গত এক সপ্তাহ ধরেই ঢাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ একটি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু ঢাকার বাইরে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত ৩০ জুন দেশের ১২ জেলা ডেঙ্গুমুক্ত ছিল। সেদিন দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট ডেঙ্গু রোগীর ২৪ শতাংশ ছিল ঢাকার বাইরে। এক মাসের মাথায় ৩০ জুলাই সব জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন ঢাকার বাইরে রোগী বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ শতাংশ। এমনকি সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ঢাকার বাইরে রোগী আরও বেড়ে ৪৫ শতাংশে পৌঁছে। অর্থাৎ গত এক মাসে ঢাকার বাইরে রোগী বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বাড়লেও রাজধানীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ‘স্থিতিশীল’ বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএস) অধ্যাপক ডা. মো. শাহাদাত হোসেন। তিনি গতকাল বুধবার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের হার মোটামুটি স্থিতিশীল, তবে ঢাকার বাইরে আক্রান্তের হার বাড়ছে। ঢাকায় কয়েকটি এলাকায় এখনো ডেঙ্গু সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে অন্যতম হলো যাত্রাবাড়ী, মুগদা, উত্তরা, জুরাইন ও মিরপুর। এসব এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী যাত্রাবাড়ী এলাকায়। বিভাগীয় পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আক্রান্তের দিক থেকে ঢাকার পরেই চট্টগ্রামের অবস্থান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, ঢাকার বাইরে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গু রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামে ডেঙ্গু রোগী ছড়িয়ে পড়ার পেছনে এডিস মশার আরেক প্রজাতি ‘অ্যালবোপিকটাস’কে মূল কারণ মনে করছেন কীটতত্ত্ববিদরা। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু রোগ ছড়ানোর সঙ্গে যে দুই ধরনের মশা জড়িত তার একটি এডিস ইজিপ্টাই, অন্যটি এডিস অ্যালবোপিকটাস। এর মধ্যে ইজিপ্টাই ঢাকা বা শহরাঞ্চলে বেশি থাকে। আর এর বাইরে গ্রামাঞ্চলে এডিস অ্যালবোপিকটাস। এবার গ্রামাঞ্চলে এডিস অ্যালবোপিকটাস ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। যদিও এ ব্যাপারে এসব কীটতত্ত্ববিদদের কাছে সাম্প্রতিক কোনো গবেষণা নেই। কিন্তু ২০১৯ সালের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তারা বলছেন, গ্রামে এডিস অ্যালবোপিকটাসের ঘনত্ব ও রোগ ছড়ানোর সক্ষমতা বেড়েছে।
এ ব্যাপারে কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকার বাইরে বেশ কিছু জায়গায় আগে থেকেই অ্যালবোপিকটাস মশা বেশি ও সেখানে ডেঙ্গুও বেশি। এমন হতে পারে, এরই মধ্যে অ্যালবোপিকটাসের বৈশিষ্ট্যেও কিছু পরিবর্তন হয়েছে। এখন তারা বেশি পরিমাণ ভাইরাস ছড়াতে পারে। আমরা এমনও জানতে পেরেছি, কয়েক জায়গায় ইজিপ্টাই পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু অ্যালবোপিকটাস আছে ও সেখানে ডেঙ্গু হচ্ছে।
গত ১৪ জুলাই এ বছরের প্রথম ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়। সেদিন ঢাকায় রোগী ছিল ১৮৪ জন, কিন্তু বাইরে ছিল ২৬৫ জন। এরপর গত ১৯ দিনের মধ্যে ৯ দিনই ঢাকার বাইরে রোগী বেশি ছিল। বিশেষ করে গত চার দিন একটানা ঢাকার বাইরে বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ খলিলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, গ্রামে প্রচুর ডেঙ্গু রোগী হচ্ছে। বরিশালে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকেও রোগী আসছে হাসপাতালে। বরিশালে জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত রোগী ছিল তিনশোর নিচে, সেখানে মধ্য জুলাইয়ে রোগী বেড়ে হয় ২২০০-২৩০০ হয়। এখন পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এসব রোগী বেশিরভাগ আসছে গ্রাম থেকে। বরিশালে শহরের চেয়ে গ্রামের রোগী বেশি। এরকম আরও কয়েকটি জেলার গ্রামেরও একই অবস্থা।
এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, এখন গ্রামে ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে অ্যালবোপিকটাস। যদিও কোনো জরিপ হয়নি, কিন্তু অতীতের ধারণা থেকে এটি নিশ্চিত। কিছু কিছু গ্রামে বৃষ্টি হচ্ছে। সুতরাং মশার প্রজনন উৎস তৈরি হচ্ছে প্রচুর। নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ও খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রামের মানুষ এখন মাটির মটকা ও ড্রামে বৃষ্টির পানি ধরে রাখে। ঢাকা শহরের পাশে নারায়ণগঞ্জেও দেখেছি প্রচুর মানুষ মটকা ও ড্রামে বৃষ্টির পানি জমা করে রেখেছে। ওইসব জায়গায় এখন প্রচুর মশা প্রজনন ঘটাচ্ছে। মশা হয়তো আগেও ছিল, কিন্তু ভাইরাস কম ছিল। অথচ ঈদের সময় মানুষ গ্রামে যাওয়ায় ভাইরাসের ঘনত্ব বেড়ে গেছে। ফলে ঈদের এক মাস পর এখন রোগী বাড়া শুরু হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদ মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, এবার ঢাকায় ৯৮ শতাংশ এডিস ইজিপ্টাই ও ২ শতাংশ অ্যালবোপিকটাস পাওয়া গেছে। কারণ গাছপালা নেই। তাই অ্যালবোপিকটাসও কম। গ্রামে গাছপালা বেশি, সেখানে অ্যালবোপিকটাসও বেশি। অ্যালবোপিকটাস মশাও ডেঙ্গু রোগের বাহক। ২০১৯ সালে কুষ্টিয়ার ছাত্তাপাড়া গ্রামে প্রচুর ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেল। কিন্তু ইজিপ্টাই মশা পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল অ্যালবোপিকটাস। অর্থাৎ ওখানে এডিস অ্যালবোপিকটাসের কামড়েই রোগটা ছড়িয়েছে। এবার গ্রামে এমনটিই হচ্ছে।
কীটতত্ত্ববিদ খলিলুর রহমান বলেন, এডিস মশার সার্ভে শহরেও ঠিকমতো হয় না। ২০১৯ সালে যখন দেশে প্রচুর ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেল, তখন আমরা যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, কুষ্টিয়া ও বরিশালে মশার সার্ভে করেছিলাম। তখন যশোর ও সাতক্ষীরার শহর ও গ্রামে ৫০১টি বাসা সার্ভে করে ৫০০ বাসাতেই, অর্থাৎ শতভাগ অ্যালবোপিকটাস পেয়েছি। খুলনায় শহর ও গ্রাম মিলে ৩৫-৪০ শতাংশ পেয়েছি অ্যালবোপিকটাস। কুষ্টিয়ার সাঁতারপাড়া গ্রামে সবচেয়ে বেশি ৩৭ জন রোগী ছিল ও দুজন মারা গিয়েছিল। সেখানেও ৩৫-৪০ শতাংশ অ্যালবোপিকটাস পেয়েছি। বরিশালের শহর ও গ্রামে পেয়েছি ৩২-৩৫ শতাংশ। গতবার বরিশালে সবচেয়ে বেশি রোগী ছিল মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায়। সেখানেও সার্ভে করে দেখেছি অ্যালবোপিকটাসের ঘনত্ব বেশি।
কীটতত্ত্ববিদ খলিলুর রহমান বলেন, পূর্ণবয়স্ক অ্যালবোপিকটাসের মাঝখানে একটি সাদা দাগ থাকে আর ইজিপ্টাই মশার মধ্যে থাকে দুই পাশে দুটি দাগ। বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য হলো সাধারণত বলা হয় ইজিপ্টাই কনটেইনারে প্রজনন করে। কিন্তু আমরা যশোর ও সাতক্ষীরা পরিদর্শন করেছি, সেখানে কনটেইনারে অ্যালবোপিকটাসও পেয়েছি। অ্যালবোপিকটাসকে বলা হয় গ্রামের ও বনের মশা। তারা বনে, গাছের কোটরে প্রজনন করে। ঘরের চেয়ে বাইরে থাকতে পছন্দ করে। কিন্তু সার্ভে করার সময় যশোর ও সাতক্ষীরায় শহরেও শতভাগ অ্যালবোপিকটাস পেয়েছি।
এ কীটতত্ত্ববিদ আরও বলেন, দুটি মশায় দিনে কামড়ায়। সূর্যোদয় থেকে দুই ঘণ্টা ও সূর্যাস্তের দুই ঘণ্টা আগে বেশি কামড়ায়। যখন তাপমাত্রা কমে যায়, এ মশার নড়াচড়া কমে যায় ও আর্দ্রতা বেশি আছে এমন জায়গায় আশ্রয় নেয়। ২৪-২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এ মশার কামড়ানো ও প্রজননের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ। এটা তাদের প্রজননের জন্য উৎকৃষ্ট সময়।
গ্রামের মশা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হবে বলে মনে করছেন কীটতত্ত্ববিদ খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, কারণ প্রজনন উৎস বেশি। সে ক্ষেত্রে মশা নিধনে বড় ধরনের স্প্রে করতে পারে। এতে পূর্ণবয়স্ক মশা মরে যাবে। এ ছাড়া যেখানে লার্ভা আছে, সেটাও ধ্বংস করতে পারে।
এক দিনে ভর্তি ২৭১১ রোগী, মৃত্যু ১২ : গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ২ হাজার ৭১১ রোগী ও এই সময়ে মারা গেছে ১২ জন। এ নিয়ে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৫৭ হাজার ১২৭ জনে। তাদের মধ্যে মারা গেছে ২৭৩ জন। নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ১ হাজার ৫৮১ জনই ঢাকার বাইরের। আর ঢাকায় ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১৩০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৯ হাজার ৩২৫ রোগী ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় ৪ হাজার ৮৬৯ এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় ৪ হাজার ৪৫৬ জন।