এক যুগেও উদ্ধার হয়নি আত্রাখালী নদী

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২২ এএম

পাহাড়ি সোমেশ^রী নদীতে দীর্ঘদিনের দখল ও বালু উত্তোলনের দাপট কমলেও তার ক্ষতচিহ্ন এখনো তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে চারপাশের প্রকৃতিকে। সোমেশ^রীরই শাখা নদী আত্রাখালী। এক সময় এটি খরস্রোতা থাকলেও দখলদারদের আগ্রাসনে আজ অস্তিত্ব হারিয়ে বালুচরে পরিণত হয়েছে। এতে বিপন্ন হয়ে পড়েছে স্থানীয় কৃষি, মৎস্য সম্পদ ও নদীভিত্তিক অর্থনীতি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমেশ^রী নদীর পূর্ব অববাহিকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এই আত্রাখালী নদীর সৃষ্টি হয়। প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৫১ মিটার প্রশস্ত নদীটি পরবর্তী সময় কলমাকান্দায় সোমেশ^রীর আরেকটি শাখা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। সোমেশ^রী ছাড়াও বেশ কয়েকটি পাহাড়ি ঝরনা ও ছড়ার পানি এসে মিশত এই নদীতে। স্বচ্ছ পানির এই আত্রাখালী এক সময় দেশীয় মাছের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু আজ তা শুধুই অতীত।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সোমেশ^রী নদীতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভূগর্ভস্থ বালু ও পাথর উত্তোলন করা হয়েছে। এর চরম ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে এর শাখা নদীগুলোতে। বিশেষ করে শুধু বালু পরিবহনের সুবিধার্থে ট্রাক চলাচলের রাস্তা বানাতে গিয়ে আত্রাখালী নদীর মূল প্রবেশদ্বার বা উৎসমুখ পুরোপুরি আটকে দেওয়া হয়। এতে নদীটি স্বাভাবিক নাব্য হারিয়ে ধীরে ধীরে বালু ও মাটির স্তূপে পরিণত হয়েছে।

একসময় যে নদী দিয়ে প্রতিদিন শত শত নৌকা পার্শ^বর্তী উপজেলাগুলোতে যাতায়াত করত। সেই নদী শুকিয়ে যাওয়ায় এখন পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। নদীসংলগ্ন শত শত হেক্টর জমিতে একসময় নদীর পানি দিয়েই বিভিন্ন ফসল ও সবজির আবাদ করা হতো। পানি না থাকায় এখন বহু কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে থাকছে। সেচের অভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা।

স্থানীয় বাসিন্দা জামাল মিয়া জানান, আগে আওয়ামী লীগের আমলে নদী ইজারা দেওয়ার পর ড্রেজার দিয়ে ইচ্ছামতো বালু উত্তোলন করা হয়েছে। এতে নদীর আগের সেই স্বাভাবিক আকৃতি আর নেই। একসময় এই নদীর ১০০ বছরের ঐতিহ্য ও নিজস্ব গতিপথ ছিল। তা এখন পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে। নদীর যে প্রকৃত রূপ বা সৌন্দর্য ছিল সেটি এখন আর দেখা যায় না। নদীর পশ্চিম অংশে ড্রেজার দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বালু তোলায় নদীর তলা অনেক বেশি গভীর হয়ে গেছে। অন্যদিকে পলি পড়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পথও বন্ধ হয়ে গেছে। আগে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে পানি প্রবাহিত হতো। এখন উল্টো পূর্ব দিক থেকে পানি পশ্চিমে নেমে যায়। এভাবে অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজিংয়ের কারণে নদীটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন এই নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে আত্রাখালী নদী দ্রুত পুনঃখনন করা অত্যন্ত জরুরি।

শুধু আত্রাখালীই নয়, সোমেশ^রী, কংস ও মগরাসহ নেত্রকোনা জেলায় প্রায় ৯৫টি নদী রয়েছে। নাব্যসংকট এবং অবৈধ দখলের কারণে অধিকাংশ নদীই আজ অস্তিত্বসংকটে। এর মাঝে আত্রাখালী উদ্ধারে বিগত এক যুগে দৃশ্যমান কোনো বড় পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং জেলা প্রশাসন থেকে আবারও জানানো হয়েছে নদী পুনঃখননের আশ্বাসের কথা।

নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘জেলার প্রধান নদীগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও নাব্য ফিরিয়ে আনতে আমাদের একটি বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এই সমীক্ষার সুপারিশের ভিত্তিতে আমরা বেশ কয়েকটি নদী ও খাল পুনঃখনন এবং ড্রেজিংয়ের কাজ বাস্তবায়ন করব।’

তিনি বলেন, ‘আত্রাখালী নদীটি পাহাড়ি সোমেশ্বরী নদীরই শাখা নদী। দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে এটি ভরাট হয়ে গেছে। নদীর উৎসমুখ কোনোভাবেই বন্ধ রাখা যাবে না। শাখা নদীতে যাতে সহজেই পানি প্রবেশ করতে পারে এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ সচল থাকে সেভাবেই সমীক্ষার নির্দেশনানুযায়ী ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নদী ও খালের সমন্বিত নেটওয়ার্ক সচল করতে আমরা দ্রুতই নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছি। নদীগুলো ড্রেজিং ও পুনঃখননের মাধ্যমে স্বাভাবিক রূপ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে শুষ্ক মৌসুমেও নদীতে পানি থাকবে, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হবে, মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষিকাজে পর্যাপ্ত পানি ব্যবহার করা যাবে।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘নদী রক্ষায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা নিয়মিত সভা পরিচালনা করছি। আমরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় দ্রুতই নদী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হবে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই এর কিছু দৃশ্যমান প্রভাব দেখতে পাওয়া যাবে। পরে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া অবৈধ দখলের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতিবেদন দেওয়া মাত্রই আমরা দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান শুরু করব।’ তিনি বলেন, ‘নদী আমাদের প্রাণ। নদী আছে বলেই বাংলাদেশ ও আমাদের জীববৈচিত্র্য টিকে আছে। এ বিষয়ে আমরা কোনো আপস করব না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত