১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে রাজশাহী শহরে ‘স্টার’ নামে একটা স্টুডিও স্থাপন করেন মোতাহার হোসেন। এই স্টুডিও স্থাপনের মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলে তিনি একটা সাংস্কৃতিক মনন তৈরি করেন। তিনি যখন স্টুডিও স্থাপন করেন তখন বেশির ভাগ মানুষ ছবি তোলা গর্হিত কাজ মনে করতো। কিছু কিছু হিন্দু ব্যক্তি তখন পাসপোর্ট সাইজ ছবি তুলতে স্টুডিওতে যেতেন। মুসলমানরা লোকলজ্জার ভয়ে প্রকাশ্যে স্টুডিওতে যেতে চাইতেন না। স্টুডিও স্থাপনের শুরুতে মোতাহার হোসেন তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার রোষানলে পড়েন। ছবি তোলার প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণা বদলে দিতে তিনি স্কুল ও কলেজের ছাত্রদের ছবি তুলে বিনা পয়সায় উপহার দিতেন। ওই সময়ই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়ে উঠে। শহরে প্রায় সভা-সমাবেশ হয়। সেসবের ছবি তোলার জন্য তার ডাক পড়ে। ছবি তুলতে গিয়েই তিনি ছাত্রদের কাছে অতি প্রিয় হয়ে উঠেন। ফলে তার ওপর গোড়া সমাজের যে চোখ রাঙানি; তা ক্রমে স্তিমিত হতে থাকে।
বাংলাদেশের প্রায় সব আন্দোলন-সংগ্রামে মোতাহার হোসেনকে সরব থাকতে দেখা গেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আর মহান মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ধারণ করে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। ভাষা আন্দোলনের সময় রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী মেডিকেল স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন মিছিল-মিটিং করতেন। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি স্বাধিকার আন্দোলনে প্রাণ হারান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা। মোতাহার হোসেনের ক্যামেরায় ধরা সেইসব উত্তাল মুহূর্তগুলো আজ ইতিহাস হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক সফরে চার বার রাজশাহীতে যান। প্রতিবারই তিনি বঙ্গবন্ধুর ছবি তুলেন। মোতাহারের এই ছবিগুলো ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এসব উপাদান ধ্বংস করতে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদাররা তার স্টুডিও পুড়িয়ে দেয়। মে মাসে বর্বর দখলদার বাহিনী রাজশাহী শহরে অনুপ্রবেশ করে প্রথম দিনই ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও স্টার স্টুডিওতে আগুন দেয়। এতে স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে ধারণ করা অনেক দুর্লভ নেগেটিভ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে হানাদাররা তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। আমেরিকান ইউসিস লাইব্রেরির কর্মকর্তা আবদুল গনির মুচলেকার বিনিময়ে তিনি প্রাণে রক্ষা পান। মোতাহার হেসেনের এসব অবদানের কথা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ নেই।
আলোকচিত্রের এই কিংবদন্তিকে জানতে আমি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করি। কিন্তু কোথাও তার সম্পর্কে নূন্যতম তথ্য নেই। ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে একটি বাক্যও পাওয়া গেল না। শেষে রাজশাহীর স্থানীয় মানুষ বন্ধুপ্রতীম আলোকচিত্রী ও চিত্রশিল্পী হাসান ইমাম রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি মোতাহার হোসেনের ছোট ভাই নজরুল ইসলামের ফোন নম্বর জোগাড় করে আমাকে পাঠান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি রেজিস্টার নজরুল ইসলাম আমাকে মোতাহার হোসেনের বিস্তারিত জানান। নজরুল ইসলাম বলেন, স্টার স্টুডিও ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক স্টুডিও। শহরের সাহেব বাজার এলাকায় ২০ কাটা আয়তনের এক বিজনবাড়িতে ছিল এই স্টুডিওর অবস্থান। বাড়িটির ভেতরে বিশাল এক অট্টালিকা। সুরম্য এই অট্টালিকায় ছিল ১৪টি কক্ষ। মাঝখানে ছিল বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা। স্টার স্টুডিওর সুনামের কারণে অনেক বছর আগে ফেলে যাওয়া এই হিন্দুবাড়িটি ১৯৬২ সালে মোতাহার হোসেনকে ৯৯ বছরের বন্দোবস্ত দেয় সরকার। পুরনো ভবনটি সংস্কার করে বিশাল পরিসরে