জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে এখন যে রাজনীতি চলছে তা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে সরকার টিকে আছে বলে অভিযোগ করছে। অন্যদিকে সরকারে থাকা আওয়ামী লীগ বলছে, অতীতে বিএনপি বিচার বিভাগকে দলীয় আঙিনা বানিয়েছিল।
রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতির সঙ্গে মামলা, আদালত, শুনানি, জামিন, সাজার মতো অবধারিত বিষয় সমানতালে চলতে থাকে। দেশে সামরিক শাসন থেকে শুরু করে গত তিন দশকের বেশি সময়ের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার রাজনীতিতেও এ প্রবণতা দৃশ্যমান ছিল।
গত বুধবার দুর্নীতির মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৯ ও তার স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের ৩ বছরের কারাদন্ডের রায় হয়। এই রায়ের কারণে তারেকের পর জোবাইদাও নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে গেলেন। ওই দিন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা প্রায় দিনভর বিক্ষোভ করেন। তাদের বিক্ষোভের জবাবে মাঠে নামে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থক আইনজীবীরা।
এর আগে গত ৩০ মে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় হাইকোর্টে বিএনপির দুই শীর্ষ নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ৯ ও আমানউল্লাহ আমানের ১৩ বছরের সাজা বহালের রায় হয়।
বিএনপির শীর্ষ আইনজীবী ও নেতারা অভিযোগ করে বলেন, শুধু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কারণে তাদের শীর্ষ নেতাদের নামে মামলা কিংবা সাজা দেওয়া হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা আগামী কয়েক মাস শীর্ষ নেতাদের নিয়ে আদালতে ব্যস্ত থাকতে হবে। আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন এমন অন্তত ৩০ জন শীর্ষ নেতার দুদকের মামলায় সাজা হতে পারে কিংবা বহাল থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ এ তালিকায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লা বুলু, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাফিজ ইব্রাহিমসহ আরও কয়েকজন নেতা রয়েছেন এ তালিকায়।
বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে আশঙ্কা করছি, আদালতকে ব্যবহার করে বিএনপির আরও শীর্ষ নেতাদের সাজা হবে। প্রথমত, সরকার চাইছে বিএনপিকে বাইরে রেখে ২০১৮ সালের মতো আরেকটি নির্বাচন করতে। আরেকটি হলো, দাবির মুখে যদি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়ও আমাদের শীর্ষ নেতাদের কারাগারে রেখে তারা সুবিধা নিতে চাইছে।’
তবে দুদকের কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘দুদকের মামলা নিয়ে আইন আদালত যেভাবে চলার কথা, সেভাবেই চলছে। এখানে বিশেষ কিছুই নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রচলিত আইন ও পদ্ধতিতে মামলা চলে। কোন মামলা তাড়াতাড়ি করতে হবে, কোন মামলা দেরিতে এমন কোনো তাগিদ বা তাড়াহুড়ো নেই। নিয়ম মোতবেক মামলা নিষ্পত্তি হয়। যারা বলছেন, তারা বলতেই থাকবেন।’
জামায়াত নিয়ে শুনানি হতে পারে শিগগির : আগামী নির্বাচনের ক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে, জামায়াতের প্রকাশ্যে আসা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন শুরু হয়েছে। এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। ওই বছরের নভেম্বরে জামায়াত লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতির আবেদন) করলেও সেটি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে। তবে সম্প্রতি আপিলের শুনানির জন্য সারসংক্ষেপ জমা দিয়েছেন জামায়াতের আইনজীবীরা। অন্যদিকে জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকা- ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধের আরজিসহ তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে গত ২৬ জুন বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিব মাওলানা সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর পক্ষে আপিল বিভাগে আবেদন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তানিয়া আমীর। ইতিমধ্যে জামায়াতের বিরুদ্ধে এ মামলায় দেশের বিভিন্ন পেশার ৪২ বিশিষ্ট নাগরিক পক্ষভুক্ত হয়েছেন।
জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বৃহস্পতিবার মামলাটি (জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণাসংক্রান্ত) কার্যতালিকায় ছিল। খুব শিগগির আপিল মামলাটি নিষ্পত্তির সম্ভাবনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আশা করি দ্রুত হবে।’
অন্যদিকে জামায়াতের কার্যক্রম নিষিদ্ধ চেয়ে করা মামলার ওপর আগামী বৃহস্পতিবার শুনানি হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। জামায়াতের বিচারে ৯ বছরের বেশি সময় আগে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত হলেও ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংশোধনীতে আটকে আছে বিচার-প্রক্রিয়া। কিছুদিন আগে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, শিগগির আইন সংশোধনের বিষয়টি জাতীয় সংসদে তোলা হবে। গতকাল মোবাইল ফোনে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
