষমতাসীন দলের দাবি, শান্তি-সৌহার্দ্যরে রাজনীতির চর্চা শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। বিএনপির দাবি, বিভ্রান্তি ও অস্বস্তিতে ফেলার জন্য সরকার এমন ঘটনা ঘটিয়েছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত শনিবারের দুটি ঘটনাই আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত। তাদের উদ্দেশ্য, বিএনপির ভেতরে অস্বস্তি সৃষ্টি করা।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একাধিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতার সঙ্গে দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা দাবি করছেন, এটা কোনোভাবেই সমঝোতার ইঙ্গিত দেওয়া নয়, শান্তি-সৌহার্দ্যরে চর্চা এবং একই সঙ্গে সরকারের গরম ও নরম অবস্থানের প্রকাশও।

এ নেতারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবিতে বিএনপির মাঠের আন্দোলন দমনে পুলিশ অ্যাকশন মুডে থাকবে। পাশাপাশি বিএনপি নেতাকর্মীর প্রতি আন্তরিকতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে শান্তি-সৌহার্দ্যরে বার্তাও দিতে চায়, আওয়ামী লীগ মূলত সেটিই জানান দিয়েছে। সরকারি দল আন্তরিকতার প্রকাশ দেখিয়েছে, পাশাপাশি রাজনীতিতে ফায়দা হাসিলের জন্য নতুন কৌশল নিয়েছে।

এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদকের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান হাসতে হাসতে বলেন, ‘রাজনীতি তো কৌশলই। তবে কাউকে দেখতে যাওয়া, আতিথেয়তা করা রাজনীতির বাইরের কোনো ঘটনা নয়। রাজনীতিতে এ ধরনের চর্চা থাকা ভালো।’

সরকারি দলের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাঠে বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলাও চলবে। বাসাবাড়ি ও অসুস্থ নেতাদের ফলমূল-পথ্য নিয়ে হাসপাতালে দেখতে যাওয়াও চলবে। বিএনপির নেতাদের মধ্যে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা এবং অস্বস্তিতে ফেলা এ কৌশলের উদ্দেশ্য।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি সংঘাতের পথ বেছে নিয়ে সরকার পতনের আন্দোলন করছে। আওয়ামী লীগ শান্তি-সমাবেশ করছে। শুধু শান্তি-সমাবেশই নয়, আওয়ামী লীগ শান্তি-সৌহার্দ্যরে রাজনীতির চর্চাও করতে চায়। বিএনপি মিথ্যাচার করে বিদেশিদের সরকারের বিরুদ্ধে নিতে চেষ্টা করে চলেছে। এটি মিথ্যা প্রমাণ করতে আওয়ামী লীগ শান্তি-সৌহার্দ্যরে রাজনীতির চর্চা করে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বিদেশিদের দেখাতে চায়।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগে থেকে না বলায় হঠাৎ হাসপাতালে আমানউল্লাহ আমানকে দেখতে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। জানিয়ে গেলে হতো না, বাধার মুখে পড়তে হতো। যেমনটি ঘটেছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শোক জানাতে গিয়ে।

আওয়ামী লীগের ওই নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে যান সন্তান হারানো মাকে সমবেদনা জানাতে। কিন্তু তাকে তখনকার বিরোধী দল নেতা খালেদা জিয়ার বাসভবনে ঢুকতে বাধা দেওয়ায় সমালোচনা হয়। বিএনপি নেতাদের দাওয়াত করে খাওয়ানো ও অসুস্থ নেতাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে ইতিবাচক রাজনীতির চর্চা করতে চায় আওয়ামী লীগ। এগুলো দেশের মানুষ দেখুক, বিদেশিরাও দেখুক।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত শনিবার যে দুটি ঘটনা ঘটেছে, তাতে দোষের কী হয়েছে। রাজনীতিতে শান্তি-সৌহার্দ্য নেই বলে নতুন মনে হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ঘটনা হরহামেশাই ঘটে।

