পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। বরেণ্য অভিনেতা, নাট্যকার, সংগঠক ও আবৃত্তিশিল্পী। ছিলেন বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অভিনয়ের দ্যুতি ছড়িয়েছেন মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রে। অসাম্প্রদায়িক বিশ্ব মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সিইও এবং সুলেখক এই মহৎপ্রাণ এসেছিলেন দেশ রূপান্তরে। তাকে ঘিরে শুরু হলো জমজমাট আড্ডা। ছিলেন চিফ রিপোর্টার আশরাফুল হক, সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক আপেল মাহমুদ, ডিজিটাল টিমের প্রযোজক লিটু হাসান।
গ্রন্থনা : বিনোদন সম্পাদক মাসিদ রণ
আড্ডার শুরুতেই পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলে উঠলেন, এটা যেন প্রশ্ন-উত্তর না হয়। আমি একটি জম্পেশ আড্ডা দিতে এসেছি, আড্ডাই দেব। আড্ডার অন্য সঙ্গীরাও সে কথার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। কিন্তু আড্ডা শুরু করতে গেলে তো কিছু একটা প্রসঙ্গ লাগে। সেই প্রসঙ্গটাই যেন তুলে ধরলেন চিফ রিপোর্টার আশরাফুল হক।
তার প্রশ্ন, আপনি তো নানা পরিচয়ে পরিচিত। আপনার কাজের ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। তার মধ্যে কোন পরিচয়ে নিজেকে তুলে ধরতে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : আমি সব কাজেই আনন্দ পেয়েছি বলেই করেছি। তবে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই গুণীজনদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে। এই ঢাকা শহর একসময় আড্ডার মাধ্যমে ঋদ্ধ হয়েছে। কত রকমের যে আড্ডা হতো, কবিতার আড্ডা, গানের আড্ডা, সিনেমার আড্ডা, নাটকের আড্ডা, রাজনীতির আড্ডা। পুরনো ঢাকার বিখ্যাত বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডায় তো আমি এখনো যাই শুক্রবারে। যদিও যাওয়া কমিয়ে দিয়েছি। আমাদের সবার প্রিয় অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান চলে গেছেন। তার জন্যই আমার বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা জমত। শুটিং না থাকলেই ফোন করতেন, আমি চলে যেতাম। রসবোধের তো অভাব ছিল না লোকটার। তার সঙ্গে প্রচুর পড়াশোনা এবং জ্ঞানসম্পন্ন একজন মানুষ। ইসলাম ধর্ম নিয়ে তার যে স্বচ্ছ ধারণা সেটি আমাকেও মুগ্ধ করত। তিনি হাদিসের ব্যাখ্যাসহ নানা ধরনের কাজ করে গেছেন। যেটি অনেকেরই অজানা। যাই হোক, জীবনে এত গুণী মানুষের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হয়েছে, পাশে বসে শুধু গিলেছি তাদের কথাগুলো। যদি আমি কিছু শিখে থাকি, তার সবটাই সেই আড্ডা থেকে আর বই পড়ে। আড্ডাই আমাকে ঋদ্ধ করেছে। তবে এ সময়ে এসে মনে হয়, যে সমাজটার জন্য এত কাজ করলাম, সেই সমাজটাকে কোনোমতেই আমাদের পছন্দের সমাজ হিসেবে ধরে রাখতে পারিনি। এটা ভাবলে কাজের আনন্দ অনেকটাই কমে যায়। তার মানে এই নয় যে, আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যরে ভাষায় বলতে হয়, যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল। এটাই আমার ব্রত।
আশরাফুল হকের কৌতূহলী প্রশ্ন, আপনার এই আড্ডার ক্ষেত্র নিয়ে যদি বিস্তারিত বলেন...
