রাজধানীর ফুসফুসে চাপএলিভেটেডের

ভরাটে হাতিরঝিলের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত পয়ঃবর্জ্যে বেড়েছে দূষণ

লেকে ২০ পিলার নির্মাণ, আরও কাজ চলছে

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৪ এএম

কথা ছিল প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে হাতিরঝিল লেক। সেই লক্ষ্যে ঢাকার বুকে বিগত সরকার দুই হাজার কোটি টাকা খরচ করে লেকটির উন্নয়ন করেছে। কিন্তু সরকারেরই আরেক মেগাপ্রকল্প ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’র কারণে ঢাকার ‘ফুসফুস’খ্যাত লেকটি হাঁসফাঁস করছে। এ কারণে লেকের আয়তন কমে গেছে, পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; জলাবদ্ধতাসহ পরিবেশের নানা সংকট দেখা দিয়েছে।

সরকারের দখলদারির সঙ্গে দূষণে যুক্ত হয়েছেন নাগরিকরাও। হাতিরঝিলের বিভিন্ন অংশে থাকা নালা দিয়ে পয়ঃবর্জ্য ও নোংরা পানি মিশছে লেকে। ফলে পানি কালচে হয়ে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। মাছ মরে ভেসে ওঠার ঘটনাও ঘটেছে। বেশি ভোগান্তি তৈরি হয়েছে সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের অংশের সংলগ্ন এলাকাসমূহে। পাঁচতারকা হোটেলটিতে দেশি-বিদেশি অতিথিদের যাতায়াত। এটির পেছনের ঝিলের নোংরা পানি ও বর্জ্যরে দুর্গন্ধ নগরের পরিবেশ-পরিস্থিতির অসহনীয় অবস্থাই প্রকাশ করছে।

হাতিরঝিলের সংকটের মধ্যে নতুন চাপ তৈরি করেছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। এক্সপ্রেসওয়ের সোনারগাঁও লিংক র‌্যাম্পের কাজের জন্য হাতিরঝিলের ইস্কাটন অংশে পিলার বসানো হচ্ছে। পাইলিংয়ের জন্য লেক বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, কারওয়ানবাজারের রেললাইন থেকে ইস্কাটনের বিয়াম ফাউন্ডেশনের গেট পর্যন্ত অংশে বালু ফেলা হয়েছে। ঝিলের সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের অংশও ভরাট করা হয়েছে। পিলারগুলো দৃশ্যমান হয়েছে। দুই পিলারের মাঝে গার্ডার বসিয়ে সংযোগ তৈরি করা হয়েছে। কুতুবখালীমুখী একটি লাইন তৈরির জন্য লেকের মগবাজার অংশও ভরাট করা হয়েছে। কারওয়ানবাজার থেকে ইস্কাটন হয়ে পান্থকুঞ্জ পার্ক পর্যন্ত অপর লাইনটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করছে সেতু বিভাগ। ২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারি পিপিপির ভিত্তিতে বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের চুক্তি হয়। নির্মাণকাজের উদ্বোধন হয় ওই বছরের ৩০ এপ্রিল। মূল পরিকল্পনায় হাতিরঝিলের ওপর দিয়ে সংযোগ র‌্যাম্প ছিল না, পরে এ অংশ যুক্ত হয়েছে।

ইতিমধ্যে বিমানবন্দর থেকে বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট ও হাতিরঝিলের বিএফডিসি পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে চালু হয়েছে। মূল পরিকল্পনায় কুতুবখালী পর্যন্ত উড়ালসড়ক হওয়ার কথা রয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ৭৭ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

২০২৩ সালে রাজউকের সঙ্গে আলোচনা করে হাতিরঝিল এলাকায় ৪০৭ থেকে ৪১৮ নম্বর পিয়ারের পাইল ড্রাইভিং শুরু হয়। হাতিরঝিলে ২০টির মতো পিলার বসানো হয়েছে। আরও ২১টি পিলার বসানো হতে পারে।

প্রকল্প পরিচালক মো. গোলাম মর্তুজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উন্নয়নকাজের জন্য কিছু অংশ ভরাট করা হয়েছে। কাজ শেষে হাতিরঝিলকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে।’

২০২৩ সালে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সমন্বয় কমিটির সভায় রাজউক জানিয়েছিল, এক্সপ্রেসওয়ের ৪১ পিলার হাতিরঝিলের সৌন্দর্য নষ্ট করবে। তারা হাতিরঝিল বাদ দিয়ে বিকল্প রুট বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছিল। বিষয়টি তখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। রাজউক জানিয়েছিল, পিলার নির্মাণের জন্য মৌখিকভাবে ছয় মাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে ভরাটের অনুমতি দেওয়া হয়নি।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই এমনকি নকশা করার আগেও আমাদের জানানো হয়নি। সবকিছু চূড়ান্ত করে তারা অনুমোদন চেয়েছে। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় এখানে পিলার না বসাতে আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। পরে সরকারের বৃহৎ পরিকল্পনা বিবেচনায় আমরা অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছি।’

দুই হাজার কোটি টাকার প্রকল্পেও রক্ষা হচ্ছে না জলাধার

হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৪৭৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৩৬ কোটি টাকায়।

