সকাল থেকে মিছিলের নগরীতে পরিণত হয় গোটা রংপুর শহর। খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জনসভা মাঠে জড়ো হতে থাকেন আশপাশের জেলার নেতাকর্মীরা। বেলা গড়াতে গড়াতে জনসমুদ্রে রূপ নেয় উত্তরাঞ্চলের এই বিভাগীয় শহর। সেই জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আবারও নৌকা মার্কায় ভোট দিন। জনগণকে সেবা করার সুযোগ দিন। আমি আপনাদের কাছে সেই সুযোগ চাই।’
দেশের মানুষের ভাগ্য বদলাতে জীবন দিতে প্রস্তুত, এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাবা-মা, ভাই সব হারিয়েছি। বাংলাদেশের জনগণ এটা তো আমার সংসার, এরাই আমার আপনজন। আপনাদের মাঝেই আমি খুঁজে পাই আমার বাবা-মা, ভাই-বোনের স্নেহ।’
গতকাল বুধবার বিকেলে জিলা স্কুল মাঠে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
বেলা সোয়া ১টার দিকে হেলিকপ্টারে রংপুর পৌঁছান সরকারপ্রধান। বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে জনসভা মাঠে প্রবেশ করেন তিনি। জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার আগে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ২৭টি নবনির্মিত উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ৫টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় যোগদানের আগে প্রধানমন্ত্রী রংপুর সার্কিট হাউসে বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সমাবেশ শুরুর আগেই মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকা পূর্ণ হয়ে যায় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনতে আসা মানুষে। ‘শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার’; ‘শেখ হাসিনার দুই নয়ন, রংপুরের উন্নয়ন’; ‘শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ নানা স্লোগানে শেখ হাসিনাকে বরণ করে নেয় রংপুরবাসী।
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমন উপলক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবিসংবলিত তোরণ-ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয় গোটা শহর।
সকাল ৮টা থেকে সভাস্থল নগরীর ঐতিহাসিক রংপুর জিলা স্কুল মাঠে দূর-দূরান্ত থেকে রঙিন টি-শার্ট ও ক্যাপ পরিহিত নেতাকর্মীরা ঢাকঢোল পিটিয়ে আসা শুরু করেন। এ সময় বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে দলে দলে নেতাকর্মীরা আসেন জনসভাস্থলসহ জিলা স্কুলের দিকে। বাহারি সাজসজ্জা আর বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে বিভিন্ন সেøাগানে নেচে-গেয়ে উচ্ছ্বাস করেছেন তারা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবশেষ রংপুরে এসেছিলেন ২০১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর। এ সময় তিনি রংপুরের পীরগঞ্জ ও তারাগঞ্জে দুটি নির্বাচনী জনসভা করেন। সাড়ে ৪ বছরের বেশি সময় পর শেখ হাসিনা রংপুরে আসেন। এর আগে ২০১১ সালের ৮ জানুয়ারি একই মাঠে জনসভা করেন প্রধানমন্ত্রী। বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নের কথা তুলে ধরে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘একমাত্র নৌকা মার্কা ক্ষমতায় আসলে দেশের উন্নতি হয়। নৌকা মার্কা ক্ষমতায় আসলে কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন হয়। নৌকা মার্কা ক্ষমতায় আছে বলেই ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ গেছে।’
দেশ ও জনগণের উন্নয়ন করতেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখনই সরকারে এসেছে, এই রংপুরে কখনো মঙ্গা হয় নাই। রংপুরে কখনো খাদ্যের অভাব দেখা দেয়নি। দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারে আসলে, নৌকা মার্কায় ভোট পেলে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়, সেটা আমরা প্রমাণ করেছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি কাজের লক্ষ্য দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা। দেশের মানুষের উন্নতি করা। নৌকা মার্কা ক্ষমতায় আছে বলেই আজকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।’
টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই তো ক্ষমতায় ছিল, এই রংপুরের ভাগ্য পরিবর্তনে কেউ কাজ করেনি। ওই খালি নৌকা মার্কা ক্ষমতায় আসলে কাজ হয়। তিনি বলেন, নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে স্বাধীনতা পেয়েছেন, নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে। আজকে হতদরিদ্র বলতে গেলে নাই, মাত্র ৫ শতাংশ। আল্লাহর রহমতে সেইটুকুও থাকবে না।
রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন উন্নয়নকাজের ফিরিস্তি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই অঞ্চলে আর কখনো, কোনো দিন কোনো দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে না, মঙ্গা দেখা দেবে না। আমরা সেভাবে আপনাদের এই রংপুর বিভাগের উন্নয়ন করে দিচ্ছি।’
একটি গোষ্ঠী দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের দেশ এগিয়ে যাক, এখানে একটা গোষ্ঠী আছে যারা সব সময় বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলে। জাতির পিতাকে হত্যা করে সেই খেলা শুরু হয়েছিল। বারবার ক্ষমতা দখল, হত্যা-ক্যু ষড়যন্ত্রের রাজনীতি হয়েছে।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘আমার হারাবার কিছু নেই। সব হারিয়েও একটি প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফিরে এসেছি। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মুখে অন্ন জোগাব, প্রতিটি মানুষকে ঘর করে দেব, জীবনমান উন্নত করব। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বাবার মতো জীবন দিতে আমি প্রস্তুত।’
দেশের মানুষ এখন শান্তিতে ভোট দিতে পারে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা অনেক সংগ্রামের পথ বেয়ে, অনেক আন্দোলন করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছি। মানুষ শান্তিমতো এখন ভোট দিতে পারে। এই ভোট দেওয়ার জন্য আমরা ছবিসহ ভোটার লিস্ট করেছি, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স করে দিয়েছি। শান্তিপূর্ণভাবে মানুষ যাতে ভোট দিতে পারে, সেই ব্যবস্থা আমরা হাতে নিয়েছি।’
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘খেলা হবে, ডিসেম্বরে ফাইনাল খেলা হবে। বিএনপির এক দফা খাদে পড়ে গেছে। খাদে পড়া দলের কোনো দফা বাস্তবায়ন হবে না এবং তাদের কোমর ভেঙে গেছে।’
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন। সঞ্চালনা করেন রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বান এ কে এম ছায়াদত হোসেন (বকুল)। আরও বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, নৌপরিবহনমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এইচ এন আশিকুর রহমান, সাবেক সাংস্কৃতিক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন, সুজিত রায় নন্দীসহ অন্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
জনসভায় হুইলচেয়ারে ৯৬ বছরের মজিবুর মাস্টার : স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান মাস্টার (৯৬) হুইলচেয়ারে এসেছিলেন প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একনজর দেখতে রংপুরের বদরগঞ্জ থেকে। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশকে সফল করার জন্য, সহযোগিতার জন্য এসেছি। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমার কোনো কষ্ট নাই। সবার উদ্দেশ্যে বলব, আসুন, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে আবারও শেখ হাসিনার সরকার দরকার।’ তিনি সবাইকে আবারও নৌকায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারকে দেশ পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান।
প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় অংশ নিয়েছে হিজড়া জনগোষ্ঠী : ‘রাষ্ট্র সমাজ পরিবারে, সমান হব অধিকারে’ এবং ‘প্রধানমন্ত্রীর আগমন রংপুরে স্বাগতম’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে হিজড়া জনগোষ্ঠীর একটি দল মিছিল করতে করতে জনসভায় অংশ নেয়। জনসভায় উপস্থিত থেকে তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তারা বলেন, হিজড়া জনগোষ্ঠীকে ভোটাধিকার ও তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দেওয়ায় তারা অনেক বেশি আনন্দিত এবং গর্বিত। সেই কৃতজ্ঞতার জায়গা থেকে কোনো রাজনৈতিক দলের কিংবা কারও নেতৃত্বে নয়; বরং তারা নিজেদের অর্থায়নে, নিজেদের উদ্যোগে এই জনসমাবেশে উপস্থিত হয়েছেন।
এ বিষয়ে রংপুর হিজড়া জনগোষ্ঠীর নেতা আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, ‘আমাদের নিজেদের কোনো দোষ নেই। তারপরও জন্মের পর থেকেই আমরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত ছিলাম। আমরা সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে জীবনযাপন করেছি।’