সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সময়মতো তথ্য প্রকাশ, তথ্য পাওয়ার পর তা লুকানোর চেষ্টা বা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য চেপে রাখার কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে, যা অনেক ব্যাংকিং কোম্পানিকে দেওলিয়াত্বের পথে ঠেলে দিয়েছে।
নিকট অতীতে দেশে তথ্য অধিকার সঠিকভাবে পূরণ না হওয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এ দুর্নীতি-অনিয়মে ও জনস্বাস্থ্যে বিপর্যয়ের মতো একাধিক ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে ইচ্ছাকৃত তথ্য চেপে রাখার কারণে ভারতের ভোপালে বিষাক্ত গ্যাস, ব্রাজিলের খনি বাঁধ, যুক্তরাজ্যের ফ্লিন্ট শহরে সিসাদূষিত পানি, চীনে সিচুয়ানের স্কুল ভবনে দুর্ঘটনা ও যুক্তরাজ্যের পোস্ট অফিসে হরাইজন কেলেঙ্কারির মতো ঘটনাগুলোয় ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় হয়েছিল।
আজ ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব তথ্য অধিকার দিবস দেশে দেশে নাগরিকের সুরক্ষার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রকে তথ্যপ্রাপ্তি, প্রকাশ ও যুক্তিপূর্ণ ব্যবহারের অভাবে সৃষ্ট ক্ষতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশ সরকার বিশ্ব তথ্য অধিকার দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘ডিজিটাল যুগে সঠিক তথ্য নিশ্চিতকরণ : অপতথ্য রোধে তথ্য অধিকারের ভূমিকা।’ সময় বহু পথ অতিক্রম করে এখন ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। এ কারণে তথ্য ঘাটতিতে অপতথ্য বা ভুয়া তথ্য তৈরি হওয়া ও তার প্রচার বেড়েছে। এ সময়ে একটি তথ্য যেমন রাষ্ট্র, ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে তেমনি সঠিক তথ্যের অভাবে সৃষ্ট অপতথ্য চরম বিরূপ প্রভাবের জন্ম দিতে পারে।
এমনি চ্যালেঞ্জিং সময়ে তথ্য অধিকার নিশ্চিত করতে সৃষ্ট বাংলাদেশ তথ্য কমিশন গত ২ বছর ধরে অচল। বর্তমান সরকার দেরিতে হলেও তথ্য কমিশন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়ে পুনরায় এই প্রতিষ্ঠানটিকে সচল করার কাজে হাত দিলেও এখন পর্যন্ত তা হয়ে উঠেনি। এ ব্যাপারে একটি সার্চ কমিটি কাজ করছে।
তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী গত ২১ সেপ্টেম্বর তার দপ্তরে এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি দেখছি। সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হয়।’
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি, এমপি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তথ্য একটি দেশের প্রাণ। এর সুনির্দিষ্ট, যথাযথ ও সঠিক ব্যবহার না হলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র প্রত্যেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিশ্চয়ই সজাগ রয়েছেন। সরকারের কাছে তথ্য অধিকার সুনিশ্চিত করার দাবি আমারও রয়েছে। ’
তথ্য কমিশনে ৮৫০ অভিযোগ : জানা গেছে, তথ্য কমিশনে গত ২ বছরে বিভিন্ন কর্র্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চেয়ে না পাওয়ার প্রায় ৮৫০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। কমিশন সচল থাকলে সব অভিযোগের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা যেত। কমিশন সচল না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। নাগরিক তথ্য চেয়ে না পেয়ে বিচার পায়নি। ইউনেস্কোর রাইট টু ইনফরমেশন (আরটিআই) র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ২০২৩ সালের হিসেবে ১৪১ দেশের মধ্যে ২৭তম অবস্থানে ছিল। গত ২ বছরে তথ্য কমিশনের কোনো কাজ হয়নি বিধায় ওই র্যাঙ্কিংয়ে বড় পতনের শঙ্কা রয়েছে।
