নাইজারে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর অর্থনৈতিক জোট ইকোয়াসের সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা আরও প্রবল হয়ে উঠল। কারণ নাইজারের জান্তার জন্য ইকোয়াসের বেঁধে দেওয়া সময় পেরিয়ে গেছে গতকাল রবিবার। এ সময়ের মধ্যে নাইজারের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহামেদ বাজুমকে ফের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে বলেছিল ইকোয়াস। কিন্তু নিজ অবস্থানে অনড় রয়েছে নাইজারে ২৬ জুলাই অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করা জান্তা। এ পরিস্থিতিতে নাইজারের পরিণতি নিয়ে জাগছে শঙ্কা। দেশটি যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে, এই আশঙ্কা করছেন সাধারণ নাইজারিয়ানরা।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জান্তার পক্ষে রাস্তায় নামা সাধারণ মানুষের একজন হলেন ইয়েইয়ে ইউসুফু। তিনি দাবি করেন, ‘ফ্রান্স নাইজারকে শুধু শোষণ করেছে। তাদের জন্য কিছুই করেনি।’ তিনি বলেছেন, ‘ফ্রান্স ৬৩ বছর ধরে আমাদের দেশে ইউরোনিয়াম আহরণ করছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে নাইজারে একটি বাঁধ পর্যন্ত নেই।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘যেভাবে সামরিক শাসকরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে, আমাদের আশা তারা নাইজারের অবস্থা পরিবর্তন করবে।’ পশ্চিমা শক্তি ও তাদের আফ্রিকান মিত্রদের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ সামাল দিতে রাশিয়ার ভাড়াটে সেনা গ্রুপ ওয়াগনারকে পাশে চাইছে নাইজারের জান্তা।
নাইজারের এ অভ্যুত্থানটি ২০২০ সাল থেকে আফ্রিকায় পঞ্চম অভ্যুত্থান। নাইজারের মতো মালি, গিনি, বুরকিনা ফাসো এবং চাদেও একইভাবে ক্ষমতা দখল করেছে সামরিক জান্তা। আলজাজিরা বলছে, নাইজারের অভ্যুত্থান নিয়ে আফ্রিকান জোট ইকোয়াস বেশি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তারা দেশটির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। এ ছাড়া নাইজেরিয়া দেশটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। নাইজার যত বিদ্যুৎ আমদানি করে তার ৭০ শতাংশই পাঠায় নাইজেরিয়া। তারা সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় এখন নাইজারের বেশিরভাগ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন।
নাইজারের সামরিক জান্তার সঙ্গে আপসের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়েছিল ইকোয়াস। এর অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার নাইজার গিয়েছিল ইকোয়াসের একটি প্রতিনিধিদল। কিন্তু তাদের সঙ্গে জান্তাপ্রধান আব্দুররহমানে চিয়ানি দেখা করেননি। এরপরই গত শুক্রবার সামরিক অভিযান চালানোর অনুমতি চেয়ে নাইজারের প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু দেশটির সিনেটের কাছে অনুমতি চান। ওইদিনই ইকোয়াসের সদস্যভুক্ত দেশের সেনাপ্রধানরা জানান, অভিযান চালানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন তারা।
তবে ইকোয়াসের এ হুমকিতে একটুও পিছপা হয়নি নাইজারের জান্তা। এ ছাড়া তাদের দুই পার্শ্ববর্তী দেশ মালি ও বুরকিনা ফাসো হুমকি দিয়েছে যদি নাইজারে কোনো সামরিক অভিযান চালানো হয় তাহলে এটি তাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হবে। এর ফলে তারাও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইকোয়াসের বাহিনীকে প্রতিহত করবে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ আফ্রিকা প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ক্যামেরুন হাডসন আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমি মনে করি এটির সম্ভাব্য প্রভাব হবে বিপর্যয়কর। এই অভ্যুত্থান সম্পর্কে আমরা একমাত্র ইতিবাচক দিক বলতে পারি, এখন পর্যন্ত কোনো সংঘর্ষ হয়নি। আমি মনে করি নাইজারের মানুষের জন্য আমাদের এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হবে। সামরিক অভিযানের কারণে যে ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে সেটি ভালো হবে না।’
এদিকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে রুশ ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনার গ্রুপের সাহায্য চেয়েছে নাইজারের জান্তা। ইকোয়াসের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই তড়িঘড়ি করে ওয়াগনারের দ্বারস্থ হন নাইজারের জেনারেলরা। অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা জেনারেল সলিফু মডি প্রতিবেশী দেশ মালিতে গিয়ে ওয়াগনারের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই অনুরোধ জানান। সাংবাদিক এবং সোফান সেন্টারের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ওয়াসিম নাসর বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) এ তথ্য জানিয়েছেন। এ ছাড়া মালির তিনটি সূত্র এবং একজন ফরাসি কূটনীতিক ওয়াগনারের সঙ্গে নাইজার জান্তার বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ওয়াগনার গ্রুপ প্রস্তাবটি বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন নাসর। তিনি বলেছেন, তাদের (জান্তা) ওয়াগনারকে দরকার। কারণ ওরাই ক্ষমতা ধরে রাখার নিশ্চয়তা হতে পারে।