প্রান্ত থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলাদলি, মারামারি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অগোছালো আওয়ামী লীগকে ঘুছিয়ে তোলার লক্ষ্যে বিশেষ বর্ধিত সভা ডেকেছেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। এই সভায় তৃণমূল নেতারা দলের কোন্দল ও রেষারেষির কারণসহ বিভিন্ন বিষয় দলীয় প্রধানকে জানাবেন। সেই প্রস্তুতি নিয়ে তারা আসছেন বলে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে দলীয় ঐক্যের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগের এই বিশেষ বর্ধিত সভা ডেকেছেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এই বৈঠকে শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রগুলো বলছে, দলাদলি, মারামারি ও আধিপত্য বিস্তারের কথা চিন্তা না করে দলের সবাই এক হয়ে কাজ করার জন্য দেশের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে বিশেষ অনুরোধ জানাবেন আওয়ামী লীগ প্রধান। বিশেষ এ নির্দেশনা দিতেই বিশেষ বর্ধিত সভা ডাকা হয়েছে বলে জানান দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বিশেষ বার্তা দিতেই বিশেষ বর্ধিত সভা ডাকা হয়েছে। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে আমাদের দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হচ্ছে আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এর জন্য সুদৃঢ় ঐক্য জরুরি। দলীয় সভাপতি ছোটখাটো ভেদাভেদ, মতবিরোধ ভুলে গিয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেবেন।’
ফারুক খান বলেন, টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ যেসব নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করেছে তার চিত্র তুলে ধরার দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিএনপির অপপ্রচার এবং তাদের আমলে হওয়া বিভিন্ন দুর্নীতির কথা তুলে ধরার জন্যও বলা হবে।
দলের একাধিক নেতা জানান, বিশেষ বর্ধিত সভায় প্রধানত সাংগঠনিক আলোচনা হবে। সেখানে সাংগঠনিক সম্পাদকরা তাদের রিপোর্ট দেবেন। দলীয় কর্মসূচি কীভাবে নির্বাচন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবেন সেই বিষয়ে দিকনির্দেশনা থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি সংসদীয় আসনে অনেক এমপি প্রার্থী রয়েছেন, সেটা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে সে বিষয়েও কথা হবে। নেত্রী এরপর বিভিন্ন জেলায় কীভাবে যাবেন সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে।’
দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, মাঠের নেতাদের ভুল বোঝাবুঝি, মতবিরোধ দূর করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশের নেতাকর্মীদের ঢাকায় ডেকে পাঠিয়েছেন। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেবেন। সে অনুযায়ী মাঠে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। দলীয় মনোনয়ন যাকে দেবেন তার পক্ষে কাজ করবেন।
সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম বলেন, অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। আওয়ামী লীগ প্রধান মনে করেন, দলীয় কোন্দল বা রেষারেষি পরিহার করে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে পারলে বিজয় আসবে। সবাইকে এটা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই প্রেক্ষাপটে দলের তৃণমূল পর্যন্ত ইস্পাত-দৃঢ় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা, জনগণের দোরগোড়ায় বারবার গিয়ে ভোট প্রার্থনা করা, স্থানীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধন করা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অব্যাহত রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেবেন তিনি। একই সঙ্গে তৃণমূলের পরামর্শও শুনবেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ বর্ধিত সভায় তৃণমূল নেতারা সংসদ সদস্য এবং জেলা-উপজেলার নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মধ্যে দলাদলি, মারামারি বা ব্যক্তি শক্তি বাড়ানোর রাজনীতির চর্চার বিষয়টি শেখ হাসিনাকে জানাবেন। তারা এই ধরনের চর্চা বন্ধে দলীয় প্রধানের নির্দেশনাও চাইবেন।
ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুল কাদের মজনু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলীয় সভাপতি এই মুহূর্তে আমাদের নির্বাচনকেন্দ্রিক পরামর্শ দেবেন। আমরা কথা বলার সুযোগ পেলে সংগঠনের অভ্যন্তরে দলীয়, উপদলীয় যেসব কোন্দল আছে সেগুলো মিটমাট করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে বলব।’
লক্ষ্মীপুর আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু বলেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে যেসব চ্যালেঞ্জ আমাদের মোকাবিলা করতে হবে সেসব নিয়ে দিকনির্দেশনা দেবেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে দাওয়াত পাঠিয়েছেন। আমরা যাব। কিন্তু কথা বলার সুযোগ পাব কি না জানি না। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শুধু খাইয়ে দিলে, নির্দেশনা দিয়ে দিলে যথাযথ হবে না। সংগঠন কেন গত ১৫ বছরে খারাপ হলো সেগুলো জানতে চাইলে এবং আমাদের বলার সুযোগ দিলে ভালো হবে।’ তিনি বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা (এমপির) সংগঠন নষ্ট করে ফেলেছেন। সারা দেশে উড়ে এসে জুড়ে বসা নেতা ও এমপিদের আর মনোনয়ন না দিতে অনুরোধ করব।’
শেরপুর সদর উপজেলার সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নেত্রী (শেখ হাসিনা) ডেকেছেন ঢাকায় এসেছি। এই যাওয়ায় খুব যে উপকৃত হবে দল সেটা মনে হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘কারণ, আমরা যারা তৃণমূলে রাজনীতি করি তাদের কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু যারা কথা বলার সুযোগ পাবেন গন্ডগোল তো তাদের মধ্যে। তার জেলার তিনটি আসনেই সংসদ সদস্যদের সঙ্গে জেলা-উপজেলা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির দলাদলি আছে। আমার জেলা-উপজেলায় সংগঠন বলতে কিছু আর রইল না।’ এই গ্রুপিংয়ে নেতৃত্ব দেন কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কারা আবার এমপি মহোদয়রা।’
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলা সভাপতি আবদুস সালাম বলেন, ‘দলের বিশেষ বর্ধিত সভায় সংগঠনের কথা বলার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি। সুযোগ পেলে সংগঠনের দুরবস্থার কথা তুলে ধরব। সুযোগ এলে বলব দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন যাকেই দেন আপা, স্থানীয় নেতাকেই মনোনয়ন দেবেন। বাইরের কাউকে মনোনয়ন দেবেন না। কারণ ঢাকা-১৭ উপনির্বাচনে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে মনোনয়ন না দেওয়ার ফলে দলের কর্মী-সমর্থকরাই ভোট দিতে যাননি। আর বলব দলীয় কোন্দল দূর করুন।’