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : আমার আড্ডার ক্ষেত্রের কোনো শেষ নেই! আমার অত্যন্ত পছন্দের সাহিত্যিক সমরেশ বসু, তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। তিনিও আমাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন। একদিন কথায় কথায় বললেন, আমি এক বাউলের কাছ থেকে শুনেছি, ‘আমার অথিক গুরু, বেথিক গুরু, গুরু অগণন’। কথাটি শুনে আমিও তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার মনে হলো, তাই তো, জাতীয় কবির ভাষায় আমার পাঠশালা তো বিশ্বজোড়া। আমার গুরুর শেষ নেই, সেই গুরুদের কেউ অথিক, কেউবা বেথিক। একজন ট্রাক ড্রাইভারও আমাকে অনেক সময় কিছু শিখিয়ে যেতে পারেন, আবার একজন সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, শওকত ওসমান, মাহমুদুল হক, বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ বা আরও যারা আছেন সবার কাছ থেকেই তো কিছু না কিছু শিখেছি। আবার আমার অনুুজ যারা, আমার সন্তানতুল্য তাদের কাছ থেকেও আমি শিখি। একটা উদাহরণ দিই, গত কয়েকদিন আগে আমার কন্যা বলল, ‘তুমি কি লাইফ অব পাই বইটা পড়েছ?’ আমি বললাম, ‘না, তবে সিনেমাটা দেখেছি’। ও বলল, তুমি যদি বইটা পড়ে সিনেমাটা দেখতে তাহলে আরও ভালো হতো। যাক গে, সিনেমাটা কেমন লাগল সেটাই বল। আমি উত্তর দিলাম, ‘অসম্ভব ভালো।’ ও বলল, শুধু এটুকু বললেই হবে না। বেঁচে থাকার জন্য মানুষ এবং হিংস্র পশুর মধ্যে বন্ধুত্ব, তাদের স্ট্রাগল কি অনবদ্যভাবে এসেছে ছবিটায়। এই যে আমার কন্যার কাছ থেকে শেখাটা, এটা তো কোনো দিন কেউ শেখায়নি। স্কুল-কলেজে আমরা শিখেছি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর। সেখান থেকে অনেক কিছু শিখেছি। যেমন ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর তার ধর্মচিন্তায় বলেছেন, চোখের সামনে মানুষ মরে যায়। ব্যাধি-জরায় উজাড় হয়ে যায় দেশ। সেই সমাজে বসে কিছু লোক ভগবান ভগবান করে। আমি সেই ভগবানে বিশ^াস করি না। আমার ভগবান এই মানুষদের মধ্যে, যারা ব্যাধি-জরায় মরে যাচ্ছে। আমার ভগবান এই মর্ত্যরে বাংলায়। আমি তাদের সেবা করব।
আগস্টে আড্ডা। অবধারিতভাবেই উঠে আসে এ মাসের শোকগাথা, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলজয়ন্তী। এ প্রসঙ্গে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আগস্ট আমাদের বাঙালির জন্য অত্যন্ত শোকাবহ একটি মাস। পৃথিবীতে আর কোনো দেশ নেই, যে দেশের পুরো একটি মাসই শোকের মাস হিসেবে পালিত হয়। এ মাসেই সপরিবারে আমাদের জাতির পিতাকে হারিয়েছি। ফলে এই আড্ডার শুরুতেই জাতির পিতা ও তার পরিবারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।
তাপস রায়হানের প্রশ্ন, আপনার ছোটবেলাটার কথা একটু জানতে চাই...
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : আমি জন্মেছি ফরিদপুরে। কিন্তু বড় হয়েছি গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর তো বটেই, আর ঢাকায়। ছোটবেলার কথা বলতে গেলে একটি কষ্টের স্মৃতি মনে পড়ে সবচেয়ে বেশি। ক্লাস টু-থ্রিতে পড়ার সময় আমার হুপিং কাশি হয়েছিল। এখন আরও অনেক ধরনের রোগ এসেছে, কিন্তু হুপিং কাশি আর হয় না। কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় এ ধরনের ছয়টি রোগে অনেক বাচ্চা মারা যেত। তো সেই রোগে আমাকে দেড়-দুই মাস গৃহবন্দি থাকতে হয়েছিল। আমাদের দোতলা একটি টিনের ঘর ছিল। আমি দোতলার জানালায় বসে থাকতাম। আমার বয়সী বাচ্চারা বাইরে খেলত, আমি চেয়ে চেয়ে দেখতাম। কিন্তু কারও সঙ্গে মিশতে পারতাম না। কারণ রোগটি ছিল খুবই ছোঁয়াচে। তখন এমন একটা নিঃসঙ্গতা আমার মধ্যে ভর করেছিল, যা বলার মতো নয়। জানালায় অপলক চেয়ে চেয়ে দুপুর থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে রাত হতে দেখতাম। সে সময় প্রচুর বাদুর উড়ে যেত। মনে মনে প্রশ্ন জাগত, এরা কোথায় যায়? মা বলতেন, যার যার বাসায় যাচ্ছে। বাস্তববাদী কথা আর কী! কিন্তু আমার ধারণা ছিল, এরা বোধহয় আকাশের মধ্যে ঢুকে যায়। তখন থেকেই আমার মধ্যে এক ধরনের ফ্যান্টাসি বা ভাবনার জগৎ খুলে যায়। এটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শৈশবেই কারও মধ্যে এই ভাবনার জগৎ তৈরি না হলে তার মধ্যে সৃষ্টিশীল কিছু করার প্রবণতা তৈরি হয় না। মানুষ একটি গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যায়। সেদিক দিয়ে আমি ভাগ্যবান। আমাদের বাড়িতে আবু ভাই নামে একজন কাজ করতেন। তিনি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। আমার যখন অসুখ হলো, আবু ভাই রাতে বাড়ি ফিরতেন না। উনি সারা রাত আমার ঘরে বসে নামাজ পড়তেন, আমার জন্য কাঁদতেন। বলতেন- ভাইটাকে আল্লাহ বাঁচায় দিও। আমি আবু ভাইকে জীবনে ভুলতে পারিনি। আর ভুলতে পারিনি বলেই আমার মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটেছে। পরিবার থেকেও এসেছে।
লিটু হাসান : কৈশোর-যৌবনের কোন স্মৃতি বেশি মনে পড়ে?