তিনি স্টুডিওর কার্যক্রম শুরু করেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে স্টুডিওটিকে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ স্টুডিও হিসেবে খবর প্রচার করে বিবিসি। খবরটি বিবিসিতে পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশ অবজারভারের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা আনজুম ফেরদৌস। এমন একটি তথ্য আছে জাহাঙ্গীর সেলিম রচিত ‘আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ ও সমকালীন আলোকচিত্রের বিবর্তন’ বইয়েও। বইটির ৮৭ ও ৮৮ নম্বর পৃষ্ঠায় জাহাঙ্গীর সেলিম লিখেছেন, ‘এ স্টুডিও দেশ বিভাগের কিছু পর প্রতিষ্ঠিত হয়ে ধীরে ধীরে এক বিশাল স্টুডিওতে পরিণত হয়। একটি বড় ভবনের পুরো অংশ স্টুডিওর কাজে ব্যবহৃত হতো। ছোট বড় কয়েকটা ঘরে ছবি তোলার ব্যবস্থা ও একাধিক ডার্করুম ছিল। বিগত শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত দেশের সর্ববৃহৎ স্টুডিও হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।’
নজরুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, মোতাহার হোসেনের জন্ম ১৯২৯ সালে, অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা থানার কাহারপাড়া মানিকচক গ্রামে। ২২ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তার পিতা আব্দুল খলিল পন্ডিত স্থানীয় হাইমাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন; যুক্ত ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ডেও। মা মরিয়ম খাতুন ছিলেন গৃহিণী। ছেলেবেলায় ছবি তোলার প্রতি তার ঝোঁক ছিল। কাঠকয়লা দিয়ে মাটির দেয়ালে ছবি আঁকার কারণে তাকে প্রায় বকা শুনতে হতো। ১৯৩৫ সালে রাজনৈতিক গ্রেপ্তার এড়াতে মোতাহারের পিতা পরিবার নিয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ী এসে ধামিলা সেখেরমানি গ্রামে বসবাস শুরু করেন। ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন পবা উপজেলার দামকুড়া রামরঞ্জন মাইনর ইংরেজি স্কুলে (বর্তমানে দামকুড়া হাইস্কুল)। পরের বছর মোতাহারকে ওই স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করেন। ১৯৩৯ সালে দুই দিনের ব্যবধানে খলিল পন্ডিতের দুই ছেলে মারা যায়। পুত্রবিয়োগের বিষয়টি অশুভ ভেবে তিনি এখানকার সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে মুর্শিদাবাদে চলে যান। কিন্তু স্বদেশী হওয়ায় তার পক্ষে সেখানে থাকাও সম্ভব হলো না। ১৯৪০ সালের শেষের দিকে তিনি আবারও রাজশাহীর রামপুর বোয়ালিয়ায় আসেন।
মোতাহার ভর্তি হন লোকনাথ হাইস্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে। এ সময় মোতাহারের বাবা প্রায় নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন। তার অবস্থানের কথা কেউ জানতে পারতো না। বেশির ভাগ সময় তিনি খুলনা ও বাগেরহাটে আত্মগোপনে থাকতেন। এ অবস্থায় মোতাহারের মায়ের পক্ষে সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। একদিন তার মা বাঁশের খুটি ভেঙে জমানো পয়সা ছেলের হাতে তুলে দেন। মোতাহার সেই টাকা দিয়ে পাইকারি বাজার থেকে ছিটকাপড়, লুঙ্গি ও গামছা ফেরি করতে শুরু করেন। ফলে মোতাহারের পক্ষে আর স্কুলে যাওয়া সম্ভব হলো না। পাঁচ বছর পর তার হাতে কিছু টাকা জমলো। মাকে জানালেন ফটোগ্রাফির প্রতি তার প্রবল আগ্রহের কথা। এরমধ্যে দেশভাগ হয়ে গেল। তার বাবাও বাড়ি ফিরে এলেন। মায়ের অনুমতি নিয়ে মোতাহার কলকাতায় যান। সেখানকার একটি নামী স্টুডিওতে যোগ দিয়ে ওস্তাদের অধীনে কাজ শেখেন। শান্ত-স্বভাব আর সময়নিষ্ঠতার কারণে অল্প দিনের মধ্যেই তিনি মালিকের আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। সেখানে তিনি দাগুয়ে টাইপ, ট্যালবট টাইপ, কলোডিয়ান ও গ্লাস প্লেট নেগেটিভ প্রসেস শিখেন। আড়াই বছর প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার সময় স্টুডিও মালিক তাকে একটি প্লেট ক্যামেরা, কিছু পেপার ও কেমিক্যাল উপহার দেন।
