নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে সমঝোতা-মধ্যস্থতা ও সংলাপের উদ্যোগ নিয়ে বহুবার দৃশ্যপটে এসেছেন বিদেশিরা। তাদের তৎপরতায় সরকারি দল ও বিরোধী দল এক টেবিলেও বসেছে। সেসব বৈঠকে বিদেশি প্রতিনিধিদের উপস্থিতিও ছিল। কিন্তু এসব সংলাপে সংকট নিরসনের দৃষ্টান্ত নেই। তবুও রাজনীতিতে সংলাপের আবেদন রয়েছে। যে কারণে আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়েও দেশি-বিদেশি প্রায় সব মহলই সংলাপের পরামর্শ দিয়ে চলেছে সরকারে থাকা আওয়ামী লীগকে। মাঠের বিরোধী দল বিএনপির প্রতিও সংলাপের পরামর্শ রয়েছে তাদের।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। বৈঠক শেষে ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ‘আমাদের ওপর কোনো চাপ নেই।’
তবে বৈঠকে উপস্থিত থাকা ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিটার হাস আবারও সংলাপের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলের ভেতরে সৃষ্টি হওয়া দূরত্ব দূর করা সম্ভব।’ ওই নেতা দাবি করেন, আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা পিটার হাসকে জানিয়েছেন যে, আগে শর্ত দেওয়া হলে সংলাপে বসে কোনো সমাধানই আসবে না।
বৈঠক শেষে পিটার হাস সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিরসন করতে হবে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই। তার দেশ শুরু থেকেই বলে আসছে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট চায়।
বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের আরেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা দূর করতে বৈঠকের এক পর্যায়ে পিটার হাস আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া পিটার হাসের বক্তব্যেও তার প্রতিফলন আছে বলে দাবি করেন এই নেতা।
চলমান রাজনৈতিক সংকট দূর করে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিদেশি বন্ধুরা এখন অনেকখানি চাপে রেখেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্র ভিসানীতি ঘোষণা করেই থেমে নেই, দেশটির প্রতিনিধিরা ঘন ঘন সফরে আসছেন। রাষ্ট্রদূত পিটার হাস প্রায় নিয়মিত দুই দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে আসছে। তাদের কূটনীতিকরাও দুই দলের সঙ্গে কথা বলছেন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সংলাপের অবদান না থাকলেও সব সময়ই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই গুরুত্ব এখনো রয়েছে।
দুই দলের শীর্ষ দুই নেতা বলেন, সংলাপের ব্যাপারটি এখন পরামর্শের পর্যায়ে আর নেই, চাপের পর্যায়ে চলে গেছে। সমাধান আসুক, না আসুক আগে-পরে সংলাপ হতে হবে। তবে সংলাপের সফলতা কেউ আশা করছেন না।
এরকম রাজনৈতিক সংকট সমাধানে ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকায় এসেছিলেন তখনকার কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টেফান। তখন বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতা ধরে পাঁয়তারার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আন্দোলন তুঙ্গে। কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত হয়ে ঢাকা সফরে আসা অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান স্টেফান দুই দলের অবস্থান জানতে চান। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে আলোচনার টেবিলে বসান। শেষ পর্যন্ত তাতে কোনো সমাধান আসেনি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। আন্দোলন অব্যাহত রেখে রাজপথ দখলে রাখে আওয়ামী লীগ। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের আওয়ামী লীগের দাবি মেনে নিয়ে ২৮ দিন পরে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় বিএনপি। ওই বছরের জুলাইয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।
পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করে ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। সেটাই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের একমাত্র দৃষ্টান্ত। ওই বছর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আবার রাজনীতিতে অস্থিরতা দেখা দেয়। গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন কার্টার সেন্টারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেডিডেন্ট জিমি কার্টার বাংলাদেশে আসেন। তিনি সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন এবং পরামর্শ দেন। ওই সময় তার দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় অন্তরায় দুই প্রধান দলের মধ্যে বৈরিতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মতভেদ ও হানাহানি।