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাস করার কথা ছিল মাত্র সাড়ে ১৫ বছর বয়সে। তবে তা হয়নি, পাস করি এক বছর দেরিতে ১৯৬৭ সালে। সে আরেক গল্প। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল। তখন কলকাতা-গোয়ালন্দ ও কলকাতা-খুলনা ট্রেন যোগাযোগ ছিল। সেটি ওই যুদ্ধে বন্ধ হয়ে যায়। যা খুলল এসে শেখ হাসিনার সময়ে কিছু বছর আগে। আরেকটি জিনিস বন্ধ হয়ে যায়, ভারতবর্ষ থেকে সিনেমা আসা। ১৯৬৫-এর ৬ সেপ্টেম্বর যুদ্ধ লাগে, আমরা মায়ের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাই ৪ সেপ্টেম্বর। ওই যুদ্ধের জন্য আমরা সেখানে সাত মাস আটকে ছিলাম। এ জন্যই ১৯৬৬তে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বসতে পারিনি। তবে ওই কিশোর বয়সেই আমি কলকাতাকে চিনি ভালো করে। তখন দেখিছি আমি আড্ডাবাজি! দেখবেন, বাংলা সাহিত্যে অনেক জায়গায় লেখা আছে কলকাতার রকে আড্ডা মারার গল্প। সেই আড্ডাকে বলা হতো বখাটেদের আড্ডা। সেই আড্ডায় এমন কিছু নেই যা না আসত। আমাকেও সেই আড্ডা খুব টানত। এ জন্যই হয়তো পরবর্তী জীবনে আমি আড্ডা দিতে এত ভালোবাসি।
আপেল মাহমুদ : আপনার অভিনয়ের প্রতি টান এলো কীভাবে? এবং অভিনয় শুরুর গল্পটা কেমন ছিল?
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : আমি একজন ভালো দর্শক ছিলাম শুরু থেকেই। নাটক-সিনেমা দেখতে পছন্দ করতাম। মা গান গাইতেন, তিনি বিখ্যাত গুরুর কাছেই গান শিখেছিলেন। সেই গান শুনতে পছন্দ করতাম। এভাবেই নিজের মধ্যে সাংস্কৃতিক চর্চার প্রেষণা তৈরি হয়েছে। তবে ছোটবেলায় আমি খুব লাজুক ছিলাম। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে দরজার পেছনে লুকিয়ে থাকতাম। ক্লাসে আমার জানা প্রশ্নের উত্তর কখনোই দাঁড়িয়ে দিতে পারতাম না। ১৯৬৫ সালে স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক উৎসবে একটি নাটক করা হয়। সেই নাটকে ইবলিশ নামের একটি ভিলেনের চরিত্র ছিল। সেটির জন্য উপযুক্ত কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন নাটকের দায়িত্বে থাকা বাচ্চু মাস্টার আর বড় ক্লাসের ভাই মনসুরুল করিম (পরে তিনি বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হন) আমাকে সেই চরিত্রটি করতে বলেন। কারণ তখন বয়োসন্ধিকালীন আমি হঠাৎ করে বেশ লম্বা হয়ে গেছি। কিন্তু অভিনয়ের প্রস্তাব পাওয়ার পর আমি কিছুদিন লজ্জায় স্কুলে পর্যন্ত যাইনি। শেষমেশ আমাকে কাজটি করতে হয়। এবং সেটিই ছিল আমার প্রথম মঞ্চনাটক, অভিনয় যাই বলেন না কেন। এবং সেই থেকে আমার মুখচোরা স্বভাব একটু একটু করে কাটতে লাগল। কারণ আমি বুঝলাম মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বললে তা মানুষ শোনে, তার একটা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। এক ধরনের মোহ তৈরি হয়ে গেল। এরপর কলেজেও প্রচুর নাটক করেছি। আর ক্যামেরার সামনে প্রথম দাঁড়াই ১৯৭২ সালে টিভি নাটকের মাধ্যমে। তখন আমি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করি। বিটিভিতে ছাত্রদের জন্য সপ্তাহে এক ঘণ্টার একটি চাঙ্ক থাকত। সেখানে গান, নাচ, অভিনয়, আবৃত্তিসহ নানা ধরনের ট্যালেন্ট দেখানোর সুযোগ পেত ছাত্রছাত্রীরা। আমি সেই চাঙ্কেই প্রথম নাটক করি।
তাপস রায়হান আলো ফেললেন তার অভিনয় জীবনের দিকে। প্রসঙ্গ দেশের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আগামী’।
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : এই ছবিটা আমাকে সত্যি অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা দিয়েছিল। এই ছবিই বাংলাদেশের বাইরে আমার অভিনয়কে নিয়ে যাওয়ার একটা সুযোগ করে দিয়েছিল। ছবিটি প্রথমে দিল্লি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত হলো। এরপর বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা হিসেবে ডাক পেল কায়রো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল থেকে। তখন এরশাদের আমল। তার বিরুদ্ধে রাজপথে আমি সরাসরি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। আমি নিশ্চিত যে, অন্তত কায়রোতে যাওয়ার সুযোগ পাব না। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে আমন্ত্রণপত্র এলো আমার কাছে। চিত্রতারকা ববিতা, চিত্রপরিচালক রফিকুল বাহার চৌধুরী আর আমি গেলাম কায়রো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে। সরকারিভাবেই টিকিটের ব্যবস্থা হলো। সেখানে ২১ দিন ছিলাম, মিসরটাকে ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা হলো। সারা বিশ্বের অনেক নামকরা চলচ্চিত্রকারের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ হলো। সব মিলিয়ে আমি ‘আগামী’ সিনেমার কাছে কৃতজ্ঞ।
তাপস রায়হান : এরপর আপনি ‘একাত্তরের যিশু’ সিনেমাতে একজন ফাদারের চরিত্রে কাজ করেছেন। টিভি নাটক ‘সকাল সন্ধ্যা’তেও আপনি কাজ করেছেন। মঞ্চে তো আপনার অবাধ বিচরণ ছিল। মোট কথা নানা মাধ্যমেই বহুমাত্রিক চরিত্রে নিজেকে ভেঙেছেন। এটা কেমন লাগে?
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : একজন অভিনেতাই কেবল নিজেকে ভাঙেন না। একজন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ বা একজন সাহিত্যিকও নিজেকে নানাভাবে ভেঙে-গড়ে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন।
তাপস রায়হান : এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকতে আপনি সেন্সর বোর্ডের বদলে গ্রেডিং সিস্টেম করতে চেয়েছিলেন। সেটি কার্যকর হয়নি কেন?
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : সিনেমায় সেন্সর থাকবে কেন? পৃথিবীর উন্নত বিশ্বে গ্রেডিং সিস্টেমটাই চলছে। কিন্তু আমরা সেটা করতে পারলাম না, আসলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জন্য। ফাইল চালাচালি করতেই তো প্রচুর সময় নষ্ট হয়ে যায়।
আশরাফুক হক : আপনার গল্পে ঢাকা এবং কলকাতা দুই জায়গার কথাই উঠে এসেছে। তাই প্রসঙ্গক্রমেই জানতে ইচ্ছে করে, কলকাতার সাহিত্যিকদের লেখায় সেখানকার বিভিন্ন পথঘাট, রাস্তার কথা উল্লেখ আছে। যা পড়ে আমরা যেন কলকাতাকে আরও আপন করে ফেলি। কিন্তু বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের লেখায় তেমনটা পাই না কেন?