ইউনেস্কোর গবেষণায় বলা হয়েছে আইন থাকা আর বাস্তবে তথ্য পাওয়া এক নয়। তথ্য কমিশনের স্বাধীনতা, আপিলের সুযোগ, সরকারি দপ্তরের তথ্য সংরক্ষণ, সময়মতো উত্তর দেওয়া এবং স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ এসবের ওপর বাস্তব ফল নির্ভর করে।
বাংলাদেশ সরকার বিগত দেড় দশক সময়ে ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত ঋণজালিয়াতির মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকের সঞ্চিত আমানত লুটপাটকারীদের তথ্য পেয়েও তা চেপে রেখে এবং লুটপাট প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ওই অর্থ বিদেশে পাচারের প্রমাণ পেয়েছে সরকারের একাধিক সংস্থা।
এর আগে বাংলাদেশের আর্সেনিক সংকট এবং ১৯৫৬ সালে জাপানের মিনামাতা দূষণ ও প্রাণহানির সঙ্গে মিথাইলমারকারির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা দুটি ঘটনাতেই দেখা গেছে, দূষণের উৎস শনাক্ত, পরীক্ষা ও জনসাধারণকে সতর্ক করার মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকায় অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। লন্ডনের ব্রড স্ট্রিটে ১৮৫৪ সালের কলেরা মহামারিতে চিকিৎসক জন স্নো রোগীদের মৃত্যুর ঠিকানা মানচিত্রে চিহ্নিত করে দেখেছিলেন মৃত্যু একটি পানির পাম্পের আশপাশে বেশি। দূষিত পানি রোগ ছড়ানোর উৎস হতে পারে এই পর্যবেক্ষণ জনস্বাস্থ্য কর্র্তৃপক্ষের পদক্ষেপকে প্রভাবিত করে। ঘটনাটি পরে রোগের বিস্তার অনুসন্ধানে তথ্য ও ভূগোল ব্যবহারের ঐতিহাসিক উদাহরণ হয়ে ওঠে। তবে গবেষকরা মনে করেন, শুধু পাম্পের হাতল খুলে দেওয়ার পরই মহামারি শেষ হয়েছিল এমন প্রচলিত বর্ণনা অতি সরলীকৃত। সঠিক সময়ে তথ্য আবিষ্কার ও প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হলে কিংবা তথ্য সময়মতো মানুষের হাতে পৌঁছালে বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব হতো বলে গবেষণায় বলা হয়েছে।
তথ্য লুকালে ন্যায়বিচার দুর্বল হয় : যুক্তরাজ্যের পোস্ট অফিসে হরাইজন কেলেঙ্কারি দেখিয়েছে প্রযুক্তিগত তথ্যের অস্বচ্ছতার পরিণতি কতটা গুরুতর হতে পারে। কম্পিউটার হিসাবের ঘাটতির ভিত্তিতে বহু সাব-পোস্টমাস্টারের বিরুদ্ধে চুরি ও জালিয়াতির মামলা হয়। পরে সফটওয়্যারের নির্ভরযোগ্যতা, তদন্তের ব্যর্থতা এবং তথ্য প্রকাশ না করা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। পরে গবেষণায় বলা হয়, তদন্তে তথ্য গোপন করা হলে ভুল মানুষও আসামি হতে পারে। ফৌজদারি তদন্তে ঘটনাস্থল, সাক্ষ্য, আলামত, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ভিডিও, কল রেকর্ড ও তদন্তের নথি সবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্যের কোনো অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া, নষ্ট করা বা তদন্তের বাইরে রাখা হলে তার প্রভাব আদালত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
শিল্প ও খনি বিপর্যয়ে তথ্যের মূল্য জীবন : ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনায় হাসপাতালগুলোতে আহত বিপুলসংখ্যক মানুষ ভর্তি হন। বিষাক্ত গ্যাসের পরিচয় ও চিকিৎসাগত প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও সময়োপযোগী তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ চিকিৎসা ব্যবস্থাকে জটিল করেছিল। পরে একাধিক গবেষণায় বলা হয়েছে রাসায়নিক দুর্ঘটনায় ঝুঁকি ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছানো জরুরি ছিল; কিন্তু তা করা হয়নি।