তবে গয়েশ^র ও আমানকে নিয়ে যা হয়েছে, সেটাকে নাটকীয়তা বলে আখ্যায়িত করে পুরোটাই কৌতুকে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।

গত শনিবার পবিত্র আশুরার দিন বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পাঁচ ঘণ্টার ঢাকার সব প্রবেশমুখে অবস্থান কর্মসূচি দেয় বিএনপি। অন্যদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ জনগণের জানমাল রক্ষার কথা বলে একই কর্মসূচি দেয়।

গাবতলীতে কর্মসূচি পালনের সময় পুলিশ আটক করার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমানউল্লাহ। পরে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাকে দেখতে প্রধানমন্ত্রী তার সহকারী একান্ত সচিব গাজী হাফিজুর রহমান লিকুকে পাঠান। তিনি খাবার, ফল ও জুস নিয়ে আমানকে দেখতে যান। অন্যদিকে ধোলাইখাল এলাকায় কর্মসূচিতে পুলিশের পিটুনিতে আহত হন গয়েশ্বর রায়। তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। কার্যালয়ের দোতলায় সংস্থাটির প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হারুন অর রশীদের কক্ষের পাশের একটি কক্ষে তাকে আপ্যায়ন করা হয়।

এ ঘটনার পর আমানউল্লাহ বলেছেন, চলমান আন্দোলনে তার ভূমিকার পিঠে ছুরি মারা ও নেতাকর্মীদের বিভ্রান্ত করতে নাটক সাজানো হয়েছে। গয়েশ^র বলেছেন, এটা নিম্নমানের মশকরা। দেশের মানুষ এত নির্বোধ নয়।

আপ্যায়নের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে বিব্রতও হয়েছেন। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরসহ পুলিশের সবকটি ইউনিটেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা নিজেরাই আপ্যায়নের বিষয়টি খণ্ডন করার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে বলে মন্তব্যও করেছেন। আবার কেউ বলছেন, বিদেশিদের দেখাতে এটা করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মর্যাদার তিনজন ও পুলিশ সুপার (এসপি) মর্যাদার দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা আছে। আবার ভালো কাজও নিয়ে আলোচনা আছে। অবস্থান কর্মসূচিতে বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর হামলা করার পাশাপাশি যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছেন। এমন ঘটনার সময় ধোলাইখাল এলাকা থেকে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে আটক করে ডিবির কার্যালয়ে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন পুলিশ কর্তারা। সংঘর্ষের সময় গয়েশ^রের কপাল কেটে যায়। পুলিশ তাকে শুশ্রƒষা করারও ব্যবস্থা করেন। পরে তাকে ডিবির প্রধানের কক্ষের পাশেই একটি কক্ষে কয়েক পদের খাবার পরিবেশন করা হয়। ডিবির প্রধান হারুন অর রশীদ তাকে আপ্যায়িত করেন। গয়েশ্বরের প্লেটে তাকে খাবার তুলে দিতেও দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, হারুন অর রশীদ বলছেন, তার জন্য খাবারগুলো সোনারগাঁও হোটেল থেকে আনা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তারা আরও বলেন, পুলিশের কেউ না কেউ আপ্যায়নের দৃশ্যের ছবি ও ভিডিও বাইরে পাঠালে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছড়িয়ে পড়ে। এতে পুলিশের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষুণœ হয়েছে। আটক হওয়া ব্যক্তিকে এভাবে আপ্যায়ন করা যায় না। তবে আপ্যায়ন করলেও তা প্রকাশ করা যায় না। সামনের সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের চাপ আছে সরকারের ওপর। আবার মানবাধিকার বিষয় নিয়ে র‌্যাবের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব কারণে বিদেশিদের দেখাতে ডিবি পুলিশ আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে বলে তারা মনে করছেন। তাছাড়া গয়েশ^র রায়কে আপ্যায়নের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতেন না।