এত বড় ব্যয়ে গড়ে ওঠা হাতিরঝিলের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জলাধার সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নগরবাসীর জন্য একটি নান্দনিক ও উন্মুক্ত পরিসর তৈরি করা। অথচ সেই জলাধারেরই একাংশে পরে আরেক সরকারি অবকাঠামো-প্রকল্পের কাজে বালু ফেলে ভরাট করতে হয়েছে। যে হাতিরঝিলকে ঢাকার পরিবেশ ও সৌন্দর্যের অন্যতম প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, সেই হাতিরঝিলেই এখন একদিকে ভরাটের চাপ, অন্যদিকে ভয়াবহ দূষণ।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও পরিবেশ আন্দোলনের নেত্রী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের কাছে পরিবেশবাদীদের আশা ছিল হাতিরঝিল রক্ষায় তিনি ভূমিকা রাখবেন। ওই সরকারের প্রথম ছয় মাস প্রকল্পের কাজ বন্ধও ছিল। তারপর আবার শুরু হয় হাতিরঝিল ভরাটের কাজ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ‘অন্য দেশ বা বাইরের কোনো কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিগুলো খুবই ক্রিটিক্যাল। আমাদের সমস্যার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ করতে না পারলে আমাদের জরিমানা দিতে হতো। আবার তাদের সমস্যার কারণে দেরি হলে তারাও জরিমানা দেবে। এসব বিবেচনায় তৎকালীন উপদেষ্টা এ বিষয়ে নমনীয় হয়েছিলেন।

মাছ মরে ভেসে ওঠে : পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোনারগাঁওয়ের পেছনের অংশে দূষিত পানি আটকে থাকছে। ওই এলাকায় বর্জ্য জমে থাকা এবং পানির দুর্গন্ধের পাশাপাশি মাছ মরে ভেসে ওঠার ঘটনাও ঘটেছে। বছর দুয়েক আগে সোনারগাঁওয়ের পেছনের অংশে শত শত মাছ মরে ভেসে ওঠে। পরে রাজউকের কর্মীরা মৃত মাছ সরিয়ে মাটিচাপা দেন। ভরাটের কারণে ওই অংশের পানির আলাদা হয়ে পড়া এবং বর্জ্য জমে যাওয়াকে এ জন্য দায়ী করেছিলেন পরিবেশবাদীরা।

তাদের মতে, লেক ভরাটের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দূষিত পানির গুণগত মান আরও খারাপ হওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধও বাড়ে। হাতিরঝিলের সোনারগাঁও অংশে এ পরিস্থিতির কারণে দূষণ বাড়ছে বলে মনে করছেন তারা।

এ ব্যাপারে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টসহ (আইপিডি) পরিবেশবাদী নানা সংগঠন আপত্তি জানিয়েছে। ভরাট করে ৪১ পিলার নির্মাণের ফলে জলাধারের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সবার অভিমতকে অগ্রাহ্য করে লেক ভরাট করে তৈরি হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।

পয়ঃবর্জ্যে কালোপানি : হাতিরঝিলের দূষণের জন্য শুধু লেক ভরাটই দায়ী নয়; নাগরিকরাও দূষণের কোলে ঠেলে দিচ্ছে লেকটিকে। আশপাশের বিভিন্ন এলাকার নোংরা পানি ও পয়ঃবর্জ্যও বছরের পর বছর ধরে ঝিলে ঢুকছে। পান্থপথ, তেজগাঁও, মগবাজারসহ আশপাশের এলাকা থেকে নালা ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার মাধ্যমে বর্জ্য হাতিরঝিলে প্রবেশ করে। এসব বর্জ্যরে সঙ্গে পচা আবর্জনা ও অন্যান্য দূষিত পদার্থও লেকে জমা হয়। ফলে পানির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। হাতিরঝিলের বর্তমান সংকটের দুটি দিক স্পষ্ট একদিকে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য লেকের অংশ ভরাট করে পানিপ্রবাহে বাধা, অন্যদিকে বিভিন্ন উৎসের পয়ঃবর্জ্য ও নোংরা পানি লেকে ঢুকে দূষণ বাড়াচ্ছে।

৪৯ কোটি টাকার প্রকল্পেও কাটেনি দূষণ : হাতিরঝিলের দূষিত পানি শোধনের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছে সরকার। ২০১৮ সালে ‘হাতিরঝিল লেকের দূষিত পানি পরিশোধন’ প্রকল্পে ৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় রাজউক।

পানি শোধনের উদ্যোগ নেওয়ার পরও দূষণের মূল উৎসগুলো পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। ছোট ছোট নালা দিয়ে স্যুয়ারেজের পানি ও পচা আবর্জনা লেকে ঢুকেছে। পানি শোধনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নতুন করে দূষিত পানি প্রবেশ করায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

হাতিরঝিলে শুধু পানি শোধনের উদ্যোগই নেওয়া হয়নি, বিভিন্ন সময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও হয়েছে। কিন্তু দূষণের উৎস বন্ধ না হওয়ায় কিছুদিন পরপরই আবার একই ধরনের সমস্যা ফিরে আসছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে লেকটি পরিষ্কার করে রাজউক। এ কার্যক্রম স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম তত্ত্বাবধান করেছেন।

রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘আমরা লেকের সৌন্দর্য রক্ষা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি এখানের পরিবেশ ঠিক রাখার জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার খাল ও লেকের জন্য প্রধানমন্ত্রী নিজে উদ্যোগ নিয়েছেন। একাধিক কমিটি করা হয়েছে। লেকের উন্নয়নে বেশ কয়েকটি কাজের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত