হাজিরা দিলেই পাস

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩ দিয়াবাড়ীর উত্তরা কার্যালয়ে গ্রাহকের ভোগান্তির শেষ নেই। অনিয়মই সেখানে নিয়ম। সরকার নির্ধারিত ফি দিয়ে কোনো কাজই সেখানে সম্ভব নয়।

কার্যালয়টির সামনেই সক্রিয় থাকে কয়েকটি দালাল চক্র। তাদের মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স করালে অদক্ষ চালকরাও শুধু হাজিরা দিলেই পাস। তাদের মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্স করাতে ৯ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়। যদিও সরকারি হিসাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে পেশাদারের জন্য ৩ হাজার ৮০০ আর অপেশাদারের জন্য ৫ হাজার ৫০০ টাকা লাগে।

বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ যদিও বলে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মাঝেমধ্যেই দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সম্প্রতি কয়েক দফায় বিআরটিএর উত্তরা কার্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান ফটক থেকে শুরু করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কক্ষের সামনেও সক্রিয় দালাল চক্রের সদস্যরা। অন্য সার্কেল অফিসে নিরাপত্তার দায়িত্বে আনসার সদস্য থাকলেও এ জায়গায় কোনো আনসার সদস্য দেখা যায়নি। আনসার এখনো নিয়োগ হয়নি। পরীক্ষা দিতে যাওয়া লাইসেন্স-গ্রাহকদের বসার সুব্যবস্থা নেই। তীব্র গরমের মধ্যে ফিল্ড পরীক্ষা দিতে হয়। ভাড়া করা জায়াগায় হ-য-ব-র-ল অবস্থায় ড্রাইভিং করতে দেখা গেছে। কোনো সেবাই বাড়তি টাকা ছাড়া মেলে না।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভবন-১-এর নিচে দালাল ফরহাদের নিয়ন্ত্রণ। ব্যাংকের টাকা জমার দেওয়ার জায়গার পাশে তাকে দেখা যায়। আর মাঠে সানী নামে আরেক দালাল থাকে। বাবুল নামে এক প্রভাবশালী দালাল আছে। সে বিআরটিএ হেড অফিসের বড় এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ড্রাইভার। ফিল্ড পরীক্ষা দিতে যাওয়াদের অনেকের ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার থাকলেও তাদের কাছ থেকে বাড়তি ৪০০ টাকা আদায় করা হয়। লাইনম্যানরা এ টাকা দিতে বাধ্য করে। কর্মকর্তাদের সামনেই তা হয়ে থাকে।

ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষার সময় দালালদের মাধ্যমে যারা পরীক্ষা দেয় তাদের নাম-ঠিকানা লিখলেই পাস। আর ফিল্ড পরীক্ষার সময় গাড়িতে উঠে বসলেই পাস। যারা মাধ্যমের সন্ধান করে না তাদের পাস হওয়া কঠিন।

উত্তরায় একটি বেসরকারি কলেজে পড়া মো. রাকিব প্রাইভেট কার চালাতে পারেন, কিন্তু মোটরসাইকেল চালাতে পারেন না। তিনি ২৩ জুলাই এসেছিলেন পরীক্ষা দিতে। রাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফিল্ড পরীক্ষা মানে অগ্নিপরীক্ষা। এখানে দালাল দিয়ে কাজ না করালে পাস হবে না। দালালরাই এ পরীক্ষাকে বলে অগ্নিপরীক্ষা। শুধু এ পরীক্ষায় পাস হতে ৩ হাজার টাকা লাগে। আর সংশ্লিষ্ট অন্য কাজে ৯ হাজার লাগে। আমি ছাত্র মানুষ, তাই ৩ হাজার টাকা দিয়ে পরীক্ষা পার হচ্ছি। বাকি কাজ কষ্ট করে আমি করব।’

মো. শরীফ নামে এক প্রাইভেট কারচালক সিরাজগঞ্জ থেকে তিন মাস আগে ঢাকার উত্তরায় এক সরকারি কর্মকর্তার গাড়ি চালানোর কাজ পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গ্রামে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল। সেটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ওই লাইসেন্সের ফটোকপিও হাতে নেই। দ্রুত যেন নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে পারি, সেজন্য এখানে আবেদন করা। এখানে দালাল ছাড়া কোনো কাজই হয় না। ১৩ হাজার টাকায় চুক্তি করে এক দালাল ধরলাম। দ্রুত লাইসেন্স না পেলে চাকরিটাই থাকবে না।’

গত সোমবার গাড়ির মালিকানা বদলানোর জন্য এক বন্ধুকে নিয়ে উত্তরায় হাজির মো. সোহাগ নামে এক শিক্ষার্থী। তিনি বললেন, ‘প্রথমে মালিকানা বদলানোর রুমে গেলে জানানো হয়, মূল মালিক না এলে মালিকানা বদলানো যাবে না। কিন্তু মূল মালিক দেশের বাইরে। অফিসের নিচে নামার পর সানী নামে এক দালাল বলল, সরকারি ফি বাদে ৫ হাজার টাকা দিলে সব হবে।’

পরে এ দালালকে টাকা দিয়ে কাজ করাতে দেখা যায় তাকে। দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদকের পরিচয় গোপন করে সানীর কাছে প্রাইভেট কার চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দিতে কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে সানী বলেন, ‘আপনি হাজিরা দিলেই পাস। আর ফিল্ড পরীক্ষায় গাড়িতে একবার বসবেন, তাহলেই হবে। ওপরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের সরাসরি যোগাযোগ আছে। যদি বিশ্বাস না হয় আমার বাসা এ অফিসের পেছনেই। আমার বাসায় এসে চা খেয়ে যান। আপনার টাকা মার যাবে না। ১২ হাজার টাকা দিলে হবে। প্রথমে ৩ হাজার। তারপর পরীক্ষার দিন ৬ হাজার। বাকিটা কার্ড হাতে পাওয়ার পর দিলে হবে।’

অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো-৩ সার্কেলের উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) কাজী মো. মোরছালীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব জায়গা নেই। ভাড়া করা ভবনে সেবা কার্যক্রম চালাতে হয়। দালালদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এখানকার কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান সড়ক পরিবহন সচিব ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে ভোগান্তি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে বিআরটিএর বিভিন্ন সার্কেলে ২ থেকে ৩ ঘণ্টায় ৩০০-৪০০ লাইসেন্সপ্রার্থী চালকের পরীক্ষা নেওয়া হয়। স্বল্প পরিসরের মাঠে পরীক্ষা নেওয়ায় চালকের যোগ্যতা যাচাইয়ে ত্রুটি থাকে। সংস্কার করে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চালকের দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় পরিবর্তন আনা জরুরি। অযোগ্য চালকরাও এখন ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে, যা সড়ক নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি করে।’

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিআরটিএ যে পদ্ধতিতে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়, তা আন্তর্জাতিক মানদন্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। অদক্ষ চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ফলে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। সংস্কার লাগবে বিআরটিএর। সংস্কার ছাড়া এ পদ্ধতি থেকে বেরোনো যাবে না। যেভাবে পরীক্ষা নেওয়া হয় তাতে দক্ষ চালক পাওয়া যাবে না।’