রাজশাহীতে ফিরে মোতাহার কুমারপাড়ার বাসুনিয়া পট্টিতে ঠাকুরবাড়ির চিলেকোঠা ভাড়া নেন। সামান্য পরিসরে স্টার স্টুডিও চালু করেন। শুরুতে তিনি প্লেট ক্যামেরা ব্যবহার করেন। ওই সময় রাজশাহী শহরে আরও দুটি স্টুডিও ছিল। শহরের ফুদকিপাড়ায় কালীমন্দিরের কাছে একটি দোকানে সুরেন্দ্রনাথ নামের একজন মিনিট ক্যামেরায় ছবি তুলতেন। এছাড়া সাহেব বাজারে মাজেদিয়া স্টোর বলে একটি দোকান ছিল। সেই দোকানের খোলা বারান্দায় পাসপোর্ট সাইজ ছবি তোলা হতো। তখন সূর্যের আলোতে ছবি তুলতে হতো। রাতের বেলা ছবি তোলা কঠিন ব্যাপার ছিল। দিনে ছবি তোলার জন্য সাবজেক্টের পেছনে কালো কাপড় ধরার জন্য দুইজন বাড়তি লোকের দরকার হতো। তখন প্লেট ক্যামেরার ফিল্মের সাইজ অনুযায়ী ফটো পেপার পাওয়া যেত। ছবির প্রিন্টও হতো নেগেটিভের মাপে।
ওই সময় মোতাহার মাঝে মাঝে স্টুডিওর বাইরে গিয়ে ছবি তুলতেন। প্লেট ক্যামেরা বহন করা তখন কষ্টসাধ্য ছিল। তাই তিনি ঢাকায় এসে ১২৭ রোলিকর্ড ক্যামেরা কেনেন। কিন্তু তিনি তখন এই ক্যামেরার ব্যবহার জানতেন না। ফলে তিনি আবারও কলকাতা যান। দুই মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে রাজশাহীতে ফেরেন। রাজশাহী শহরে তখন একটি মাত্র পাকা রাস্তা, কিছু ইটের রাস্তা, বাকি সব কাঁচা রাস্তা। সেই সময় মোতাহার হোসেন রোলিকর্ড ক্যামেরা কাধে ঝুলিয়ে বাইসাইকেলে চড়ে জেলার দুর্গম গ্রাম ঘুরে বিভিন্ন ব্যক্তির পাসপোর্ট সাইজ ছবি, পারিবারিক ছবি ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের ছবি তুলতেন। ফলে মোতাহার হোসেন আর স্টার স্টুডিওর নাম রাজশাহীর প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দিনে দিনে স্টুডিওটির পরিধি বাড়ার কারণে স্টুডিওর স্থানও পরিবর্তন হয়। ১৯৫৩ সালে স্টুডিওটি বাসুনিয়া পট্টি থেকে গনকপাড়ায় হোমিও চিকিৎসক জালালউদ্দিনের দোতলা বাড়িতে স্থানন্তরিত হয়। ১৯৬৩ সালে স্টুডিওটি আসে সাহেব বাজারের পুরনো বাড়িতে। এর আগের বছর রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত হয় নিউ মার্কেট। সেখানে স্টার স্টুডিওর দ্বিতীয় শাখা খোলা হয়।
বাংলাদেশের অনেক গুণী আলোকচিত্রীর হাতেখড়ি হয় মোতাহারের কাছে। কিংবদন্তি ফটোসাংবাদিক রশীদ তালুকদার শিশু বয়সে স্টার স্টুডিওতে তার কাছে ফটোগ্রাফি শেখেন। ১৯৫২ সালের এপ্রিল মাসে ১২ বছর বয়সী রশীদ তালুকদার স্টার স্টুডিওতে সহযোগী হিসেবে যোগ দেন। মোতাহার হোসেন একদিন দুপুরে কল্পনা সিনেমা হলের পাশ দিয়ে স্টুডিওতে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন সিনেমার টিকেট কালোবাজারির কারণে ১৫-১৬ বছর বয়সী এক ছেলেকে পুলিশ থানায় নিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটি মোতাহার হোসেনকে করুণভাবে বললেন, ভালো কোনও কাজ পেলে সে আর এ কাজ করবে না। ছেলেটির প্রতি তার মায়া হলো। থানা থেকে ছেলেটিকে ছাড়িয়ে এনে স্টুডিওতে কাজ দিলেন। রবিউল ইসলাম নামের এই ছেলেটি পরবর্তী সময়ে ফটোগ্রাফি পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়। রশীদ তালুকদার ছাড়াও বাংলাদেশ বেতারের সাবেক প্রধান ফটোগ্রাফার লুৎফর রহমান লুতু, রাজশাহীর স্টাইল আর্ট গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা আজিজার রহমান, রূপায়ণ স্টুডিওর মালিক আবু নইম, নাটোরের শক্তি স্টুডিওর স্বত্ত্বাধিকারী প্রশান্ত সাহা, রাজশাহীর হায়দার আলী, গোলাম মোস্তফা, পাকিস্তানের মাহবুব-উর-রহমানসহ অসংখ্য তরুণ মোতাহার হোসেনের সান্নিধ্যে থেকে কাজ শেখেন।
মোতাহার হোসেন ছিলেন এক নিভৃতচারী মানুষ। দাম্পত্য কলহের কারণে শেষের দিকে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। এ সময়ে তার পরিবারে অপ্রত্যাশিত ঘটনাও ঘটে। ১৯৮৮ সালের ৮ আগস্ট রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান মোতাহার হোসেন। রাজশাহী শহরের কাদিরগঞ্জ গোরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর পর তার অনুজ সিরাজুল ইসলাম সেলিম ও নজরুল ইসলাম স্টুডিওটির হাল ধরেন। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তারা স্টুডিওটি চালান। এরপর মোতাহার হোসেনের স্ত্রী নাজমীন জাহান ও তার চার মেয়ে— ইলোরা, ইরা, নিপু ও পিংকি স্টুডিওটির দায়িত্ব নেন। ২০০৮ সালের পর তাদের পক্ষে স্টুডিওটি আর চালানো সম্ভব হয়নি।
লেখক: দেশ রূপান্তরের আলোকচিত্র সম্পাদক
shahadatparvezpix@gmail.com