বাংলাদেশে বিরোধী দলের সমাবেশে পুলিশের ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের’ ঘটনা ঘটলে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশন। সম্প্রতি বিরোধী দলের সমাবেশ ঘিরে সহিংসতার কথা তুলে জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের মুখপাত্র জেরেমি লরেন্স গতকাল শুক্রবার জেনেভায় এক ব্রিফিংয়ে এ আহ্বান জানান। কমিশন তাদের ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত প্রেস নোটটি প্রকাশ করেছে।
এদিকে বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের ওপর অবিলম্বে বেআইনি ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গত ২৮ ও ২৯ জুলাই বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল আয়োজিত কর্মসূচিতে বিক্ষোভকারী ও বিরোধী দলের নেতাদের ওপর সহিংস আক্রমণের খবর যাচাই করার পর এই আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থাটি। গতকাল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের মুখপাত্র জেরেমি লরেন্স বলেন, আমরা পুলিশের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, যখন জরুরি হয়ে পড়ে, শুধু তখনই যেন তারা বলপ্রয়োগের পথে যায়। আর যদি সেটা করতেই হয়, আইন ও নীতি মেনে, সংযম ও যৌক্তিকভাবে তা করতে হবে। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হলে সেটাকে অবশ্যই তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, আগামী জানুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতির এ সময়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটের জন্য শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সব রাজনৈতিক দল, তাদের সমর্থক ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশন।
গত কয়েক মাসে বিরোধীদের সমাবেশ ঘিরে বারবার সংঘাত হওয়ার কথা তুলে ধরে জাতিসংঘের এ কর্মকর্তা বলেন, সেখানে পুলিশ রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। প্রতিবাদকারীদের মারধরের জন্য পুলিশ ও তাদের সঙ্গে সাদা পোশাকে থাকা ব্যক্তিদের হাতুড়ি, লাঠি, ব্যাট এবং লোহার রডের মতো বস্তু ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
বিরোধী দলের সমর্থকদের পাশাপাশি কিছু পুলিশ সদস্যও সহিংসতায় আহত হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিরোধী দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রকাশ্য দিবালোকে মারধর করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামে তাদের বাড়িঘরে অভিযান চালিয়েছে সাদা পোশাকধারীরা। সমাবেশের আগে-পরে শত শত বিরোধী নেতা ও সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
জেরেমি লরেন্স বলেন, কর্র্তৃপক্ষকে অবশ্যই মানবাধিকার বিষয়ে তাদের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। জনগণকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার চর্চার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি এসব অধিকার চর্চার ক্ষেত্র সংকুচিত করতে যেকোনো তৃতীয়পক্ষের চেষ্টা থেকে জনগণকে সুরক্ষা দিতে হবে।
নির্বাচন ঘিরে যারা ভোটের প্রচার চালাচ্ছে, তাদের জন্য একটি ‘নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ’ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান মুখপাত্র।
বিক্ষোভকারীদের ওপর বেআইনি বলপ্রয়োগ বন্ধের আহ্বান : অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের বলেছেন, পুলিশ হামলা করার আগ পর্যন্ত বিক্ষোভকারীরা শান্তিপূর্ণ ছিলেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনরত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২৯ জুলাই রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথে অবস্থান নেয়। তাদের এই বিক্ষোভ পুলিশের সঙ্গে সহিংসতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়।
প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অন্তর্বর্তীকালীন দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক স্মৃতি সিংহ বলেন, ‘যেসব ভিডিও ও ছবি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যাচাই করেছে, সেগুলো বাংলাদেশি কর্র্তৃপক্ষের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে আলোকপাত করে। আমরা বাংলাদেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, যেন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কঠোরভাবে আইন মেনে চলে এবং নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে। মানুষের আরও শারীরিক ক্ষতি এড়াতে এবং সংকট যেন আরও না বাড়ে, সে কারণেই এটা করা দরকার।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষকরা এবং ক্রাইসিস এভিডেন্স ল্যাব বাংলাদেশের ওই বিক্ষোভের ৫৬টি ছবি ও ১৮টি ভিডিও পর্যালোচনা করেছেন। পাশাপাশি ঘটনার নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারা।
যাচাই করা একটি ভিডিওতে ঢাকার মাতুয়াইলের শিশু ও মাতৃসদন হাসপাতাল এলাকায় পুলিশের কাঁদানে গ্যাস থেকে নিজেদের রক্ষায় লোকজনকে দৌড়াতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন নারী ছিলেন। অ্যামনেস্টি বলেছে, হাসপাতালের আশপাশে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা যাবে না। কম প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে জাতিসংঘের নির্দেশনায় বলা আছে, বয়োবৃদ্ধ, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী, অসুস্থ ব্যক্তিসহ যাদের পক্ষে আক্রান্ত এলাকা থেকে সরে যাওয়া কঠিন, তাদের কথা বিবেচনায় নিয়ে পুলিশকে শক্তি প্রয়োগের প্রভাব ন্যূনতম করতে হবে।
স্মৃতি সিংহ বলেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ব্যবহার করা উচিত নয়। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, বাংলাদেশের পুলিশ হাসপাতালের ভেতরে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করছে, যার মধ্য দিয়ে তাদের আন্তর্জাতিক আইনকে তোয়াক্কা না করার বিষয়টি প্রকাশিত হচ্ছে। এটা উদ্বেগজনক।