আদালতের উত্তাপ আইনজীবীদের মধ্যেও : সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ (সুপ্রিম কোর্ট বার) সারা দেশের আইনজীবী সমিতিগুলোকে (বার) নির্দলীয় বলা হলেও কার্যত দলীয় ছদ্মাবরণেই ভোট হয়। গত ছয় মাসে ঢাকা বার ও সুপ্রিম কোর্ট বারে নির্বাচন নিয়ে তুলকালাম কান্ড হয়, যা এখনো চলছে। তারেক-জোবাইদার রায়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা ছিলেন মুখোমুখি অবস্থানে। এর আগে এ মামলার শুনানির দিনেও দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রায়ের দিনও আদালত এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়েছেন আইনজীবীরা।
এর জের ধরে গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি হয়। বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা সমিতির সম্পাদক ও সভাপতির কক্ষ ভাঙচুর করেন। এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট বারের পক্ষে মামলা হয়েছে।
গত মার্চের আগে-পরে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, ডিম ছোড়াছুড়ির মতো ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের নামে এখন পর্যন্ত পাঁচটি মামলা হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, নির্বাচন কিংবা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে আদালতে আইনজীবীদের মধ্যে এমন পরিস্থিতি আর হয়নি। সামনে আরও অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি হতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচনের আগে বিএনপির জামিনের তৎপরতা : গত ২৯ জুলাই শনিবার ঢাকাকেন্দ্রিক বিএনপির অবস্থান কর্মসূচির বেশ কিছু জায়গায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপির ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে অন্তত ১৪টি মামলায় ছয় শর বেশি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। এসব মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে বিএনপির নেতাকর্মীদের অনেকেই উচ্চ আদালতে আগাম জামিন নিচ্ছেন। যদিও বছরখানেক ধরে বিএনপির শীর্ষ আইনজীবীরা নেতাকর্মীদের জামিন ও শুনানি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
একাধিক আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, এই সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের আগাম জামিন নেওয়ার ঘটনা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
আইনের দৃষ্টিতে পলাতক বিএনপি নেতা তারেক রহমানের বক্তব্য ও বিবৃতি গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশে আট বছর আগে নিষেধাজ্ঞাসহ রুল দিয়েছিল হাইকোর্ট। গত সপ্তাহে রুল শুনানির উদ্যোগ নেয় রিটকারী পক্ষ। তবে, রুল প্রস্তুত না হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আবেদনকারীদের বলে, রুল তৈরি হলে বিষয়টি তারা শুনবেন।
রিটকারীপক্ষের আইনজীবী কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তারেক রহমান পলাতক আছেন, এ প্রতিবেদন এসেছে। আমরা এই সপ্তাহে রুলের শুনানির জন্য আবারও উপস্থাপন করে তারিখ নেব।’
দশম জাতীয় সংসদ ভেঙে না দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী ২৯০ সংসদ সদস্যের (এমপি) শপথের বৈধতা নিয়ে করা রিট ২০১৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি খারিজের আদেশ দেয় হাইকোর্ট। এই আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতির আবেদন) হয়েছিল ওই বছরের সেপ্টেম্বরে। দীর্ঘ দিন পর গত জুনে আপিল নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয় রিটকারী পক্ষ। ১ আগস্ট আপিল খারিজ করে দেয় আপিল বিভাগ।
রিটকারী পক্ষের আইনজীবী এম মাহবুব উদ্দিন খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ আদেশ পেলে আমরা অবশ্যই এই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করব।’
সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ড. বদিউল আলম মজমুদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশের রাজনীতিতে নীতি-নৈতিকতাবোধ কমে গেছে। আইনের শাসনেরও অভাব রয়েছে। এই আইনের শাসনের সঙ্গে আদালত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন জড়িত। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে যারাই ক্ষমতায় যায়, তারাই এগুলোর অপব্যবহার করে। এই অপব্যবহারে নির্বাচনের ফলাফলকেও প্রভাবিত করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘দিন দিন পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আদালতমুখিতা আরও বাড়বে এবং এটি রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা। আদালতের কাজ হলো কেউ অন্যায় করলে শাস্তি দেবে। সাংবিধানিক সমস্যার ব্যাখ্যা দেবে। কিন্তু রাজনৈতিক অনেক বিষয়ে আদালতকে জড়িয়ে বিতর্কিত করা হয়, রায়কেও প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়। এগুলো স্বার্থ চিন্তা করেই করা হয়। এ পরিস্থিতির অবসান হওয়া উচিত।’