২০০৬ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে তাদের চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার আগে ২০০৪ সালে সংবিধানে একটি সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের চাকরির বয়স বাড়ানো সংক্রান্ত একটি সিদ্ধান্ত কাল হয়ে দাঁড়ায়। বিএনপি ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টায় নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করতেই এমন সংশোধনী এনেছে দাবি করে আওয়ামী লীগ আন্দোলন শুরু করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্কিত হয় তখন। সবকিছু উপেক্ষা করে তখনকার রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হয়। ওই সময় যে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয় তার পরিণতিতে রাজপথে দুপক্ষের মধ্যে সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সংকট নিরসনে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা। ওই সময়ে বাংলাদেশে বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। তখন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন প্যাট্রেসিয়া বিউটেনিস। ২০০৬ সালের শেষ দিকে এবং ২০০৭ সালের প্রথম দিকে ঢাকায় নিযুক্ত পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকরা ছিলেন বেশ তৎপর। উইকিলিকসে প্রকাশিত মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া বিউটেনিসের গোপন তারবার্তা থেকে জানা যায়, ঢাকায় পশ্চিমা কূটনীতিকরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য নিজেদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক করতেন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘কফি গ্রুপ’। এ কফি গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও জাতিসংঘের প্রতিনিধি সম্পৃক্ত ছিলেন।
২০০৭ সালের ৪ জুন দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস বলেছিলেন, পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে ওই বছরের ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। ২০০৮ সালে নির্বাচন দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিদায় নেয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসে। পরে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে।
২০১৩ সালে নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও বিরোধী অন্যান্য দল আন্দোলনে নামে। ওই সময় ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সংকট সমাধানে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুনের দূত হয়ে ঢাকায় আসেন সংস্থার সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অস্কার ফার্নান্দেজ-তারানকো। দুপক্ষকে নিয়ে আলোচনা বসলেও কোনো সমাধান আসেনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। জাতীয় পার্টি বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় আসেন ভারতের তখনকার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। তার সঙ্গে আলোচনার পর দলটি নির্বাচনে অংশ নেয়।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে থেকে বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলো সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা তুলে ধরে। তখন পশ্চিমা দেশগুলোর দূতরা বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের এই সময়ে বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা সংলাপের চাপ দিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে এক টেবিলে বসায়। কিন্তু নির্বাচনের পর ফল প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি। যদিও পরে তারা সংসদে যোগ দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৯৯০ সালে এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনের পর দেশে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে শুরু করে। যদিও কখনো কখনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে। কিন্তু সেই বাধা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। রাজনৈতিক সরকারই দেশ পরিচালনা করছে লম্বা সময় ধরে।
তারা বলেন, রাজনৈতিক সরকারগুলোর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতার কারণে মাঝে মাঝে হোঁচট খেয়েছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এতে করে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। আর গণতন্ত্র, মানবাধিকার হুমকির মুখে দাবি করে বিদেশিরা হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের দৌড়ঝাঁপ বেড়ে যায়। ক্ষমতার চেয়ারে বসতে বিদেশিদের নিয়ামক শক্তি মনে করে সব রাজনৈতিক দল। তাই ক্ষমতা বদলের নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই অভ্যন্তরীণ বিষয়েও নাক গলানো শুরু হয় বিদেশিদের। এই সুযোগে বিদেশিরা তাদের সুবিধা বুঝে কখনো একটি দলকে উসকায়, কখনো দূরত্ব ঘোচাতে এগিয়ে আসে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে বরাবরই বিরোধী দলগুলোকে দেখা যায় নানা ঘটনায় তাদের দ্বারস্থ হতে। আবার এসব দলই আবার ক্ষমতায় গেলে কূটনীতিকদের সবসময় কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে থাকে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সময় এসেছে যেকোনো রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দেশীয় সমাধান লাগবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরামর্শ জানালে স্বাগত জানাব। কিন্তু পরামর্শ, সহযোগিতা ও সৌহার্দ্য জানানোর ভেতরে কোনো কিন্তু থাকলে সেটা স্বাগত জানানোর মতো নয়।’