ব্রাজিলের ব্রুমাদিনহোতে ২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি খনিবাঁধ ধসে সরকারি হিসাবে ২৭২ জন মারা যান। গবেষণায় জরুরি সতর্কবার্তা কার্যকর না হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। অর্থাৎ, ঝুঁকি মূল্যায়ন শুধু কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নথিতে থাকলে হয় না; শ্রমিক, স্থানীয় মানুষ ও উদ্ধারকারী সংস্থার কাছেও তা পৌঁছাতে হয়।
শিশু সুরক্ষায়ও তথ্য একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা : ২০০৮ সালের চীনের সিচুয়ান ভূমিকম্পে স্কুল ভবন ধসে বহু শিশুর মৃত্যু হয়। পরে নির্মাণমান, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও সম্ভাব্য অনিয়ম নিয়ে অভিভাবকদের প্রশ্ন ওঠে। নির্মাণের নকশা, অনুমোদন, নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও তদন্তের তথ্য প্রকাশ না হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মানবিক বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সম্পর্ক নির্ণয় কঠিন হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্র ও পুলিশের দায় : বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭২ ধারায় তদন্তের কার্যক্রম নথিভুক্ত করার বিধান রয়েছে; ১৭৩ ধারায় তদন্ত অযথা বিলম্ব না করে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে তথ্য অধিকার মানে তদন্ত চলাকালে প্রতিটি গোপন তথ্য প্রকাশ করে দেওয়া নয়। সাক্ষীর নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, জাতীয় নিরাপত্তা বা ন্যায়বিচারের স্বার্থে বৈধ সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। মূল বিষয় হলো গোপনীয়তার বৈধ কারণ আছে, নাকি গোপনীয়তার আড়ালে জবাবদিহি এড়ানো হচ্ছে?
মানবাধিকারকর্মীরা বলে আসছেন, রাষ্ট্রের কাছে তথ্য থাকা যথেষ্ট নয়। তথ্যকে হতে হবে নির্ভুল, সময়োপযোগী, যাচাইযোগ্য, বোধগম্য ও ব্যবহারযোগ্য। পুলিশের ক্ষেত্রে দায় আরও স্পষ্ট। তদন্তের নথি সংরক্ষণ, আলামতের অখণ্ডতা, ফরেনসিক তথ্য, সাক্ষ্য এবং তদন্তের সময়সীমা নিশ্চিত করা জরুরি। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো গুরুত্বপূর্ণ জননিরাপত্তার তথ্য স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশ করা, তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বৈধ কারণ ছাড়া তথ্য আটকে না রাখা। কারণ, তথ্যের অধিকার শুধু কোনো সরকারি ফাইলের কপি পাওয়ার অধিকার নয়। এটি জীবন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, শিশু সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের সঙ্গে যুক্ত অধিকার।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনগত বাধ্যবাধতা উপেক্ষা করে দীর্ঘ ২ বছর ২ মাস তথ্য কমিশন গঠনে ব্যর্থতার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত পর পর দুটি সরকার দেশের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর এক বিরল বিশ্বরেকর্ড গড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এমনিতেই আইনের শাসনের মানদ-ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হলো সরকার কর্তৃক সরাসরি আইন অমান্যের ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত, যার দায় অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি বর্তমান নির্বাচিত সরকারের।’ ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার উপেক্ষা করে ৭ মাস ধরে তথ্য কমিশন অকার্যকর করে রেখে সরকার যে বার্তা দিচ্ছে তা হলো, সরকার তথ্যের উন্মুক্ততার পরিবর্তে গোপনীয়তার সংস্কৃতি ধারণ করে দুর্নীতিসহায়ক পরিবেশে জবাবদিহিহীনভাবে সরকার পরিচালনার পথ বেছে নিয়েছে। এর ফলে সরকার মানুষের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার হরন করছে, নিজেকে জনবিচ্ছিন্নতার পথে ধাবিত করছে, যা একান্তই আত্মঘাতী।’