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : দারুণ একটা প্রসঙ্গ তুলেছেন। এটার উত্তর একটু দীর্ঘই হবে। প্রথমত, ১৯৪৭-এর দেশভাগ আমাদের ওপর দারুণভাবে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঙালি। যেসব সাহিত্যিকের কথা আমরা এ প্রসঙ্গে বলতে পারি তাদের বেশির ভাগই কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকেই পশ্চিমবঙ্গে দেশ ভাগের জন্য চলে গেছেন। আমার শহরের কথা শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, মাহমুদুল হকের কিছু সাহিত্যে রয়েছে। কিন্তু খুব কম। আরেকটি কারণ হতে পারে, আমরা খুবই সেলফ সেন্সরড। আমরা নিজেদের অনুভূতির সবটা খুলে বলি না। রবীন্দ্রনাথও অনেকটাই প্রাণখোলা, যদিও কিছু কিছু জায়গায় তিনি রাখঢাক রেখেই লিখেছেন। পাশাপাশি শহরকে ভালোবাসার যে মধ্যবিত্ত মানসিকতা সেটাও অনেকটা দায়ী। তার সঙ্গে যদি ধর্মীয় লেবাসটা একটু শক্ত-পোক্ত হয় তাহলে তো কোনো কথাই আর নির্ভীকভাবে উঠে আসে না।
তাপস রায়হান : ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ নাটকে আপনি বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা নাটকটি করি। ২০০৪ সালে আমরা নাটকটি করি লন্ডনে। আপনারা জানেন, তখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ছিল না। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যার নেপথ্যের সত্যি ঘটনা নিয়ে নাটক করা দুর্দান্ত সাহসিকতার ব্যাপার ছিল। নাটকটি আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী লিখেছিলেন। লন্ডনে নাটকটির মঞ্চায়ন বন্ধ করার জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্র করা হয়। আমাকে, গাফ্্ফার চৌধুরী ও যারা নাটকটির উদ্যোক্তা তাদেরও নানা ধরনের লোভ দেখানো হলো, বাধাও দেওয়া হলো। তখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা ও সৈয়দ আশরাফ লন্ডনেই থাকতেন। পরে তিনি মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। একদিন আমরা রিহার্সেল করছি, সেদিন শেখ রেহানা সেটি দেখতে এসে ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। সৈয়দ আশরাফ একটু পর হন্তদন্ত হয়ে এসেই বলেন, আপনারা রিহার্সেল করে কেউ বাইরে যাবেন না আমি না বলা পর্যন্ত। সেদিন সৈয়দ আশরাফ আমাকে তার গাড়িতে অন্য এক জায়গায় নিয়ে গেলেন এবং বললেন, আমি না এলে আপনি বের হবেন না। পরে জানা গেল, আমরা সেখানে থাকলে ওইদিনই আমাদের ওপর হামলা করা হতো। লন্ডন পুলিশ সৈয়দ আশরাফকে বলেছিলেন, এখানে যে বঙ্গবন্ধুর ওপর নাটকটি হচ্ছে সেখানে প্রধান চরিত্রের অভিনেতাকে (অর্থাৎ আমাকে) খোলা রাস্তায় হাঁটাচলা করতে নিষেধ করুন। নয়তো তার ক্ষতি হতে পারে। যাতে তিনি আর নাটকটি করতে না পারেন! আমি কৃতজ্ঞ সৈয়দ আশরাফের ওপর। তার কারণেই আমরা লন্ডনে নাটকটির সফল মঞ্চায়ন করতে পারি। হাজার হাজার মানুষ নাটকটি দেখেন ও আমাদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। সেই সুনাম ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশে। আমরা নানা দেশ থেকে ডাক পেতে থাকি নাটকটি করার জন্য। পরে সেই নাটকটি থেকেই একটু ডকুমেন্টারি ফিল্ম করা হয়।
তাপস রায়হান : নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে আপনার কোনো কথা আছে ?
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় : একটাই কথা। আমি বাঙালি, বাংলাদেশ আমার মাতৃভূমি, বাংলা ভাষা আমার ভাষা। এটা বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন, আমিও মনেপ্রাণে তা বিশ্বাস করি, নিজের মধ্যে ধারণ করি, লালন করি। এ দেশটা রাজাকারের নয়, মৌলবাদের নয়, জঙ্গিবাদের নয়। আমরা হাজারো বাধা পেরিয়ে আজকের এই অবস্থায় এসেছি। আমি চাই পরবর্তী প্রজন্মও আমাদের হাজার বছরের বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ধারণ ও লালন করবে। এক সময় গ্রাম থিয়েটার করেছি, এখন সম্প্রীতির বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন করি, যেটির আহ্বায়ক আমি। সেখানেও তরুণদের আমি চর্যাপদের একটি কথাই বলি, ‘সবার ওপর মানুষ সত্য’। সেখানে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাত, পাতের কোনো বৈষম্য করা চলবে না।